kalerkantho

সোমবার  । ১৯ শ্রাবণ ১৪২৭। ৩ আগস্ট  ২০২০। ১২ জিলহজ ১৪৪১

বগুড়ায় বন্যাদুর্গত সোয়া লাখ মানুষ

‘যারা ইলিপ পাচ্চে না তো পাচ্চেই না’

লিমন বাসার, বগুড়া    

২১ জুলাই, ২০১৯ ০৮:২৭ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



‘যারা ইলিপ পাচ্চে না তো পাচ্চেই না’

সারিয়াকান্দি উপজেলার চন্দনবাইশা বাঁধে আশ্রয় নেওয়া হামিদুল হক পেশায় দিনমজুর। বন্যায় ঘরবাড়ি ভেসে যাওয়ায় বাঁধে এসে আশ্রয় নিয়েছে তাঁর পরিবার। তিনি ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলছিলেন, ‘যারকেরে ক্ষতি হচে, যারা গরিব, তারা এনাও (একটুকু) সাহায্য পাচ্চে না। তারকেরে খোঁজখবর কেউ ল্যায়না। ইলিপ (রিলিফ) দেওয়ার যে তালিকা করে সেটিও নিজেকের লোক খোঁজে। কে কাক ভোট দিচে সেডা কয়্যা বেড়ায়। এই জুন্নে যারা পাচ্চে তো পাচ্চেই। আর যারা ইলিপ পাচ্চে না তো পাচ্চেই না।’

ত্রাণের জন্য উপজেলার কুতুবপুর বাজারে আসা ঘুঘুমারী গ্রামের আব্দুল হকের স্ত্রী আমেনা বেগম বলছিলেন, নদীভাঙনে স্বামীর ভিটেমাটি বলতে কিছু নেই। সর্বশেষ ১৯ শতক আবাদি জমিও বিলীন হয়ে গেছে। এবার বন্যার পানিতে তাঁর শেষ সহায়-সম্বলও ভেসে গেছে। যে এলাকায় রয়েছেন সেখানে এখন পর্যন্ত এক ছটাক ত্রাণও যায়নি বলে দাবি করেন তিনি।

বন্যাদুর্গত বগুড়ার তিন উপজেলার মধ্যে সারিয়াকান্দি উপজেলার ইউনিয়নগুলোতে ত্রাণ বিতরণ নিয়ে এমন অভিযোগ কমবেশি এ রকমই।

জেলা প্রশাসন ও ব্যক্তি উদ্যোগে ত্রাণসামগ্রী দেওয়ার কথা বলা হলেও প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা তা ঠিকমতো পাচ্ছে না। এসব এলাকার মানুষ অভিযোগ করে জানায় যে অনেক প্রতিষ্ঠান নামমাত্র কিছু ত্রাণ দিয়ে ছবি তুলে বন্যার্ত মানুষকে ফিরিয়ে দিচ্ছে। দেখা যাচ্ছে এক হাজার মানুষের মধ্যে ত্রাণ পাচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ জন। স্থানীয় চেয়ারম্যান কিংবা মেম্বাররা মুখ চিনে চিনে যাদের তালিকা তৈরি করে তাদের হাতে দিচ্ছে, হাতে গোনা তারাই শুধু ত্রাণ পাচ্ছে।

সারিয়াকান্দি ছাড়াও বন্যাকবলিত হয়েছে সোনাতলা ও ধুনট উপজেলা।

বগুড়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ সূত্রে জানা গেছে, এ তিন উপজেলার ১৯টি ইউনিয়নের ১২৯টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ৩১ হাজার ৫৮৫টি পরিবারের এক লাখ ২৪ হাজার ২২০ জন মানুষ দুর্ভোগে পড়েছে। এর মধ্যে বাঁধ ও অন্যান্য স্থানে মাত্র সাড়ে তিন হাজার পরিবার আশ্রয় নিতে পেরেছে। পানি যত বাড়ছে, পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ তত বাড়ছে। পর্যাপ্ত ত্রাণ, বিশুদ্ধ পানি, শুকনা খাবার ও নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে বানভাসি এসব মানুষ এখন দিশাহারা। পানির নিচে তলিয়ে গেছে ধান, পাটসহ বহু ফসল। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা যমুনার চর এলাকার হাজার হাজার মানুষের। পানিতে ডুবে গেছে ঘরের চালা। আশ্রয় নেওয়ার মতো জায়গাটুকুও নেই এসব স্থানে।

গতকাল শনিবার সকালে যমুনা নদীর পানি কিছুটা কমে বিপত্সীমার ১১৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তবে পানি বেড়ে বাঙ্গালী নদী বিপত্সীমার ৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী হাসান মাহমুদ জানান, এই মুহূর্তে যমুনার পানি কিছুটা কমলেও বাঙ্গালীর পানি বাড়ছে। এ কারণে কিছু এলাকা নতুন করে জলমগ্ন হয়েছে।

সারিয়াকান্দি উপজেলার চালুয়াবাড়ি, হাটশেরপুর, কাজলা, কর্নিবাড়ি, বোহাইল, চন্দনবাইশা, কামালপুর ও কুতুবপুর ইউনিয়ন এবং সোনাতলা উপজেলার পাকুল্যা ও তেকানী চুকাইনগর ইউনিয়নের ক্ষতি হয়েছে বেশি। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছে উপজেলার চালুয়াবাড়ি ইউনিয়নের চরভাংগুরগাছা, চরদলিকা, চরবিরামের পাঁচগাছি, চর-আউচারপাড়া, চরখাটিয়ামারী, সুজনেরপাড়া, বহুলাডাঙ্গা, শিমুলতাইর, ফাজিলপুর, মানিকদাইড়, হাটবাড়ি, হাটশেরপুর ইউনিয়নের চরচকনতিনাথ, দীঘাপাড়া, কাজলা চরের উত্তর ও দক্ষিণ বেনুপুর, জামথৈল, টেংরাকুড়া, পাকদহ, পাকুরিয়া, ঘাঘুয়ারচর, কর্নিবাড়ি ইউনিয়নের মূলবাড়ি, তালতলা, নান্দিনারচর ও বানিয়াপাড়া এলাকার মানুষ।

চালুয়াবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শওকত আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, যমুনায় পানি বেড়ে যাওয়ায় তাঁর ইউনিয়নের ১১টি চর প্লাবিত হয়েছে। দুর্গতরা অল্প পরিমাণ ত্রাণসামগ্রী পেয়েছে। এটি প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।

সারিয়াকান্দির কামালপুর ইউনিয়নের রোহদহ, ইছামারা, চন্দনবাইশা, নিজ চন্দনবাইশা, ঘুঘুমারী, দক্ষিণ ঘুঘুমারী শেখপাড়া, ফকিরপাড়া, আকন্দপাড়া, শাকদহ ও তালুকদারপাড়ার কয়েক শ বসতবাড়ি পানির নিচে। গ্রামের পানিবন্দি মানুষ মালামাল, গরু-বাছুর নিয়ে আশ্রয় নিয়েছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে। অনেকে ঠাঁই নিয়েছে ঘরের চালে।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রফিকুল আলম বলেন, শ্রেণিকক্ষ ডুবে থাকায় তিনটি ইউনিয়নের ৮৯টি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এতে ১৫ হাজার শিক্ষার্থীর পড়ালেখায় ব্যাঘাত ঘটছে।

সরেজমিন দেখা গেছে, বন্যাকবলিত গ্রামগুলোতে কারো বাড়িতেই চুলা জ্বালানোর উপায় নেই। সম্বল শুধু শুকনা খাবার। তলিয়ে গেছে টিউবওয়েল। দুর্গত এলাকায় দেখা দিয়েছে খাবার পানির সংকট।

সরকারি তথ্য অনুসারে, তিন উপজেলায় দুই হাজার ৭৩৬টি ক্ষতিগ্রস্ত নলকূপের বিপরীতে মেরামত করা হয়েছে ৯৬টি। আর নতুন স্থাপন করা হয়েছে ২৪টি। প্রয়োজনের তুলনায় এই সংখ্যা নগণ্য হওয়ায় দুর্গত মানুষ বিশুদ্ধ পানির অভাবে মাইলের পর মাইল ছুটছে।

রোহদহ বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে আশপাশের ২০ গ্রামের অন্তত ৫০০ পরিবার। কথা হয় শরিফুন, রোজিনা, বেনু, আমেনা, আছমা খাতুন ও মেহেরুনের সঙ্গে। বাঁধের ওপরে সকালে রান্নার আয়োজন করছিলেন তাঁরা। আয়োজন বলতে ভাত আর আলুভর্তা। দেখা গেল, চুলার পাশে বালতিতে নোংরা ঘোলা পানি রাখা। জানতে চাইলে একজন বললেন, ‘কী করমু বাবা। কল নাই তো পানিও নাই। উট্টি (পাঁচ কিলোমিটার দূরে) একনা কল বসাচে। সেটি পানি আনবার গ্যালে তামান দিন যায়। রানমু কখন আর খামু কখন। এমনিতে এক বেলা খাই তো দুই বেলা না খ্যায়া থাকা লাগে। বাধ্য হইয়্যা নদী থ্যাকা পানি তুলে আন্যা রানবার লাগচি। একুন এই পানি খ্যাইয়াই জীবন বাঁচিচ্চে।’

লাল মিয়া নামের একজন জানালেন, তাঁর শিশুসন্তানসহ পরিবারের সবার ডায়রিয়া দেখা দিয়েছে। পাঁচ বছরের শিশু রবিউলের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ।

বগুড়া জেলা ত্রাণ কর্মকর্তা আজহার আলী মণ্ডল কালের কণ্ঠকে বলেন, পরিস্থিতি মোকাবেলায় তিন উপজেলায় দুই হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার এবং ৪৬৭ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আরো ১০ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার, ১০ লাখ টাকা, আর ৫০০ মেট্রিক টন চালের চাহিদা জানিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা