kalerkantho

দুবাইয়ের সোনা বাংলাদেশ দিয়ে ভারতে পাচার

মূল চোরাচালানি দুই ভারতীয় সহোদর গোপাল ও রাজ

তথ্য মিললেও চট্টগ্রামে সোনা আটক, মামলার চার্জশিটে তাঁদের নাম নেই

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

২২ আগস্ট, ২০১৯ ০২:৩৫ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মূল চোরাচালানি দুই ভারতীয় সহোদর গোপাল ও রাজ

ভারতের দুই সহোদর গোপাল ও রাজ। গোপালের বাস কলকাতায়। আর রাজ অবস্থান করেন দুবাইয়ে। ভারতে সোনা আমদানিতে উচ্চ শুল্কহারের কারণে এ দুই ভাই মিলে গড়ে তোলেন সোনা পাচার চক্র। দুবাই থেকে ভারতে সোনাপাচারে এই চক্র ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করছে বাংলাদেশকে। আর এখানে বাহক বা সহযোগীর ভূমিকায় রয়েছে বাংলাদেশি একটি চক্র। তারা মূলত বাহক হিসেবে চালানপ্রতি ১০-১৫ হাজার টাকা হারে পেয়ে থাকে। 

চট্টগ্রাম মহানগরীর কোতোয়ালি থানার সিআরবি সাত রাস্তার মোড় এলাকায় গত মার্চ মাসে একটি প্রাইভেট কার থেকে ১০০ সোনার বার জব্দ করার ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্তে নেমে এসব তথ্য জেনেছে গোয়েন্দা পুলিশ। মামলায় বাংলাদেশি আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। তবে তথ্য পাওয়া সত্ত্বেও কলকাতার ওই দুই সহোদর তথা বিদেশি নাগরিকদের চার্জশিটভুক্ত করা হয়নি।

এই মামলায় গ্রেপ্তারকৃত পাঁচ আসামির মধ্যে দুজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তারা জানিয়েছে, সোনাপাচারে কলকাতার গোপাল বাংলাদেশে গাড়ি কেনা থেকে শুরু করে বিপুল অঙ্কের টাকা লগ্নি করেছেন। গোপালের ভাই রাজ দুবাই থেকে বাংলাদেশে সোনার বার পাঠিয়ে থাকেন।

গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার (বন্দর) এস এম মোস্তাইন হোসেন বলেন, মামলার তদন্ত পর্যায়ে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে কলকাতার বাসিন্দা দুই সহোদর গোপাল ও রাজের নাম পাওয়া গেছে। কিন্তু ওই দুটি নাম আসল নাকি ছদ্মনাম তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ ছাড়া সোনাপাচার আন্তর্জাতিক চক্রের কাজ। দুবাই থেকে বিমানযোগে বাংলাদেশে পৌঁছার পর সোনার বারগুলো স্থলপথে ভারতে পাচার করা হচ্ছে। বাংলাদেশে একটি চক্র বাহক ও সহযোগীর ভূমিকায় তৎপর। সে কারণে অভিযোগপত্রে ভারতের ওই দুই সহোদরের নাম আনা হয়নি। তদন্তকালে যাদের পরিচয় সুনিশ্চিতভাবে জানা সম্ভব হয়েছে, শুধু তাদেরই এজাহারভুক্ত আসামি করা হয়েছে।

গত ৩ মার্চ ১০০ সোনার বার জব্দের ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় মামলা দায়ের করেন গোয়েন্দা পুলিশের উপপরিদর্শক ইউসুফ ভুঁইয়া। মামলাটির তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক আবুল কালেম আজাদ। বর্তমানে তিনি চান্দগাঁও থানার ওসি হিসেবে বদলি হয়েছেন। 

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, তদন্ত তদারকি কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, মূলত দুই বিদেশির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ জোগাড় করতে না পেরে শুধু বাংলাদেশি আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। 

অভিযোগপত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ মার্চ সিআরবি সাত রাস্তার মোড় থেকে ১০০ সোনার বার, একটি প্রাইভেট কারসহ দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। উদ্ধারকৃত সোনার বারের মূল্য প্রায় চার কোটি ৪৫ লাখ টাকা। এই মামলার তদন্ত পর্যায়ে জড়িত আসামিরা হলো ঢাকার নবাবগঞ্জ থানার মেলেং গ্রামের পংকজ সাহা চৌধুরী, নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জ গ্রামের প্রণয় কুমার সাহা ওরফে লাবু, চাঁদপুরের কচুয়া থানার বায়েক গ্রামের বিশ্বজিত্ কুমার সেন ওরফে রঙ্গ, কুমিল্লার তিতাস থানার খানে বাড়ির গোপাল চন্দ্র রায়, নারায়ণগঞ্জের লোকনাথ রায়, শরীতপুরের ডামুড্যা থানার বিল্লাহ হোসেন সর্দার ওরফে কাদের, কুমিল্লার বুড়িচং থানার গোবিন্দপুর গ্রামের রাসেল, চট্টগ্রামের রাউজান থানার নোয়াপাড়ার আশরাফুল হক রুবেল, সাতকানিয়ার লোকমান গণি ও রাঙ্গুনিয়ার আমিনুল হক বাবুল ওরফে আলমাস বাবুল।

ঘটনার দিন চট্টগ্রাম থেকে সোনার বার বাহকদের হাতে তুলে দেন চট্টগ্রামের আশরাফুল হক রুবেল। পরবর্তী সময়ে রুবেল দুবাইয়ে, পংকজ ভারতে এবং তাঁদের সহযোগী লোকমান ও বাবুল আত্মগোপনে চলে যায়। 

অভিযোগপত্রের তথ্য অনুযায়ী, পলাতক আসামি আশরাফুল হক চট্টগ্রাম ও দুবাই থেকে বিভিন্ন উপায়ে সোনার বার সংগ্রহ করে সহযোগীদের মাধ্যমে ঢাকার পংকজ রায়ের কাছে পাঠান। অভিযোগপত্রের এই অংশে দুবাই থেকে রাজ নামের ব্যক্তির বাংলাদেশে সোনার বার পাঠানোর তথ্য উল্লেখ করা হয়নি। 

আশরাফুল সোনার বার সংগ্রহের পর চট্টগ্রাম থেকে তাঁর সহযোগী লোকমান ও বাবুলসহ অন্যদের মাধ্যমে সড়কপথে তা ঢাকায় পাঠিয়ে থাকেন। সেখান থেকে আবার বারগুলো সীমান্ত দিয়ে কলকাতায় পাচার করা হয়। কলকাতায় গোপাল নামের এক ব্যক্তি বারগুলো গ্রহণ করেন। তবে সেই তথ্যও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়নি। 

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, সোনাপাচারে বাংলাদেশি আসামিরা মূলত সহযোগিতা করত। তারা প্রতিটি চালান বহন করে ১৫ হাজার টাকার মতো পেত। সোনাপাচারের জন্য পাচারকারীরা তিনটি প্রাইভেট কার ও একটি পিকআপ কিনে সেগুলো ভুয়া ঠিকানায় রেজিস্ট্রেশন করেছে। এর মধ্যে দুটি গাড়ি জব্দ হলেও অন্য দুটি শনাক্ত হয়নি।

‘কোড—কাজের মোবাইল’ : পাচারকারীরা ‘কাট আউট’ পদ্ধতিতে সোনা পাচার করে। একজন অন্যজনকে চিনতে পারবে না। এ ক্ষেত্রে একটি মোবাইল ফোন ব্যবহূত হয়। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে সোনার বার গ্রহণ করতে যে বাহকই আসুক না কেন, তার হাতে থাকত ‘কাজের মোবাইল’টি। এই মোবাইলটি যে-ই বহন করবে, তাকেই সোনার বার হস্তান্তর করবে চট্টগ্রামের সহযোগীরা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা