kalerkantho

একঘরে গোটা পরিবার, কেউ কথা বললেই হাজার টাকা জরিমানা!

ফুলবাড়িয়ার পরিবারটি সাত দিন একঘরে

ফুলবাড়িয়া (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি    

২৩ আগস্ট, ২০১৯ ১২:৩৪ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



একঘরে গোটা পরিবার, কেউ কথা বললেই হাজার টাকা জরিমানা!

জয়নাল আবেদিন। বয়স ৯০ বছর ছুঁই ছুঁই। হাঁটেন লাঠিতে ভর দিয়ে। তুচ্ছ ঘটনায় সমাজপতিদের রোষানলে পড়ে এক সপ্তাহ ধরে তাঁর পুরো পরিবার ঘরবন্দি। মসজিদে নামাজও পড়তে যেতে পারছেন না তিনিসহ তাঁর পরিবারের সদস্যরা। মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে পরিবারটিকে একঘরে করে রেখে বলা হয়েছে, সমাজের কেউ কথা বললে তাদের গুনতে হবে এক হাজার টাকা জরিমানা। মসজিদে আসা লোকজনের কাছ থেকে এ ব্যাপারে সাদা কাগজে সইও নেওয়া হয়েছে। সমাজপতিদের ভয়ে কেউ তাদের সঙ্গে কথা পর্যন্ত বলে না। মসজিদের মাইকে একঘরে করার ঘোষণা শুনে ক্ষোভ আর লজ্জায় বৃদ্ধ জয়নাল আবেদিন আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেন। বাড়ির লোকজন বুঝতে পারায় আত্মহত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন তিনি। এখন সন্তানরা তাঁকে দিনরাত চোখে চোখে রাখছে। ঘটনাটি ঘটেছে ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ার ভবানীপুর ইউনিয়নের ভবানীপুর পশ্চিমপাড়া গ্রামে।

জানা গেছে, ভবানীপুর পশ্চিমপাড়া গ্রামের মৃত উমেদ আলী আকন্দের ছেলে দরিদ্র জয়নাল আবেদিন আট বছর আগে মসজিদের বাথরুমের জন্য তাঁর জমি দেন। জমি দেওয়ার সময় মৌখিক শর্ত ছিল, মুসল্লিসহ তিনি বাথরুমটি ব্যবহার করবেন। তিনি বাথরুমটি ব্যবহারও করে আসছিলেন।

দুই সপ্তাহ আগে জয়নাল আবেদিনের কাছে থাকা মসজিদের বাথরুম ও প্রস্রাবখানার চাবি নিয়ে নেন মসজিদ কমিটির কোষাধ্যক্ষ হোসেন আলী। তাঁকে আর বাথরুম ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না বলে জানিয়ে দেন। এ নিয়ে কোষাধ্যক্ষের সঙ্গে জয়নাল আবেদিনের কথা-কাটাকাটি হয়। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে জয়নাল আবেদিন কাঁটা দিয়ে বাথরুম বন্ধ করে দেন। গত বৃহস্পতিবার মসজিদ কমিটি বাথরুমের ওই কাঁটা সরিয়ে ফেলে। পরদিন শুক্রবার জুমার নামাজের সময় মসজিদ কমিটির সভাপতি আবদুস ছালাম মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে জয়নাল আবেদিনসহ তাঁর পরিবারকে একঘরে করেন। তাঁর সঙ্গে কেউ কথা বললে তাকে এক হাজার টাকা জরিমানা করা হবে বলে ঘোষণা দেন। এর পর থেকে সাত দিন ধরে একঘরে হয়ে আছে পরিবারটি।

গতকাল বৃহস্পতিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বৃদ্ধ জয়নাল আবেদিনের বাড়ি থেকে মসজিদটির দূরত্ব প্রায় ৫০ গজ। সমাজের অনেকে মসজিদে নামাজ আদায় করছে। তিনি বাড়িতে নামাজ আদায় করলেন। নামাজ পড়তে গেলে জুতাপেটা করা হবে—এ ভয়ে মসজিদে যেতে পারছেন না। দরিদ্র জয়নাল আবেদিনের স্ত্রী, ছেলে, পুত্রবধূ, নাতি-নাতনিসহ ২৫ জনের মতো লোকের বাস বাড়িটিতে। সবার মধ্যে যেন এক ধরনের ভয় কাজ করছে।

জয়নাল আবেদিন জানান, তাঁর জমিতে মসজিদের ল্যাট্রিন ও প্রস্রাবখানা করতে দেওয়া হয়েছে। যে পরিমাণ জমি নেওয়ার কথা ছিল তার চেয়ে বেশি জমি নেওয়া হয়েছে। মসজিদ কমিটির সভাপতি প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা আবদুস ছালামের বাড়িতে যাতায়াতের জন্য তাঁর জমির ওপর দিয়ে রাস্তা দিতে বলেন। জমি না দেওয়ায় ক্ষুব্ধ ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা ও মসজিদ কমিটির সভাপতি ছালাম। এ কারণে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে তাঁদের একঘরে করে রাখা হয়েছে।

জয়নালের ছেলে শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘পরিবারের লোকজন বাড়ি থেকে বের হতে পারছে না। আমরাসহ ছেলে-মেয়েরা স্কুলে গেলে সমাজের মানুষ টিটকারি মারে। হাট-বাজারে যেতে পারছি না, গ্রামে লজ্জায় মুখ দেখাতে পারি না।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা