kalerkantho

বিকল্প কাজ নেই, দারিদ্র্যই নিত্যসঙ্গী হাওরবাসীর

হাফিজুর রহমান চয়ন, হাওরাঞ্চল   

২০ আগস্ট, ২০১৯ ২১:৪৪ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বিকল্প কাজ নেই, দারিদ্র্যই নিত্যসঙ্গী হাওরবাসীর

কৃষিকাজ ও মাছ ধরা ছাড়া আর কোনো বিকল্প কাজের সুযোগ নেই নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জের হাওর এলাকার লোকজনের। ফলে এখানকার বিশাল জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ বাড়িতে বসে অলস সময় কাটায়। তাদের কর্মহীনতা বাড়ে বর্ষা মৌসুমে। কারণ হাওর এলাকার বড় অংশই বছরের ৬ থেকে ৭ মাসই পানিতে নিমজ্জিত থাকে। এ সময় এলাকার কিছু লোক হাওরে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। আর পানি সরে যাওয়ার পর ডিসেম্বর থেকে শুরু হয় কৃষিকাজ, তা চলে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।

আবার এপ্রিল-মে মাসে ধান কাটা, মাড়াই, সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করার কাজ চলে। এরপর হাওরে পানি আসা শুরু হয়। আর তখন এলাকায় কোনো কাজ থাকে না। এ সময় অনেকেই কাজের সন্ধানে দেশের অন্যান্য স্থানে চলে যায়। তারপরও হাওরাঞ্চলের বিশাল জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশই স্থানীয়ভাবে কোনো কাজ না থাকায় বাড়িতে বসে অলস সময় কাটায়। ফলে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র থেকে বের হতে পারে না হাওরবাসী।

এ ছাড়া হাওরাঞ্চলে বর্ষাকালে বাড়ির চারপাশে পানি থাকায় বাড়িগুলোর আয়তন ছোট হয়ে যায়। এ সময় শাকসবজি চাষের জায়গাও থাকে না বাড়িগুলোতে। কৃষি কাজে ব্যবহৃত গবাদি পশুগুলোকে বসত ঘরের পাশে ছোট্ট টিন শেড বা খড়েরে ঘরে আড় তৈরি করে বেঁধে রাখা হয় জুন-নভেম্বর মাস পর্যন্ত। ঘরে থাকা খড় খাওয়ানো হয় পশুগুলোকে।

সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার ফেনারবাগ ইউনিয়নের গজারিয়া গ্রামের ষাট ঊর্ধ্ব কৃষক শহর আলী বলেন, ‘আমাদের হাওর এলাকায় আগের দিন অহন আর নাই। এলাকার মানুষের জীবনযাত্রায় অনেক পরিবর্তন আইছে। আগে কৃষক জমির ফসল ঘরে তুলে স্বজনদের বাড়িতে বেড়াইতে যাইত। অহন ফসল তোলার পর বিকল্প কাজের জন্য সিলেটের ভোলাগঞ্জ, বিছানাকান্দি, জাফলং যায়। আবার কিছু  মানুষ চট্টগ্রাম, গাজীপুর, টাঙ্গাইলসহ উজান এলাকায় গিয়ে কৃষিকাজ করে।’

তিনি আরো বলেন, কৃষি কাজ শেষে নিজ নিজ এলাকায় কাজের সুযোগ থাকলে এলাকার মানুষ কখনও গরিব থাকত না। বর্ষাকালে বেকার লোক বেশি থাকায় মজুরি ও কাজ কম থাকে। তাই বৈশাখে গোলায় তোলা ধান বিক্রি করে সংসার চালাতে হয়। এজন্য তাদের আয় বলতে কিছুই থাকে না।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের এক প্রকাশনা থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ১২.৯ শতাংশ অতিদরিদ্র। অথচ হাওরাঞ্চলে প্রতি ১০ জনের ৩ জনই (৩০ শতাংশ) দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। গত বছর রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত এক সেমিনারে বলা হয়, দেশের অন্যান্য অঞ্চলে যেখানে খর্বকায় শিশুর সংখ্যা ৩০.৯ শতাংশ, সেখানে হাওরে এই হার ৪৬.৬ শতাংশ। হাওরে কম ওজনের শিশুর হার ৪৪.৫ শতাংশ। অথচ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে এই হার ৩৪.১ শতাংশ। আবার বন্যাপ্রবণ এলাকায় পরিবারপিছু আয় অন্য এলাকার পরিবারের চেয়ে ১৬ শতাংশ কম। জলাবদ্ধতা, লবণাক্ততা ও স্বতন্ত্র ভৌগলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে হাওর ও উপকূলীয় এলাকায় এ চিত্র লক্ষ্যণীয়।

আন্তর্জাতিক গবেষণা অংশীদার লানসা ও ব্র্যাক যৌথভাবে ওই সেমিনারের আয়োজন করেছিল। এতে পৃষ্ঠপোষক হিসেবে ছিল যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা ইউকেএআইডি।

নেত্রকোনার খালীয়াজুরী উপজেলার চাকুয়া ইউনিয়নের শালদিঘা গ্রামের কৃষক সুবল রায় জানান, প্রায় ১৬ একর জমিতে বোরো আবাদ করে এ বছর তিনি ৪০০ মণ ধান পেয়েছেন। এ থেকে সংসারের খরচ, আগামী বছরের কৃষিকাজের খরচ, কৃষিশ্রমিকের মজুরি, সন্তানদের লেখাপড়ার খরচসহ যাবতীয় খরচ মেটাতে হয়। তাই আগামী বোরো মৌসুমের ধান কেটে ঘরে তোলার আগেই তাঁর এ ভান্ডার খালি হয়ে যাবে।

সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার মধ্যনগর ইউপি চেয়ারম্যান প্রবীর বিজয় তালুকদার বলেন, হাওর এলাকার মানুষ সম্পূর্ণ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এখানে সারাবছর কৃষি কাজের সুযোগ নেই। মানুষ বছরে একবার উৎপাদন করে আর সারাবছর সেই ফসলের ওপর নির্ভর করে চলে। তাই বৈশাখ থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত হাওরবাসী তেমন অভাবে থাকে না। কিন্তু কার্তিকের শুরু থেকে নতুন ফসল ওঠার আগ পর্যন্ত তাদের কষ্ট হয়।

তিনি বলেন, হাওর এলাকার যুবসমাজকে কাজে লাগাতে হলে কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তুলতে হবে এবং পাশাপাশি হাওর এলাকায় বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে।

সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলা সদরের বাসিন্দা ও কবি সাহিত্যিক আনিসুল হক লিখন বলেন, হাওর এলাকায় দক্ষ জনশক্তি গড়ে উঠছে না। ছেলেমেয়েরা প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা থেকে জীবনমুখী কার্যকর কোন শিক্ষা পাচ্ছে না। তাই শিক্ষিত হলেও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হচ্ছে না। কর্মমুখী শিক্ষার অভাবে তারা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অবদান রাখতে পারছে না। এমনকি পরিবারের আয় উন্নতিতে তাদের কোনো ভূমিকা নেই। তাই হাওর এলাকায় কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করে বেকার যুবসমাজকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। তাহলে স্থায়ীভাবে দারিদ্র্য বিমোচনের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

এ বিষয়ে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. শহীদ ইকবাল কালের কণ্ঠকে বলেন, হাওর এলাকার মানুষকে অতিমাত্রায় কৃষি নির্ভরতা থেকে মুক্তি দিতে হবে। কারণ একমাত্র কৃষির ওপর নির্ভশীল হয়ে থাকার জন্য দারিদ্র্য বিমোচন হচ্ছে না। হাওরে ধান আবাদের পাশাপাশি বিকল্প ফসল উৎপাদনের কথা ভাবতে হবে। এ ছাড়া অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে নাগরিক সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত তারা। যার সরসরি প্রভাব পড়ছে হাওরবাসীর অর্থনৈতিক জীবনে। তাই হাওর এলাকার সড়ক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক ভালোভাবে তৈরি করতে হবে। যেন সারাবছর কৃষক তার পণ্য উৎপাদন করে বিপণন করতে পারেন।

সুনামগঞ্জ ১ আসনের সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হাওর এলাকায় বর্তমান সরকারের আমলে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন হচ্ছে। অনেক ব্রিজ, কালভার্ট, তৈরি করা হচ্ছে। সীমান্ত সড়ক নির্মাণের কাজও শুরু হবে। এ ছাড়াও হাওর এলাকার যুব সমাজের বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষে সরকার ইতোমধ্যে ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটন কেন্দ্র স্থাপণসহ গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আর এগুলো বাস্তবায়ন হলে হাওরবাসীর দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়ক হবে বলে আমি মনে করি।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা