kalerkantho

গঙ্গাচড়া

বিলীন হচ্ছে একটি গ্রাম, মুছে যাচ্ছে মানচিত্র থেকে

নিজস্ব প্রতিবেদক, রংপুর    

২৪ আগস্ট, ২০১৯ ১১:৩৯ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



বিলীন হচ্ছে একটি গ্রাম, মুছে যাচ্ছে মানচিত্র থেকে

তিস্তার ভাঙনে সর্বস্বান্ত হয়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে রংপুরের গঙ্গাচড়ার শংকরদহ গ্রামের লোকজন। ছবি : কালের কণ্ঠ

রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষ্মীটারি ইউনিয়নের শংকরদহ গ্রামটি মানচিত্র থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট সাম্প্রতিককালের বন্যার ধকল কাটিয়ে না উঠতেই তিস্তা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে গ্রামটি নদীগর্ভে বিলীন হতে বসেছে।

গতকাল শুক্রবার শংকরদহ গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বন্যার পানি নেমে গেলেও নদীভাঙন অব্যাহত রয়েছে। চোখের সামনে ঘরবাড়ি, গাছপালা, বাঁশঝাড়সহ তিস্তায় বিলীন হচ্ছে শংকরদহ গ্রাম। গত বছর এলাকার একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শংকরদহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। প্রবল বন্যার কারণে লোকজন ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির কিছুই রক্ষা করতে পারেনি। আশ্রয়ণকেন্দ্রের মসজিদটিও আর নেই। ভাঙনের তীব্রতা ক্রমেই এগিয়ে আসছে আশ্রয়ণকেন্দ্রটির দিকে। আতঙ্কে সেখানে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলো তাদের ঘরবাড়ি সরিয়ে নিচ্ছে। সব মিলিয়ে বিধ্বস্ত-বিরানভূমিতে পরিণত হয়েছে লক্ষ্মীটারির শংকরদহ গ্রাম।

লক্ষ্মীটারি ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শেখ হাসিনা তিস্তা সেতু পেরিয়ে প্রায় দুই কিলোমিটার পশ্চিম দিকে দুর্গম চর শংকরদহ। গতকাল সকাল ১১টার দিকে ওই চরে যাওয়ার পথে দেখা যায়, বন্যার পানি কমে গেলেও সেখানে সহজে যাওয়ার কোনো পথ নেই। সাম্প্রতিক বন্যায় রাস্তাঘাট ভেঙে গেছে। সর্বস্বান্ত লোকজন থালা-বাসন, হাঁস-মুরগি, কাঁথা-বালিশসহ ভাঙনের কবল থেকে রক্ষা করা সংসারের জিনিসপত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নদীর কিনারায়। নৌকা এলেই তারা চলে যাবে অন্য কোনো এলাকায়।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শংকরদহ আশ্রয়ণকেন্দ্রে থাকত ৩০টি পরিবার। এবার সেই গোটা আশ্রয়ণকেন্দ্রটি হুমকির মুখে পড়েছে। একসময় আশ্রয়ণকেন্দ্র লাগোয়া প্রায় ১৫০ পরিবারের বসতি ছিল। কিন্তু গৃহহীন হয়ে তারা অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। এর মধ্যে জালাল উদ্দিন, সহিদার রহমান, আনোয়ারুল ইসলাম, আবুল কাশেমের পরিবারসহ ৫০টি পরিবার ভাঙনের হাত থেকে কিছুই বাঁচাতে পারেনি।

তিস্তার ভাঙনে সর্বস্বান্ত হয়ে কয়েকটা মুরগি, এক বোঝা খড়ি আর কিছু থালা-বাসন নিয়ে অজানার উদ্দেশ্যে নৌকায় উঠছিলেন শংকরদহ গ্রামের মরিয়ম বেওয়া। কষ্টের সঙ্গে তিনি বলেন, ‘হামার এ্যাটে থাকি য্যান লক্ষ্মী ছাড়ি পালাইচে। সেইবাদে হামার আইজ এ অবস্থা। এবারের বন্যায় চোকের সামনোত ঘরবাড়ি সউগ ভাসি নিয়া গেইল। এ্যাটে থাকি কী করি, আর কায় খাবার দেয়। জাগার (বসতভিটা) মায়া ছাড়ি যাওচি, দেকি দুনিয়াত কোনটে এ্যাকনা ঠাঁই মেলে।’ এবারের বন্যার পানির স্রোতে শংকরদহ এলাকার সব কিছু ভেসে গেছে। তিস্তার ভাঙনে তিন শতাধিক পরিবার আজ গৃহহারা। ঘরবাড়িসহ সহায়-সম্বল হারিয়ে অসহায় পরিবারগুলো এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছে অন্যত্র।

সহায়-সম্বল হারিয়ে এলাকার মায়া ত্যাগ করে স্ত্রী-সন্তানসহ সংসারের জিনিসপত্র নিয়ে অজানার উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন আলকাছ, জোনাব আলী, মমিনুর ও জালাল উদ্দিন। তাঁরা জানান, ঘরবাড়ি হারিয়ে গত কয়েক দিন মাটি কামড়ে এখানেই ছিলেন। কিন্তু এভাবে আর কয়দিন থাকা যায়! এলাকায় কোনো কাজ নেই। তাই এখান থেকে চলে যাচ্ছেন। শংকরদহ আশ্রয়ণকেন্দ্রে আছে আরো প্রায় ১০ পরিবার।

লক্ষ্মীটারি ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল হাদী বলেন, ‘বন্যা ও তিস্তার ভাঙনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে এখানে। এখানে এখন কাজ নেই, খাবারও নেই। মাথা গোঁজার ঠাঁই না থাকায় এখানকার বাসিন্দারা অন্যত্র চলে যাচ্ছে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা