kalerkantho

চামড়া কিনে বিপাকে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক, বগুড়া   

১৮ আগস্ট, ২০১৯ ২১:৫০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



চামড়া কিনে বিপাকে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা

ছবি: কালের কণ্ঠ

কোরবানির পশুর চামড়া কিনে বিপাকে পড়েছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। বগুড়ার শহরের চামড়া গুদাম এলাকার আড়ৎগুলোতে কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণে লবণ মাখিয়ে রাখা হচ্ছে। আড়তদাররা অপেক্ষায় আছেন বড় মহাজনদের। বগুড়া জেলার সর্বত্র এবার কোরবানির পশুর চামড়া অনেক কম দামে কেনাবেচা হয়েছে। অনেকে তাদের চামড়া বিক্রি না করে নষ্ট করায় বিগত সময়ের চাইতে এবার চামড়া সংগ্রহ হয়েছে কম। যেখানে প্রতিবছর দেড় লাখ পিস চামড়া সংগ্রহ হয়, সেখানে এবার চামড়া সংগ্রহ হয়েছে মাত্র ৬০ হাজার পিস। এর মধ্যে আবার ঢাকার এপেক্স কম্পানি হয়ে ১৫ হাজারের বেশি চামড়া কেনা হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনেক ফড়িয়া সরাসরি বগুড়া জেলা ছাড়াও আশেপাশের জেলাগুলো থেকে চামড়া কিনে শহরের আড়ৎগুলোতে বিক্রি করেছেন।

চামড়া মালিক সমিতি সূত্র জানায়, পুঁজি সংকটের কারণে অন্যান্য বারের চাইতে এবার চামড়া সংগ্রহের পরিমাণ তিন ভাগের একভাগ মাত্র। যেসব চামড়া বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে এখন সেগুলো লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করে রাখা হচ্ছে।

জেলা চামড়া ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মতিন জানান, তিনি নিজেই প্রতিবছর ১৮ হাজার থেকে ২০ হাজার পিস চামড়া কিনে থাকেন। এবার বকেয়া আদায় না হওয়া, ব্যাংক থেকে লোন না পাওয়ায় পুঁজি সংকটের কারণে কোনো চামড়া কিনেননি। এ রকম আরো অনেকেই চামড়া কেনা থেকে বিরত ছিলেন।

চামড়া মালিক সমিতির তথ্য অনুসারে বগুড়া জেলায় সমিতির সদস্য রয়েছেন তিন শতাধিক। এর মধ্যে বেশির ভাগই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। এরা বগুড়াতে কিনে বগুড়ার বড় মহাজনদের কাছেই আবার সেই চামড়া বিক্রি করেন। এছাড়া সরাসরি ঢাকার বিভিন্ন কম্পানি ও ট্যানারি মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে ব্যবসা করেন এমন ব্যবসায়ীর সংখ্যা মাত্র ২৫ জন।

বগুড়ার পাইকারি চামড়া কিনেছেন এমন ব্যবসায়ীদের মধ্যে রয়েছেন লাল মিয়া, আপেল, মুকুল মিয়া, বজলু সরকার, সিরাজুল ইসলাম, দুপচাচিয়ার তোজাম মিয়া ও শেরপুরের আসাদ। রবিবার দুপুরে শহরের চামড়া গুদাম লেনে তবারক সরকার নামের এক ব্যবসায়ীর গুদামে গিয়ে দেখা গেছে সেখানে কোরবানির চামড়াগুলো স্তুপাকারে রাখা হয়েছে। সেগুলো লবণ দিয়ে প্রক্রিয়াজাত করা হয়েছে।

এবারের কোরবানির মৌসুমে সরকার গত বছরের মতো গরুর কাঁচা চামড়া প্রতি বর্গফুট ঢাকার বাইরে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। খাসির কাঁচা চামড়ার দাম সারা দেশে ১৮ থেকে ২০ টাকা এবং বকরির কাঁচা চামড়ার দাম সারা দেশে ১৩ থেকে ১৫ টাকা নির্ধারণ করে দেয়। সেই হিসেবে একটি বড় গরুর চামড়ার দাম দাঁড়ায় ৯৫০ থেকে ১০০০ টাকা। কিন্তু জেলার কোথাও বড় গরুর চামড়া ৬০০ টাকার বেশি দামে বিক্রি হয়নি।

এখন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা লোকসান থেকে কিভাবে বের হতে পারেন সে সম্পর্কে জানতে চাইলে বগুড়া জেলা চামড়া ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জানান, যদি পর্যাপ্ত লবণ দিয়ে তারা চামড়াগুলো সংরক্ষণ করেন, তাহলে আড়ত থেকে সরকার নির্ধারিত দাম পাবেন। আর তা না করে হুজুগে পড়ে চামড়া বিক্রি করে দিলে কারোরই কিছু করার থাকবে না।

সান্তাহার চা বাগান এলাকায় দারুল উলুম মাদরাসার হিসাব রক্ষক মকতেব আলী জানান, এবারে এলাকাবাসীরা কোরবানির পশুর ৩২৮টি গরু, ২০৯টি ছাগল ও ৩০টি ভেড়ার চামড়া দান করেছেন। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক ছিল বড় মাপের চামড়া। এবার চামড়ার দাম বেশি পাওয়া যাবে না তাই চামড়াগুলো খুব দ্রুত বিক্রি করা হয়। দাম মিলেছে গড়ে ৪৫০ টাকার মতো। এছাড়া ছাগলের চামড়াগুলো ২০ টাকা এবং ভেড়ার চামড়াগুলো ১০ টাকায় স্থানীয় চামড়া ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করা হয়েছে।

সান্তাহার মালগুদাম এলাকার চামড়া ব্যবসায়ী জামাদুল ইসলাম জানান, বিভিন্নভাবে মূলধন সংগ্রহ করে প্রায় ১ হাজার পিস চামড়া কিনেছেন। তা এখন লবণ মাখিয়ে রাখছেন। মহাজনদের কাছ থেকে বিগত বছরের বকেয়া একটি টাকাও এবার পাননি।

তিনি স্বীকার করেন যে, কোথাও কোথাও চামড়া নেননি ব্যবসায়ীরা। তাই অনেক কোরবানিদাতা গরু ও ছাগলের চামড়া নিজেরা মাদরাসায় দান করেছেন আবার কেউ কেউ মাটিতে পুঁতে ফেলেছেন বা পানিতে ফেলে দিয়েছেন।

শহরের সুলতানগঞ্জ পাড়ার মৌসুমি ক্ষুদ্র চামড়া ব্যবসায়ী পল্লব জানান, আমরা লোকসানের মুখে পড়েছি চামড়া কিনে। কারণ যে দামে আমরা চামড়া কিনেছি মহাজনরা ঈদের প্রায় এক সপ্তাহ পরেও সে দামে নিতে চাচ্ছেন না। তাই আমরাও ক্ষতিগ্রস্ত।

বগুড়ার চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, সাধারণ ক্রেতা-বিক্রেতার মতো চামড়া ব্যবসায়ীরাও কোরবানির চামড়ার বাজার নিয়ে চিন্তিত। কয়েক বছর ধরে অব্যাহত চামড়ার দরপতন, প্রক্রিয়াজাত করার প্রধান কাঁচামাল লবণের দ্বিগুণ মূল্য বৃদ্ধি, শ্রমিকের বাড়তি মজুরির চাপ এবং গত বছরের বকেয়া টাকা পরিশোধ না করার কারণে বগুড়ায় চামড়ার বাজারে ধস দেখা দিয়েছে। এছাড়া ঢাকায় ট্যানারি স্থানান্তরজনিত কারণে ট্যানারি মালিকরা চামড়া কিনতে ততটা আগ্রহী হচ্ছেন না।

বগুড়া জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির কোষাধ্যক্ষ জাহিদুর রহমান মুক্তা জানান, শত কোটির স্থলে এবার জেলায় চামড়া ব্যবসায়ীরা ২৫ কোটি টাকার চামড়া কিনেছেন। তারাও এখন শঙ্কিত চামড়া কিনে লোকসানের আশঙ্কায়।

মহাজনরা জানান, চামড়া সংগ্রহ করে প্রক্রিয়াজাত করণে খরচ পড়ে সব মিলে আড়াই শ টাকার মতো। কারণ চামড়ার ধরণ বুঝে মাংসল স্থানে লবণ মাখিয়ে এর গুণাগুণ ঠিক রাখা সম্ভব। গরু বা মহিষের চামড়ার ক্ষেত্রে নাগরা সোল চামড়ায় তিন থেকে পাঁচ কেজি, ঢিলা চামড়ায় দুই থেকে চার কেজি এবং কুরুম চামড়ায় দেড় থেকে তিন কেজি লবণ লাগাতে হবে। ছাগল বা ভেড়ার চামড়ার ক্ষেত্রে স্টার চামড়ায় আধা কেজি, হেভি ও মেল চামড়ায় ২৫০ গ্রাম লবণ দিতে হবে। এভাবে লবণ মাখিয়ে চামড়াগুলো ভাঁজ করে একটির ওপর আরেকটি স্তুপাকারে রাখা হয়। লবণের পর্যাপ্ততা না থাকলে লবণ ও পানির মিশ্রণের সাহায্যেও চামড়াকে কিছুদিনের জন্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাত করার প্রথম ধাপ হলো পরিমাণ মতো লবণ প্রয়োগ। তবে তার আগে চামড়া থেকে উচ্ছিষ্ট মাংস ভালোভাবে কেটে সরিয়ে ফেলতে হবে। একটি মাঝারি সাইজের গরুর চামড়ায় লবণ লাগে ৫ থেকে ৬ কেজি এবং বড় সাইজের গরুর চামড়ায় লবণ লাগে ৮ থেকে ১০ কেজি। ছাগলের চামড়ায় লবণ লাগে চার থেকে পাঁচ কেজি। আর মহিষের চামড়ায় লাগে ১০ থেকে ১৫ কেজি। চামড়ায় সঠিক পরিমাণে দেশীয় লবণ ব্যবহার করা হয়। ভারতীয় লবণে বিভিন্ন ধরনের কৃত্রিম দ্রব্য মিশ্রিত থাকে। ফলে লবণের গুণগত মান নষ্ট হয়ে যায়। 

এবার কোরবানির আগে যে লবণের বস্তার (৭৩ কেজি) দাম ছিল ৬৫০ টাকা। এবার কক্সবাজারে পাইকারি মোকামেই সেই লবণের দাম প্রতিবস্তা ৭৩০ টাকা। এই একই বস্তা বগুড়াতে বিক্রি হয়েছে ৮০০ থেকে ৮৩০ টাকা বস্তা দামে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা