kalerkantho

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ভণ্ডুলের নেপথ্যে-

তোফায়েল আহমদ, কক্সবাজার   

২২ আগস্ট, ২০১৯ ২৩:০৪ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ভণ্ডুলের নেপথ্যে-

একে একে দুই দফায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ভণ্ডুল হওয়ার ঘটনায় কক্সবাজারের বাসিন্দারা ক্ষুব্ধ। এমন শান্তিপূর্ণ পরিবেশেও একজন রোহিঙ্গাও কি কারণে স্বদেশে ফিরেননি তার নেপথ্যের কারণ খুঁজে বের করার জন্য এলাকাবাসী দাবি জানিয়েছেন। রোহিঙ্গারা দেশে না ফেরার পেছনে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে নিয়োজিত বাংলাদেশের কর্মকর্তাদেরও দুষছেন এলাকার লোকজন।

অভিযোগ উঠেছে, কেবল মিয়ানমার সরকারের প্রতি দাবি-দাওয়া নিয়ে রোহিঙ্গাদের দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশে সুকৌশলে অবস্থান করানোর একটি প্রক্রিয়াও চলছে। আর এমন প্রক্রিয়ায় ধামাচাপা দেওয়া হবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড। এলাকাবাসী রোহিঙ্গাদের দীর্ঘকালীন সময় ধরে অবস্থানে দুর্ভোগের দ্রুত অবসান চায়।

গত বছরের ১৫ নভেম্বর প্রথম দফায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ভণ্ডুল হওয়ার পর আজ বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দফায়ও একই ঘটনা ঘটে। বৃহস্পতিবারের প্রত্যাবাসনও সফল না হওয়ার পর থেকে এলাকার লোকজন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। অভিযোগ উঠেছে, গেল বছরের ১৫ নভেম্বরের প্রত্যাবাসনের কাজে সরকারি কর্মকর্তাদের ভূমিকা ছিল রহস্যজনক। সেই প্রত্যাবাসনকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের তেমন কোনো ভূমিকা দৃশ্যমান ছিল না।

সে সময়ের ব্যর্থতার বিষয়টি অনুসন্ধানে অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে যায় যে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে কেন্দ্র করে মূলত স্থানীয় প্রশাসনিক একটি ‘অদৃশ্য দ্বন্দ্ব’ লেগে রয়েছে। দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন রোহিঙ্গা ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত রয়েছেন একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বাধীন প্রায় অর্ধশতাধিক কর্মকর্তা। আরআরআরসি (শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার) অফিস হিসেবে পরিচিত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও ব্যবস্থাপনা প্রশাসনের কর্মকর্তারাই দেখভাল করে আসছেন উখিয়া ও টেকনাফের ৩২টি শিবির।

অভিযোগ উঠেছে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে নিয়োজিত কর্মকর্তারা আকস্মিক এগার লক্ষাধিক মানুষের  (রোহিঙ্গা) ব্যবস্থাপনায় গিয়ে নানা কর্মকাণ্ডে বিতর্কিত কাজে জড়িত হয়ে পড়েন। রোহিঙ্গা, দেশি ও বিদেশি এনজিও, আন্তর্জাতিক নানা সংস্থাসহ জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) সাথে এসব কর্মকর্তাদের মেলামেশায় সৃষ্টি হয় নানা সন্দেহের। এমনকি রোহিঙ্গা প্রত্যাসন বিরোধী কাজে কোনো কোনো বিদেশি সংস্থার ইন্ধন নিয়েও অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ‘চুপচাপ’ থাকার মতো গুরুতর অভিযোগও উঠেছে।

এসব ছাড়াও অভিযোগ রয়েছে যে, বিশ্বের কোনো দেশের শরণার্থী সমস্যায় ইন্টার-সেক্টর কো-অর্ডিনেশন গ্রুপ (আইএসসিজি) নামের কোনো ব্যবস্থা নেই। অথচ বাংলাদেশের রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে এরকম একটি সমস্যা নিরসন বা ব্যবস্থাপনায় ‘আইএসসিজি’ নামের একটি প্রেসার গ্রুপ করা হয়েছে। আরো অদ্ভুত ব্যাপার যে, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সাথে বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের নানা বিষয়ে সংযোগ রক্ষার জন্য একজন এনজিও কর্মীকে আইএসসিজি’র সমন্বয়কারী হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে।

তদুপরি ওই কর্মকর্তার অফিসও দেওয়া হয়েছে আরআরআরসি অফিসে। অভিযোগ রয়েছে, সংস্থাটির ওই এনজিও কর্মী রোহিঙ্গায় নিয়োজিত সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর রীতিমত ‘খবরদারি’ চালিয়ে আসছেন। এসব কারণে রোহিঙ্গা প্রশাসনের কর্মকর্তারা প্রত্যাবাসনের পক্ষে তেমন কোনো জোরালো ভূমিকাও রাখতে পারছেন না। এসব কারণে স্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সাথে রোহিঙ্গা প্রশাসনের একটি মনস্তাত্বিক দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আরআরআরসি মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেন, আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে আসছি রোহিঙ্গা বিষয়টি নিয়ে। এ ব্যাপারে আমাদের কোনো ত্রুটি নেই।

অপরদিকে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন বলেছেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে তার প্রশাসনের যা যা করার দায়িত্ব দেওয়া তাই পালন করেছেন। কোনো কাজেই অবহেলা করা হয়নি।

এ প্রসঙ্গে টেকনাফ-উখিয়ার সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী বলেছেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিরোধীরা বরাবরই সোচ্চার রয়েছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কেবল সরকারি কর্মকর্তাদের দিয়ে সম্ভব হবে না। এক্ষেত্রে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তাসহ সুশিল সমাজকে কাজে লাগাতে হবে। প্রত্যাবাসনের কয়েকদিন আগেই ছাড়পত্র পাওয়া রোহিঙ্গাদের আগের মতো একটি নির্দ্দিষ্ট স্থানে রেখে উদ্বুদ্ধকরণ করতে হবে। রোহিঙ্গাদের স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য করার কাজ বন্ধ করতে হবে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির অন্যতম নেতা উখিয়ার নুর মোহাম্মদ সিকদার বলেছেন, প্রত্যাবাসন করতে হলে আগে রোহিঙ্গাদের শিবিরের বাইরে যত্রতত্র ঘোরাঘুরির সুবিধা বন্ধ করতে হবে। বন্ধ করতে হবে শিবিরে রোহিঙ্গাদের চাকরির সুযোগ। সেই সাথে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে প্রত্যাবাসন বিরোধী এনজিও এবং নানা সংস্থার কার্যক্রম। আইএসসিজির বিতর্কিত কর্মকাণ্ডগুলোর দিকে নজরদারি বাড়াবে।

কক্সবাজারের বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে কাড়ি কাড়ি টাকা উপার্জনের পথ বন্ধ করতে হবে। সর্বাগ্রে বন্ধ করতে হবে রোহিঙ্গাদের ইয়াবা কারবার। রোহিঙ্গারা এখানে অবস্থান নিয়ে টাকা-পয়সার উৎস খুঁজে পেলে তারা কোনোদিন দেশে ফিরবে না।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা