kalerkantho

বুধবার । ২১ আগস্ট ২০১৯। ৬ ভাদ্র ১৪২৬। ১৯ জিলহজ ১৪৪০

জয়পুরহাটে পানির দরে চামড়া, ক্ষুব্ধ কোরবানিদাতারা

জয়পুরহাট প্রতিনিধি   

১৩ আগস্ট, ২০১৯ ১৯:২১ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



জয়পুরহাটে পানির দরে চামড়া, ক্ষুব্ধ কোরবানিদাতারা

কোরবানি ঈদের পর চামড়া বিক্রি করতে এসে দাম পাচ্ছেন না বিক্রেতারা। গত বছরের অর্ধেকেরও কম দামে এবার বিক্রি হচ্ছে চামড়া। গত বছর যেখানে ছাগলের চামড়া প্রকারভেদে বিক্রি হয়েছে ৫০ থেকে ৭০ টাকায়, এবার সেই চামড়া বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ৩০ টাকায়। আবার গরুর চাড়মা বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ৩০০ টাকায়। অথচ গত বছর গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায়। 

চামড়ার বাজারে এমন ধস নামার কারণ জানতে চাইলে স্থানীয় চামড়া ব্যবসায়ীরা জানান, ট্যানারি মালিকদের কাছে বকেয়া টাকা না পাওয়া এবং ক্রয়কৃত চামড়া নগদমূল্যে বিক্রির নিশ্চয়তা না পাওয়ার কারণেই তারা পুঁজি হারানোর ভয়ে চামড়া কিনছেন না। আর মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীদের অভিযোগ গত দুই বছর ধরে টানা লোকসানের কারণে এবার তারা চামড়া কিনতে ভয় পাচ্ছেন। ফলে তারা এবার নামমাত্র মূল্যে চামড়া কিনছেন। এতেও তারা লোকসানের আশঙ্কা করছেন। জয়পুরহাটের বিভিন্ন হাট ঘুরে চামড়া কেনা-বেচার এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

জেলা প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রে জানা গেছে, এবার কোরবানি ঈদে জেলায় মোট গরু-ছাগলের চাহিদা ছিল এক লাখ ৩০ হাজার। যার মধ্যে ৫০ হাজার গরু এবং ৮০ হাজার ছাগল। আর গত বছর চাহিদা ছিল এক লাখ ২৫ হাজার। 

জানা গেছে, গত দুই বছর আগেও চামড়ার বাজারে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকায় গরু এবং আড়াই শ থেকে তিন শ টাকায় বিক্রি হয়েছে ছাগলের চামড়া। প্রতি কোরবানি ঈদে এসব চামড়া বিক্রির টাকা বিতরণ করা হয় মসজিদ, মাদরাসা এবং হতদরিদ্রদের মাঝে। কিন্তু দুই বছর থেকে দাম কমে যাওয়ায় সেই দান বাধাগ্রস্ত হওয়ায় প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয় কোরবানিদাতারা। তাদের আশা ছিল এবার বুঝি কিছুটা হলেও চামড়ার দাম বাড়বে। কিন্তু সে আশায় গুড়েবালি। বরং এবার সবচেয়ে কম দামে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে কোরবানিদাতারা। গত বছর ছাগলের চামড়া প্রকারভেদে ৬০ থেকে সর্বোচ্চ ১০০ টাকা এবং গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে ৬০০ থেকে সর্বোচ্চ হাজার টাকা দরে। যদিও মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীদের জোরালো অভিযোগ ছিল, গত দুই বছর ধরে চামড়া কিনে তারাই সবচেয়ে বেশি লোকসান করেছেন। তাই এবার তারা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে চামড়া কিনছেন, যাতে তাদের এবারো লোকসানে পড়তে না হয়। এবার ছাগলের চামড়া সর্বোচ্চ ৩০ টাকা আর গরুর চামড়া ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ৩০০ টাকায় তারা কিনছেন। 

গত বছরের বাজার অনুযায়ী জেলায় এক লাখ ২৫ হাজার গরু ও ছাগলের চামড়া বিক্রি হয়েছে আনুমানিক ৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকায়। এবার কম দামের কারণে এক লাখ ৩০ হাজার গরু ও ছাগলের চামড়া বিক্রি হয়েছে আনুমানিক এক কোটি ১৬ লাখ টাকায়। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এ বছর কোরবানি ঈদে ৩ কোটিরও বেশি টাকার সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত হয়েছে জেলার মসজিদ, মাদরাসা ও হতদরিদ্ররা। 

ঈদের দিন জয়পুরহাট শহরের কেন্দ্রীয় মসজিদ চত্বরে মাত্র ২০ টাকায় ছাগলের চামড়া বিক্রি করেন সবুজনগর মহল্লার মজিবর রহমান। তিনি বলেন, গরিবদের দান করার জন্য ছাগলের চামড়া বিক্রি করতে এসে দাম শুনে হতবাক হয়েছেন। জীবনে এত কমদামে তিনি চামড়া বিক্রি করেননি। একই অভিযোগ করেন শহরের বাসস্ট্যান্ড এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, দাম না পেয়ে মাত্র দেড় শ টাকায় তিনি গরুর চামড়া বিক্রি করেছেন। অথচ কোরবানির জন্য ৭৫ হাজার টাকা দিয়ে তিনি গরু কিনেছিলেন। চামড়ার দাম কমে যাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, গরিবদের হক এভাবে তছরুপ হওয়া ঠিক নয়। এ বিষয়ে সরকারের জোরালো নজরদারির দাবি জানান তিনি।

মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা জানান, গত দুই বছর ধরে চামড়া ব্যবসায় তারা লোকসান গুনছেন। অনেকের তহবিলও তছরুপ হয়েছে। এ জন্য এবার লোকসানের ভয়ে তারা চামড়া কিনতে সাহস পাচ্ছেন না। তাই ছাগলের চামড়া সর্বোচ্চ ২০ টাকায় এবং গরুর চামড়া ১০০ থেকে দেড় শ টাকার মধ্যে তারা কিনছেন। তারপরও তাদের লোকসান আতঙ্ক কাটছে না।

পুরাতন চামড়া ব্যবসায়ী পাঁচবিবির স্টেশন এলাকার সাদেকুর রহমান বলেন, হাজারীবাগে ট্যানারি মালিকদের কাছে তার পাওনা ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা। কিন্তু সেই টাকা না পেয়ে জমি বিক্রি করে ব্যাংক ঋণ শোধ করেছি। পুঁজির অভাবে ব্যবসা করতে পারছি না।

পাঁচবিবির গোহাটি এলাকার চামড়ার বড় ব্যবসায়ী ওহিদুল হোসেন জানান, ট্যানারি মালিকদের কাছে তার পাওনা রয়েছে ৮০ লাখ টাকা। ঈদের মধ্যে তিনি পেয়েছেন মাত্র ১১ লাখ টাকা। চামড়া কিনতে গেলে প্রায় কোটি টাকার প্রয়োজন। আবার বিক্রি করতে গেলে ট্যানারি মালিকরা নগদ টাকা দিতে চান না। তাই এ ব্যবসার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে গেছে। তিনি বলেন, শুধু আমি না, জেলার অধিকাংশ ব্যবসায়ী টাকা পাবেন ট্যানারি মালিকদের কাছে। যার পরিমাণ প্রায় ৬ কোটি টাকা। ক্রমাগত লোকসান আর পুঁজি সঙ্কটের কারণে চামড়া ব্যবসায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে ব্যবসায়ীরা। ফলে চামড়ার দাম কমে যাচ্ছে।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা, মাহফুজার রহমান বলেন, জেলায় এ বছর কোরবানিযোগ্য গরু ও ছাগলের চাহিদা ছিল এক লাখ ৩০ হাজার। আমাদের প্রস্তুতি ছিল দেড় লাখের।
 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা