kalerkantho

বহাল তবিয়তে গণহত্যার হোতা রাজাকার ইউনুছ, বয়স লুকিয়ে দায়মুক্তির অপচেষ্টা

উজ্জ্বল বিশ্বাস, বাঁশখালী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি    

২৪ আগস্ট, ২০১৯ ১২:২১ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



বহাল তবিয়তে গণহত্যার হোতা রাজাকার ইউনুছ, বয়স লুকিয়ে দায়মুক্তির অপচেষ্টা

মুক্তিযুদ্ধকালীন গণহত্যা, নারী নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ, লুটপাটসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত দেশের শীর্ষ ৬০০ রাজাকার-আলবদরের তালিকা ১৯৭২ সালে তৈরি করেছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার। ওই তালিকার ৪০৩ নম্বর রাজাকার বাঁশখালীর সাধনপুর ইউনিয়নের বৈলগাঁও গ্রামের মৃত ফোরক আহমদের ছেলে ইউনুছ (৭৬)। মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধার ছেলেসহ বিভিন্ন প্রগতিশীল ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৭১ সালে চট্টগ্রামের বাঁশখালীর গুণাগরীতে ১৮ জন তরতাজা জীবন্ত মানুষকে মাটিচাপা দিয়ে হত্যা করা হয় রাজাকার ইউনুছের নেতৃত্বে।

এ ছাড়া সাহেবেরহাট এলাকায় মুক্তিযোদ্ধা সার্জেন্ট মহিউল আলমকে হত্যা, বিভিন্ন মানুষের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, ধর্ষণসহ ভয়াবহ অপরাধের নেতৃত্ব দেন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর রাজাকার ইউনুছ। দেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলমান থাকলেও তিনি নানা কৌশলে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় বহাল তবিয়তে আছেন। সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকেও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। স্বজন হারানো ভুক্তভোগীরা ভয়ে বর্তমান সময়েও এই প্রভাবশালী রাজাকারে বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে পারছে না।

জানতে চাইলে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাধনপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন চৌধুরী খোকা বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই গেজেটেড রাজাকার ইউনুছের বীভৎস কাহিনি বয়স্কদের কাছ থেকে শুনে আসছি। দেশের শীর্ষ রাজাকারের তালিকায় এই ইউনুছের নাম থাকলেও রহস্যজনক কারণে তিনি বহাল তবিয়তে। এ রকম বড় রাজাকারের বিচার হওয়া উচিত।’

দক্ষিণ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার (অর্থ) মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘ইউনুছসহ বাঁশখালীর আড়াই শ রাজাকার ও আলবদরের নাম মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ইউনুছ ১৯৭২ সাল থেকে গেজেটেড রাজাকার, তাঁর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হওয়া উচিত।’

বাঁশখালী মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা আহমদ ছফা বলেন, ‘দেশ স্বাধীন হওয়ার দুই মাস আগে অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে বাঁশখালীর গুণাগরীতে হত্যাকাণ্ড, অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ ও নারী ধর্ষণসহ নির্বিচারে অপরাধ সংঘটিত হয়। এ ছাড়া মুক্তিযোদ্ধা সার্জেন্ট মহিউল আলমকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ওই সময় কালীপুরের দত্তবাড়ীতে ময়মনসিংহ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আসা ব্যবসায়ী ও একজন প্রকৌশলী সপরিবারে আশ্রয় নিয়েছিলেন। একদিন ভোররাতে ওই এলাকা থেকে ১৮ জনকে ধরে নিয়ে গুণাগরীর পাকিস্তানি ক্যাম্পে নির্মমভাবে খুন করে তাদের। তাদের জ্যান্ত মাটিচাপা দেওয়া হয়। মানবতাবিরোধী এসব নৃশংস কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল রাজাকার ইউনুছ।’

তবে তালিকাভুক্ত রাজাকার ইউনুছ এ প্রসঙ্গে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার বয়স এখন ৫৫ বছর। সেই হিসাবে ১৯৭১ সালে আমার বয়স ৭ বছর ছিল। ওই বয়সে আমি রাজাকার-আলবদর হতে পারি? আমি কখনো রাজাকার ছিলাম না। ওসব গুজব।’ আপনার প্রতিবেশী বয়স্করা বলছেন, আপনার বয়স সত্তরের ওপরে। আপনি বয়স লুকাচ্ছেন কেন? এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমার প্রকৃত বয়স কত আমি জানি না। তবে আমি রাজাকার নই।’ কিন্তু গতকাল (শুক্রবার) রাজাকার ইউনুছের জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপিতে দেখা যায় তাতে তাঁর জন্ম তারিখ ১০ জানুয়ারি ১৯৪৪। অর্থাৎ রাজাকার ইউনুছ তাঁর বয়স ২১ বছর কমিয়ে বলেছেন। ৫৫ বছর নয়, তাঁর প্রকৃত বয়স ৭৬ বছর।

বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোমেনা আক্তার বলেন, ‘মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হওয়ার নিয়ম। সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিদের অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা হয়। উপজেলা পর্যায়ে তেমন নির্দেশনা নেই, ট্রাইব্যুনালের সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তারা তা তদারকি করছেন। তার পরও বিষয়টি আমি স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অবহিত করব।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা