kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২২ আগস্ট ২০১৯। ৭ ভাদ্র ১৪২৬। ২০ জিলহজ ১৪৪০

বিরামপুরের বেপারীটোলা আদর্শ কলেজ

খাতায় শিক্ষার্থী, বাস্তবে নেই

কলেজের অধ্যক্ষ অন্য মাদরাসার সিনিয়র রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রভাষক কলেজটিতে দীর্ঘ দীর্ঘ দিন কোনো ক্লাস হয়নি। খাতায় শিক্ষার্থীর নাম থাকলেও বাস্তবে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম। শিক্ষক কর্মচারী অনেক থাকলেও কলেজে আসেন না।

দিনাজপুর ও বিরামপুর প্রতিনিধি    

২১ জুলাই, ২০১৯ ২২:১১ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



খাতায় শিক্ষার্থী, বাস্তবে নেই

দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের শতভাগ ফেল করা সাতটি কলেজের মধ্যে দিনাজপুর জেলার বিরামপুর উপজেলার বেপারীটোলা আদর্শ কলেজ একটি। যে কলেজটি থেকে কোনো পরীক্ষার্থী এবার পাস করেনি। কলেজটিতে অধ্যক্ষ, শিক্ষক ও কর্মচারী মিলে জনবল ২২ জন হলেও এবারের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিল মাত্র ২ জন।

ওই কলেজ থেকে ২০১৮-১৯ সেশনে এইচএসসি পরীক্ষায় এবার পাঁচজন শিক্ষার্থীর নাম রেজিস্ট্রেশন করলেও দুজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে দুজনই ফেল করে। এর আগে ২০১৭-১৮ সেশনে তিনজন পরীক্ষার্থীর রেজিস্ট্রেশন করে একজন শিক্ষার্থী পাস করে। কলেজটি ২০১৬-১৭ সেশনে ৬ জন পরীক্ষার্থীর রেজিস্ট্রেশন করলেও সে বছর কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি।

বেপারীটোলা আর্দশ কলেজটির নির্মাণ কার্যক্রম ২০০১ সালে নভেম্বর মাস থেকে শুরু হয়। পাঠদান শুরু হয় ২০০২ সালে। কলেজটি ২ একর ২৯ শতক জমি নিয়ে প্রতিষ্ঠিত। রয়েছে সুবিশাল ক্যাম্পাস ও ভবন। তবে প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘ সময়েও এমপিওভূক্তকরা সম্ভব হয়নি। কাগজে কলমে বর্তমানে ওই কলেজে এইচএসসি ২য় বর্ষে শিক্ষার্থী রয়েছে ৫৫ জন। যার মধ্যে মানবিক শাখা ৪১ জন, বিজ্ঞান শাখায় ৩, বাণিজ্যিক শাখায় ১১জন। এবছর একাদশ শ্রেণিতে তিন শাখা মোট ৪২ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে।

সরেজমিনে বেপারীটোলা আর্দশ কলেজ গিয়ে দেখা যায়, অফিস রুম যথারীতি খোলা। কিন্তু কলেজের সকল শ্রেণিকক্ষের দরজায় তালা ঝুলছে। কলেজের বারান্দার দক্ষিণ অংশে বেশকিছু উঠতি বয়সের ছেলেরা বসে আড্ডা দিচ্ছে। বারান্দার মাঝ বরাবর কিছু ছাগল ছানা বেশ আয়েশে ঘুমাচ্ছে।

এই প্রতিবেদকদের দেখে নজরুল ইসলাম ও নুর ইসলাম নামের দুই অফিস সহকারী (পিয়ন) এগিয়ে আসেন। কিন্তু কোনো শিক্ষক নেই। কথা হয় পিয়ন নজরুল ইসলাম ও নুর ইসলামের সঙ্গে। তারা জানান, প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন থেকে এমপিওভূক্ত না হওয়াই অনেক শিক্ষক ক্লাস করতে আসেন না। হাজিরা খাতায় অনেক শিক্ষার্থীর নাম থাকলেও ওই শিক্ষার্থীরা কোনোদিন ক্লাসে আসে না।

পিয়ন নজরুল ইসলাম বলেন, এখানে বেশি ভাগ মেয়ে (মহিলা) শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, যেসকল মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায় বাবা মা পড়ালেখা করাতে চায় না তাদেরকে এই কলেজে ভর্তি করে পরীক্ষা দেওয়ানো হয়। এই কারণে ওই সকল শিক্ষার্থীরা ক্লাসে আসে না।

কলেজের অধ্যক্ষ কথায় জানতে চাইলে বেরিয়ে আসে চকমে দেওয়ার মতো তথ্য। কলেজের অধ্যক্ষ মো. পলাশ হোসেন বিরামপুর উপজেলার বিজুল দারুল হুদা কামিল মাদরাসায় সিনিয়র প্রভাষক (রাষ্ট্রবিজ্ঞান) পদে চাকরি করেন। ওই প্রতিষ্ঠানে ১৯৯৮ সালে তিনি এমপিও হয়েছেন।

তখন ঘড়ির কাঁটায় ১২টা। কলেজে সাংবাদিক উপস্থিতির খবর শুনে নুরুন্নবী, তরিকুল ইসলামসহ আরো তিন শিক্ষক কলেজে উপস্থিত হন। 

পরীক্ষায় কেউ পাস করেনি বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষক তরিকুল ইসলাম বলেন, সত্য বলতে বেশ কয়েক বছর ধরে কলেজে কোনো পাঠদান হয় না। কারণ ১৫-১৬ বছর পার হলেও প্রতিষ্ঠানটি এমপিও না হওয়ায় অনেক শিক্ষক আর আগের মতো প্রতিষ্ঠানে আসেন না। এর কারণেই ওই সব শিক্ষার্থীরা ফলাফল খারাপ করছে।

ওই কলেজের আরেক শিক্ষক নুরুন্নবী বলেন, দীর্ঘদিন বেতন না হওয়ায় শিক্ষকরা কোনো না কোনো কর্মের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। আবার কেউ কিন্ডার গার্টেন স্কুলে, কেউ কোচিং সেন্টার, কেউবা টিউশনি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

ওই কলেজের শুরুর দিকে ২৭ জন শিক্ষক, কর্মচারী নিয়ে পাঠদান কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে কলেজটিতে ২২ জন শিক্ষক কর্মচারী রয়েছেন।

কলেজের অধ্যক্ষ মো. পলাশ হোসেন জানান, কলেজটি শহর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরে হওয়ায় সেখানে ভালো মানের কোনো ছাত্র-ছাত্রী পাওয়া যায় না। সে সব শিক্ষার্থী ভর্তি হয় তারা অনেকেই কর্মজীবী ও বিবাহিত। ওই কলেজটিতে গ্রামের ঝরে পড়া অসহায় ছাত্র/ছাত্রী নিয়ে চলতে হয়।

তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠার প্রায় দেড় যুগ পার হলেও এমপিও না হওয়ায় অনেক শিক্ষকের মাঝে হতাশা কাজ করায় এমনটি হয়েছে। তবে এখন ছাত্র/ছাত্রী বেশ ভালো ভর্তি হওয়ায় সামনে আর কোনো সমস্যা হবে না বলেও তিনি আশা ব্যক্ত করেন।

কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি গোলজার রহমান বলেন, ফলাফল খারাপ হওয়ার বিষয়টির মূল কারণ ক্ষতিয়ে দেখা হবে। তবে পুনরায় ফলাফল মূল্যায়নের জন্য আবেদন করা হয়েছে। তবে আমার বিশ্বাস যে দুই ছাত্র ইংরেজি বিষয়ে ফেল করেছে তারা ভালো ফল করবে।

নতুন শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি ওই কলেজের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর এখন পর্যন্ত কোনো সাধারণ সভা করা হয়নি। তাই এই বিষয়ে কোনো প্রকার মন্তব্য করা আমার সমীচীন হবে না।

জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. তৌহিদুর রহমান বলেন, কলেজটিতে এবার ফলাফলে শতভাগ ফেল করেছে বলে শুনেছি। এই বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কতৃপক্ষ যদি কোনো ব্যবস্থা নিতে বলে তখন আমরা ব্যবস্থা নেব।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা