kalerkantho

‘আঁরা এহন ন যাইয়্যূম’

নিজস্ব প্রতিবেদক, কক্সবাজার ও টেকনাফ প্রতিনিধি   

২১ আগস্ট, ২০১৯ ০১:২৪ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘আঁরা এহন ন যাইয়্যূম’

ছবি: কালের কণ্ঠ

আগামীকাল বৃহস্পতিবারের বহুল প্রতিক্ষীত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কার্যক্রমে রোহিঙ্গারা এ মুহূর্তে দেশে ফিরতে রাজি না হলেও তারা স্বেচ্ছায় ইন্টারভিউ বোর্ডে সাক্ষাৎকার দিয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সাক্ষাৎকার পর্বের প্রথম দিনে শতাধিক রোহিঙ্গার ২১টি পরিবার অংশ নিয়েছে। রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) প্রতিনিধিদের কাছে বলেছে- ‘আঁরা এহন ন-যাইয়্যুম।’ অর্থাৎ আমরা এখন যাব না।

গতকাল সকাল ৯টা থেকেই ইউএনএইচসিআর কর্মকর্তারা স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার জন্য টেকনাফ সীমান্তের শালবাগান শিবিরের সাক্ষাৎকার টেবিল সাজিয়ে বসেছিলেন। সকাল সাড়ে ১০টার পর থেকেই একে একে মিয়ানমারের ছাড়পত্র প্রাপ্ত রোহিঙ্গারা সাক্ষাৎকার টেবিলে আসতে শুরু করে। সাক্ষাৎকার পর্বের সময় নির্ধারণ করা হয় সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত।

সাক্ষাৎকার দিয়ে মিয়ানমারের নাইনসং গ্রামের বাসিন্দা রশিদ আমিন বলেন- ‘আমাকে কেবল ইউএনএইচসিআর-এর লোকজন খবর জানালে আমি যথারীতি সাক্ষাৎকার দিতে আসি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কেবল ইউএনএইচসিআর-এর লোক। আমি দেশে ফিরব কিনা জানতে চাইলে আমি বলি-ফিরব না।’ তিনি বলেন, দেশে ফিরার জন্য তাদের ৪টি শর্তের কথা তিনি সাফ জানিয়েছেন।

রশিদ আহমদ বলেন, বর্তমানে তিনি শালবাগান আই ব্লকের বাসিন্দা। ৬ সদস্য নিয়ে তার সংসার। তিনি প্রথম শর্ত উল্লেখ করে বলেন, তাদের নাগরিকত্ব দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, মিয়ানমারে তাদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, মিয়ানমারে বর্তমানে যেসব রোহিঙ্গা রয়েছে আগে তাদেরকেই নাগরিকক্ত দিতে হবে। সেটা যখন এপারের রোহিঙ্গারা নিশ্চিত হবে তখনই তারা ফিরে যাবে। চতুর্থত, রোহিঙ্গারা তাদের নির্যাতনের বিরুদ্ধে আইসিসি (আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত)তে যে বিচার দাবি করে আসছে তা নিশ্চিত করতে হবে।

রুহুল আমিন নামের অপর একজন রোহিঙ্গাও বলেছেন তার পরিবারের ১০ সদস্যের মধ্যে ৯ জনের ছাড়পত্র এসেছে। অপর একজন অল্প দিন আগে বাংলাদেশে জন্ম নিয়েছে হয়তোবা এ কারণে ছাড়পত্র আসেনি। তিনি বলেন, আমরা আমাদের রাইট অর্থাৎ দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত সময়ে যাব না।’ রুহুল আমিন জানান, কেউ তাকে জোর করে সাক্ষাৎকার পর্বে নিয়ে আসেননি। তিনি স্বেচ্ছায় এসেছেন।

এ বিষয়ে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে নিয়োজিত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেছেন- ‘প্রত্যাবাসনের শুরু হওয়া কাজ নিয়ে আমরা মোটেই হতাশ নই। আমরা শুরু করতে যাচ্ছি মাত্র। আজ (মঙ্গলবার) ২১টি পরিবার দেশে ফিরে যাবে কিনা তা জানানোর জন্য তাদের মতামত দিতে হাজির হয়েছে স্বেচ্ছায়। এমন স্বেচ্ছামূলক সাক্ষাৎকার পর্বটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয় কিন্তু।’

আরআরআরসি বলেন, প্রথম দিনের সাক্ষাৎকার পর্বে যখন এত বেশিসংখ্যক রোহিঙ্গা এসেছে হয়তোবা আজ বুধবার সাক্ষাৎকার পর্বে আরো বহুসংখ্যক রোহিঙ্গার সমাগম হবে। এভাবে প্রত্যাবাসন কাজটিকে ওরা (রোহিঙ্গা) সহজভাবে গ্রহণ করুক। তার পরই একদিন ঠিকই তারা ফিরবে তাদের ফেলে আসা বাড়ি ঘরে।

তবে প্রত্যাবাসনকে কেন্দ্র করে প্রায়শ রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে যেভাবে রোহিঙ্গাদের দৃশ্যমান উগ্র আচরণ করে থাকে এবার অন্তত সেই রকম পরিস্থিতি নেই। শিবিরগুলোতে নেই প্রত্যাবাসন বিরোধী এমন কোনো ব্যাপক বিক্ষোভও। তবে লিফলেট-ফেস্টুন নিয়ে শামলাপুর নামের একটি শিবিরে গতকাল সকালে কিছুসংখ্যক রোহিঙ্গা ছোটখাট বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে। কর্মকর্তারা বলেছেন, এরকম ছোটখাট বিষয় হয়েই থাকে।

তবে প্রত্যাবাসনে নিয়োজিত কর্মকর্তারা বৃহস্পতিবারের নির্ধারিত দিনের প্রত্যাবাসনের জন্য ২১টি পরিবারের রোহিঙ্গারা সম্মত না হলেও তারা তাতে হতাশ নন। কর্মকর্তারা এতটুকুতেই খুশি যে, অন্তত রোহিঙ্গারা দেশে ফিরে না যাবার জন্য কোনো বড় ধরনের মিছিল-মিটিং বা বিক্ষোভসহ উচ্ছৃংখল কার্যকলাপ থেকে বিরত রয়েছেন।

এমনকি বাংলাদেশের কোনো কর্মবর্কতারা না বললেও দেশে ফিরার জন্য ছাড়পত্র পাওয়া রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় ইউএনএইচসিআর-এর অফিসে গিয়ে ইন্টারভিউতে অংশ নিয়েছে। মিয়ানমারের ছাড়পত্র পেয়ে রোহিঙ্গারা শিবিরের বস্তি থেকে পালিয়ে না গিয়ে ইন্টারভিউ বোর্ডে সাক্ষাৎকার পর্বে অংশ নেওয়ার ঘটনাটিকেও অনেকটা ইতিবাচক বলেও মনে করেন কক্সবাজারের রোহিঙ্গা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এ প্রসঙ্গে কর্মকর্তারা বলছেন, গেল বছরের ১৫ নভেম্বরের প্রথম দফার প্রত্যাবাসনের কথা শুনে শত শত রোহিঙ্গা শিবির ছেড়ে পালিয়েছিল।

তবে এনজিও এবং কতিপয় বিদেশি সংস্থার গোপন প্রত্যাবাসন বিরোধী কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকারও অভিযোগ রয়েছে। প্রত্যাবাসন বিরোধী এসব এনজিও এবং সংস্থার ঈঙ্গিতে শিবিরের আল ইয়াকিন নামে পরিচিত উগ্রপন্থী রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের হুমকির মুখে টেকনাফের শালবাগান শিবিরের বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার একটি দল চুপচাপ হয়ে গেছে। মিয়ানমারের কয়েকটি গ্রামের এই বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা একই সঙ্গে বসবাস করে আসছে শালবাগান শিবিরটিতে।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, পাশাপাশি গ্রামের বাসিন্দা এসব রোহিঙ্গা এক সঙ্গে দলবেঁধে  মিয়ানমারে ফিরে যেতে নিজেরাই গোপন সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিল। কিন্তু এ খবর পেয়ে যায় আল ইয়াকিন নামের প্রত্যাবাসন বিরোধী উগ্রপন্থী রোহিঙ্গারা। এসব উগ্রপন্থীরা দেশে ফিরতে ইচ্ছুক রোহিঙ্গাদের জানে মারার হুমকি দেয়। ফলে সাধারণ রোহিঙ্গারা তাদের গোপন মনোবাসনার কথা প্রকাশ করতে সাহস পাচ্ছে না।

এখানে উল্লেখ্য যে, টেকনাফের অন্যতম সন্ত্রাস প্রবণ রোহিঙ্গা শিবিরটি হচ্ছে শালবাগান শিবির। শিবিরটির দায়িত্বে নিয়োজিত সরকারি কর্মকর্তা মোহাম্মদ খালেদ হোসেন জানিয়েছেন, ২৪ হাজার রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এই শিবিরটি থেকেই সিংহ ভাগ রোহিঙ্গার ছাড়পত্র দিয়েছে মিয়ানমার। যার সংখ্যা এ শিবিরটিরই রয়েছে ৩ হাজার ৯১ জন। মোট ৩ হাজার ৪৫০ জন রোহিঙ্গার ছাড়পত্রের মধ্যে বাদবাকি ৩৫৯ জন হচ্ছেন অপর ৩টি শিবিরের বাসিন্দা।

অভিযোগ উঠেছে, সন্ত্রাসী রোহিঙ্গাদের ডেরা হিসাবে পরিচিত টেকনাফ শালবাগান রোহিঙ্গা শিবিরের রোহিঙ্গাদের নাম তালিকাভুক্ত করে ছাড়পত্র দিলে তারা দেশে ফিরে যাবে না এ খবর মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের জানা রয়েছে। এ কারণেই তারা ইচ্ছা করে শুধুমাত্র এমন শিবিরটি থেকেই এত বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার নাম পাঠিয়েছে। 

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, এ শিবিরে ২টি সশস্ত্র ডাকাত বাহিনী রয়েছে। একদিকে হাকিম বাহিনী নামের একজন দুর্ধর্ষ রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীর দল রয়েছে অপরদিকে রয়েছে তার প্রতিপক্ষ অপর একটি দল। এসব কারণে এ শিবিরটিতে প্রতিনিয়ত খুনখারাবিও লেগে থাকে। প্রতিনিয়িত তারা থাকে মুখোমুখি অবস্থায়। তদুপরি ২০১৪ সালে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা আনসার ক্যাম্পে হামলা চালিয়ে একজন আনসার কমান্ডারকে হত্যার পর অস্ত্র লুট করে নেওয়ার ঘটনাটিও এ শিবিরে ঘটেছিল।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা