kalerkantho

শুক্রবার । ২৩ আগস্ট ২০১৯। ৮ ভাদ্র ১৪২৬। ২১ জিলহজ ১৪৪০

বানভাসির আর্তনাদ

আমগোর কষ্ট কেউ দেহে না

শ্রীবরদী (শেরপুর) প্রতিনিধি   

১৮ জুলাই, ২০১৯ ২০:০২ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আমগোর কষ্ট কেউ দেহে না

ছবি : কালের কণ্ঠ

‘সাত আট দিন অইলো এক বেলাও ঠিক মতো খাইতে পাই না। চুলাডাও পানিতে ডুবছে। আর কয়দিন এমনে থাহবো আল্লায় জানে। আমগোর কষ্ট কেউ দেহে না।’ কথাগুলো বলছিলেন শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার তাতিহাটি ইউনিয়নের ঘোনাপাড়া পশ্চিমপাড়া গ্রামের বানভাসি মইমনা খাতুন। তার স্বামী মারা গেছেন অনেক আগেই। ছেলে-মেয়েদের নিয়ে থাকেন একটি ঝুপরি ঘরে। এক ছেলে দিন মজুরি করে। তা দিয়ে চলে তাদের সংসার। কিন্তু বন্যার পানি ঘরে প্রবেশ করায় তিনি ও তার পরিবার নিয়ে পড়েছেন বিপাকে। 

আজ বৃহস্পতিবার সকালে কথা হয় এই বানভাসি নারীর সাথে। তিনি বলেন, ‘নবাই কুষেরের বাড়ি এলাকার সবাই চিনে। ভোটের সময় অনেকেই আসে। মেলা কথা কয়। অহন কেউ আয়ে না।’ 

তার প্রতিবেশি ফজিলা বেগম, আমেনা বেগম, আব্দুল গফুর মাষ্টার, আবু কালাম, জাহাঙ্গির হোসেনসহ ওই গ্রামের শতাধিক লোক জানান, প্রায় এক সপ্তাহ যাবৎ বন্যার পানি তাদের সবার ঘরেই প্রবেশ করেছে। তাদের কেউ গরু, মহিষ এবং হাঁস-মুরগি নিয়ে চলে গেছেন অন্যত্র। যারা আছেন তারা পড়েছেন চরম বিপাকে। কেউ রান্না করতে পারছেন না। পার্শ্ববর্তী ঘোনাপাড়া গ্রাম থেকে রান্না করে নিয়ে খেতে হচ্ছে। কারো আবার শুকনো খাবারই ভরসা। দিনের শেষে রাতে নেমে আসে আরো ভয়াবহ অবস্থা। ঘুমাবার স্থান টুকুও নেই অনেকের। কেউবা বসেই রাত কাটান। 

এদিকে তাদের গ্রামের যাতায়াতের সড়কটিও ডুবে গেছে। এতে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে পশ্চিম ঘোনাপাড়া গ্রামের শতাধিক পরিবার। চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন ওই গ্রামের বসবাসকারী শিশু ও বৃদ্ধসহ কয়েকশ মানুষ। আজ বহস্পতিবার সরেজমিন গেলে বানভাসি কয়েকটি এলাকার লোকজনের সাথে কথা বললে ওঠে আসে এমনই চিত্র।

শুধু পশ্চিম ঘোনাপাড়া গ্রামেই পানি প্রবেশ করেনি। ক’দিনের প্রবল বর্ষণ ও ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের ৩০টি গ্রামের নিম্নাাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দি হয়েছে কমপক্ষে ১০ হাজার পরিবার। প্লাবিত গ্রাম গুলোর কাঁচা ঘর-বাড়ি, রাস্তাঘাট, রোপা আমন ধানের বীজতলা, সবজি ক্ষেত, পুকুরের মাছ পানিতে তলিয়ে গেছে। বৃহস্পতিবার ব্রহ্মপুত্র নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বন্যা পরিস্থিতি আরো অবনতি হবে বলে আশংকা করছেন স্থানীয়রা।

সূত্র মতে, গত এক সপ্তাহে পাহাড়ি ঢল ও প্রবল বর্ষণে শ্রীবরদীর কাকিলাকুড়া, তাতিহাটি, গোসাইপুর, ভেলুয়া, গড়জরিপা ও খড়িয়াকাজীরচর ইউনিয়নের ৩০টি গ্রামের প্রায় ১০ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। প্লাবিত গ্রামের রাস্তাঘাট, আমন ধানের বীজতলা ও সবজির ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। ভেসে গেছে পাঁচ শতাধিক পুকুর ও মৎস্য খামারের মাছ। এতে গৃহপালিত পশু নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা। বাড়িতে পানি উঠায় চুলা জ্বালাতে পারছেন না প্লাবিত এলাকার মানুষ। শুকনো খাবার খেয়েই দিন পার করছেন তারা। অনেক বাড়িতে দেখা দিয়েছে খাবার পানির সংকট। উপজেলার ভুতনিকান্দা, বাঘহাতা, খোশালপুর, পুটল, গেরামারা, ঘোনাপাড়া, বকচর, ষাইটকাকড়া, জানকিখিলা, শালামারা, ভটপুর, গিলাগাছা, গড়গড়িয়া, শেখদি, মাটিয়াকুড়া, চকবন্দি, কাউনেরচর, ঝগড়ারচর, লংগড়পাড়া, রুপারপাড়া, ঠনঠনিয়া, গড়জরিপা, গুরজান ও বালিয়াচন্ডীসহ ৩০টি গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। 

এদিকে দ্রুত ত্রাণসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি তুলেছেন পানিবন্দি এলাকার লোকজন। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সাইদুর রহমান কালের কণ্ঠক বলেন, বন্যায় প্রায় পাঁচশ পুকুর ও মৎস্য খামারের মাছ ভেসে গেছে। এতে দেড় থেকে দুই কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।

বন্যার পানি দ্রুত নেমে গেলে কৃষি ক্ষেতে তেমন ক্ষতি হবে না বলে জানান উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাজমুল হাছান। তিনি বলেন, প্রায় সাড়ে তিনশ হেক্টর জমির বীজতলা ও সাড়ে চারশ হেক্টর জমির সবজি ক্ষেত পানিতে নিমজ্জিত। বন্যার সার্বিক পরিস্থিতি এখনো পরিদর্শন করা হচ্ছে।

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেঁজুতি ধর কালের কণ্ঠকে বলেন, এখনো কোথাও ত্রাণ দেয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। তবে প্রয়োজনে ত্রাণের ব্যবস্থা করা হবে।

সংসদ সদস্য প্রকৌশলী একেএম ফজলুল হক চান বলেন, বন্যায় যে সকল পুকুর ও মৎস্য খামারের মাছ ভেসে গেছে তাদের তালিকা তৈরি করে তাদের জন্যে প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হবে। যাতে তারা আবার মাছ চাষ করতে পারে। এছাড়াও যাদের আমন ধানের বীজতলার ক্ষতি হয়েছে তাদের জন্যেও ব্যবস্থা করে হবে। 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা