kalerkantho

মৃত্যু নিয়ে বিতর্ক, ১৩ দিন পর স্কুলছাত্রীর লাশ উত্তোলন

কুলাউড়া (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি   

১৯ জুলাই, ২০১৯ ০০:৩৮ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মৃত্যু নিয়ে বিতর্ক, ১৩ দিন পর স্কুলছাত্রীর লাশ উত্তোলন

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার বরমচাল ইউনিয়নে মৃত্যুর রহস্য উদঘাটনে ১৩ দিন পর কুলসুমা বেগম তসলিমা নামে এক স্কুলছাত্রীর লাশ কবর থেকে উত্তোলন করা হয়েছে।

মৌলভীবাজার জেলা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে বৃহস্পতিবার দুপুরে জেলা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নেছার উদ্দিনের উপস্থিতিতে বরমচাল ইউনিয়নের মহলাল (রফিনগর) গ্রামে কবরস্থান থেকে স্কুল ছাত্রীর লাশ উত্তোলন করা হয়। এর আগে ১২ জুলাই লাশ উত্তোলনের অনুমতি চেয়ে আদালতে আবেদন করে কুলাউড়া থানা পুলিশ।

স্থানীয় এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, স্কুলছাত্রী কুলসুমা বেগম তসলিমা (১৭) মৃত্যু নিয়ে নানা বির্তক সৃষ্টি হয় কুলাউড়ায়। মৃত্যুর রহস্যময় বিষয় বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চাউর হলে নড়েচড়ে থানা প্রশাসন। মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কাগজপত্র চাইলে তা দেখাতে ব্যর্থ হয় মেয়েটির পরিবার। প্রেমিকের সাথে দেখা করার পর গ্রাম পুলিশ কর্তৃক বাড়ি পৌঁছে দেওয়া, পরে অসুস্থ, অতঃপর পরিবারের দাবি স্ট্রোক করে মৃত্যু হয় ওই কিশোরীর। মৃত্যুর পর দ্রুততার সাথে দাফন সম্পন্ন করে তার পরিবার। এতে সন্দেহ দেখা দেয় স্থানীয়দের মাঝে। ধুম্রজাল সৃষ্টি হয় মানুষের মনে।

এলাকাবাসীর অনেকে জানিয়েছেন, মৃতদেহের শরীরের গলায় এবং গালে আঘাতের চিহ্ন ছিল। তাদের ধারণা তসলিমাকে হত্যা করা হয়েছে।

উপজেলার বরমচাল উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের ৮ম শ্রেণির ছাত্রী কুলসুমা বেগম তসলিমা। ৪ জুলাই বৃহস্পতিবার সকাল আনুমানিক ১১টায় স্কুল ড্রেস পরিহিত ও স্কুলব্যাগসহ তসলিমা বরমচাল রেলস্টেশন সংলগ্ন কালা মিয়ার বাজারের একটি বাসায় প্রেমিক নওমুসলিম আব্দুল আজিজের সাথে দেখা করতে যায়। বিষয়টি বাজারবাসীর সন্দেহ হলে গ্রাম পুলিশ কয়ছর মিয়াসহ ব্যবসায়ীরা ওই বাসায় যান। বাসায় গিয়ে ওই স্কুলছাত্রীর পরিচয় নিশ্চিত করার পর ব্যবসায়ীরা গ্রাম পুলিশ কয়ছর মিয়াকে দিয়ে তসলিমাকে মহলাল (রফিনগর) গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেন।

স্থানীয়রা জানান, সকালের ঘটনার পর বিকেল আনুমানিক ৫টায় একটি সিএনজি অটোরিকশা করে সিলেট ওসমানী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে বাড়ির লোকজন তসলিমাকে নিয়ে বেরিয়ে যান। রাতে একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে আবার ফেরৎ আসেন। আসার পর এলাকার মানুষকে জানান, তসলিমার হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ (স্ট্রোক করে) হয়ে মারা গেছেন। পরদিন শুক্রবার লাশের ময়নাতদন্ত ছাড়া এবং পুলিশকে অবহিত না করে তসলিমার লাশ এলাকায় মাইকিং করে সকাল ১১ টায় দাফন করা হয়। তসলিমার লাশ দেখা মহিলারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তসলিমার গালে একটা আচড় এবং গলায় আঙ্গুল দেবে যাওয়ার চিহ্ন সুস্পষ্ট ছিল।

তসলিমার প্রেমে পড়ে হিন্দু থেকে মুসলমান হয়েছে একটি ছেলে। তার বর্তমান নাম আব্দুল আজিজ (মুসলিম হওয়ার আগের নাম লিটন দাস)। তিনি পেশায় কাঠমিস্ত্রী। কাজের সুবাদে তসলিমাদের বাড়িতে যাতায়াত এবং ঘনিষ্টতা। সেই সুবাদে গত ২ বছর থেকে তসলিমার সাথে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আব্দুল আজিজের সাথে ক্রমে তসলিমাদের পরিবারের সদস্যদের সখ্যতা গড়ে উঠে। তসলিমার প্রেমে আসক্ত আব্দুল আজিজ ৬ মাস আগে অর্থাৎ গত মাঘ মাসে হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে মুসলমান হন। তসলিমার মা মারা যাওয়ার আগে ৪ দিন তার সাথে সিলেট ওসমানী হাসপাতালে সার্বক্ষণিক ছিলেন। তসলিমার বাবা জহুর উদ্দিন স্ত্রীর মৃত্যুর পর দেশে ফিরে হৃদরোগে আক্তান্ত হলে আব্দুল আজিজ তাকে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করান। চিকিৎসা ব্যয়ভারও বহন করেন। তার কাছ থেকে ধাপে ধাপে ২৫ হাজার টাকা ধার নিয়েছে তসলিমার পরিবার। তসলিমার সাথে আব্দুল আজিজের সম্পর্কের বিষয়টি জেনে জহুর উদ্দিন দু’জনকে মারপিটও করেন। এরপর থেকে উভয়ের দেখা সাক্ষাৎ কমে যাওয়ায় ঘটনার দিন অর্থাৎ ৪ জুলাই বৃহস্পতিবার তসলিমা বাজারে আসে আব্দুল আজিজের সাথে দেখা করতে।

বরমচাল ইউনিয়নের গ্রাম পুলিশ কয়ছর মিয়া জানান, কালামিয়ার বাজারে পাশে আব্দুল আজিজের ভাড়াটিয়া বাসায় তসলিমাকে পাওয়ার পর তার চাচা জয়নাল মিয়াকে ফোন দেই। তিনি তসলিমাকে বাড়িতে নিয়ে দেওয়ার কথা বলেন। আমি তসলিমাকে বাড়িতে দিয়ে আসি। কিন্তু বিকেলে শুনি তসলিমা স্ট্রোক করে মারা গেছে। এটা কি করে সম্ভব?

নিহত তসলিমার বাবা জহুর উদ্দিন জানান, ঘটনার দিন তিনি বাড়িতে ছিলেন না। বাড়িতে ফিরে মেয়েকে অসুস্থ অবস্থায় বৃহস্পতিবার আছরের পর ওসমানী হাসপাতালে নিয়ে গেলে একঘণ্টা পর তসলিমার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর ২-৩ দিন পর পুলিশ বাড়িতে এসেছিল। বৃহস্পতিবারে কালামিয়ার বাজারে কি ঘটেছে, তা তিনি জানেন না।

এ ব্যাপারে কুলাউড়া থানার অফিসার ইনচার্জ মো. ইয়ারদৌস হাসান বলেন, জেলা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে কবর থেকে তসলিমার লাশ উত্তোলন করে মৌলভীবাজার মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে। ময়না তদন্তের রিপোর্ট আসলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা