kalerkantho

বুধবার । ২১ আগস্ট ২০১৯। ৬ ভাদ্র ১৪২৬। ১৯ জিলহজ ১৪৪০

কমছে পানি, বাড়ছে দুর্ভোগ

ত্রাণ পৌঁছেনি মান্দার অধিকাংশ বন্যাদুর্গত মানুষের কাছে

মান্দা (নওগাঁ) প্রতিনিধি    

২০ জুলাই, ২০১৯ ০১:৩৯ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ত্রাণ পৌঁছেনি মান্দার অধিকাংশ বন্যাদুর্গত মানুষের কাছে

ছবি : কালের কণ্ঠ

বসতবাড়ির অদুরে ১৫ শতাংশ জমিতে পটলের চাষ করেছিলেন দেলবর হোসেন। তার সেই খেতে এখন কোমর সমান পানি। গত মঙ্গলবার রাতে নওগাঁর মান্দায় আত্রাই নদীর বাঁধ ভেঙে অন্য কৃষকদের মতো তার জমিও প্লাবিত হয়েছে। পানি ঢুকে পড়েছে ঘরেও। ভেঙে পড়েছে বাড়ির মাটির দেয়ালের একাংশ। এ অবস্থায় স্ত্রী, দুই ছেলে নিয়ে নিজ বাড়ি ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছেন প্রতিবেশীর ইটের তৈরি বাড়ির দোতালায়। 

ভরট্ট শিবনগর গ্রামের কৃষক বেলাল হোসেন বলেন, ‘বন্যার পানি কমতে শুরু করলেও মাঠের পানি নামতে অনেক সময় লাগবে। ফলে পাটসহ মাঠের কোনো ফসলই এই এলাকার কৃষকের ঘরে উঠবে না। বীজতলা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় আমনও রোপণ করতে পারবে না দুর্গত এলাকার কৃষক। এতে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাবে।’

নওগাঁ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্যানুসারে, আত্রাই নদীর পানি শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত জোতবাজার পয়েন্টে ৬০ সেন্টিমিটার কমে বিপদসীমার ৩০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। 

গতকাল শুক্রবার দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত মান্দা উপজেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের দাসপাড়া, ভরট্ট শিবনগর, চককামদেব, কয়লাবাড়ি, কশব ইউনিয়নের দক্ষিণ চকবালু ও বনকুড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল জব্বার, আনোয়ার হোসেনসহ ক্ষতিগ্রস্ত অন্তত ২০টি পরিবারের সঙ্গে কথা হয়। তাদের ভাষ্য, বন্যার পানিতে তাদের ফসলি জমি থেকে শুরু করে বসতভিটা প্লাবিত হওয়ায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বন্যার পানি কমতে শুরু করলেও তাদের যে ক্ষতি হয়েছে তা সহজে পূরণ হবে না। এখনো গ্রামের নলকূপগুলো ডুবে থাকায় বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র সংকট হচ্ছে। 

অধিকাংশ শৌচাগারও ডুবে গেছে। ফলে পানিতে সারতে হচ্ছে প্রাকৃতিক কাজ। মানুষের কাজকর্ম নেই। আরো কিছুদিন বন্যা স্থায়ী হলে চরম বিপাকে পড়বে দুর্গত এলাকার মানুষ।   

বন্যাদুর্গতদের অভিযোগ, এখন পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের ত্রাণ সহায়তা তাদের কাছে পৌঁছেনি। ফলে অধিকাংশ বন্যাদুর্গত মানুষ খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন। 

নুরুল্লাবাদ ইউনিয়নের চকহরি নারায়ণ গ্রামের বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, ‘দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালাই। বন্যার কারণে তিন দিন কোনো কাজ নাই। বাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিতে হয়েছে। পকেটে চাল কেনার মতো কোনো টাকা নেই। 

চেয়ারম্যান-মেম্বাররা এখন পর্যন্ত আমাদের খোঁজ-খবর নেয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ত্রাণ সামগ্রী পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। 

বিষ্ণুপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য গোলাম আযম বলেন, ‘তার ওয়ার্ডের চারটি গ্রামের প্রায় ৯০ ভাগ বাড়িতে পানি ঢুকে অন্তত ৪০০ পরিবার বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। তারা এখন মানবেতর জীবনযাপন করছে। দুর্গত এলাকার লোকজন খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছে। সরকারিভাবে যেটুকু সহায়তা পাওয়া গেছে চাহিদার তুলনায় তা একেবারেই অপ্রতুল।  

বিষ্ণুপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আমার ইউনিয়নের ১৩টি গ্রাম বন্যাকবলিত। এতে ৩ হাজার ৭৯৩ পরিবার বন্যায় চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। বন্যার্ত মানুষের মাঝে দ্রুত ত্রাণ দেওয়া প্রয়োজন।’ তিনি আরো বলেন, ‘বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। আগামীকাল-পরশু ইউএনও কার্যালয়ে তা জমা দেওয়া হবে।’

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ৬০০ পরিবারকে ত্রাণ সহায়তা দেয়ার একটা তালিকা করা হয়েছে। তবে এটি অপূর্ণাঙ্গ তালিকা। এজন্য অনেক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের কাছে ত্রাণ পৌঁছেনি। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের দেয়া তথ্যানুসারে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পূর্নাঙ্গ তালিকা তৈরির কাজ চলছে। ক্ষতিগ্রস্ত সবাইকেই ত্রাণ সহায়তা দেয়া হবে।’ 

এদিকে শুক্রবার সকালে রাজশাহীর অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার আনওয়ার হোসেন পারনুরুল্লাবাদ এলাকায় ১০০ দুর্গত মানুষের মাঝে শুকনো খাবার বিতরণ করেছেন। এসময় নওগাঁর ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক গোলাম মো. শাহনেয়াজ, উপজেলা চেয়ারম্যান সরদার জসিম উদ্দিন, উপজেলা নির্বাহী অফিসার খন্দকার মুশফিকুর রহমান, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান গৌতম কুমার মহন্ত ও মাহবুবা সিদ্দিকা রুমা, উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) এসএম হাবিবুল হাসান, ইউপি চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মন্ডল ও জাহাঙ্গীর আলমসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার রাতে মান্দা উপজেলার কশব ইউনিয়নের চকবালু নামকস্থানে আত্রাই নদীর ডান তীরের বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। উপজেলা প্রশাসনের দেয়া তথ্যানুসারে এবারের বন্যার পানিতে ৯৩০ হেক্টর জমির রোপা আমন ধানের বীজতলা ও শস্য খেত তলিয়ে গেছে। ১৫০টি পুকুর ও জলাশয়ের মাছ পানিতে ভেসে গেছে। ২৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষাকার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এছাড়া ৭টি ব্রিজ-কালভার্ট, ৭টি পাকারাস্তার ৫২ দশমিক ৮৯ কিলোমিটার আংশিক ক্ষতিগ্রস্তসহ ১৬৫টি নলকূপ ও ২০০ টি শৌচাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা