kalerkantho

সোমবার। ১৯ আগস্ট ২০১৯। ৪ ভাদ্র ১৪২৬। ১৭ জিলহজ ১৪৪০

সাতকানিয়ায় ১৭ ইউনিয়নে পানিবন্দি দুই লাখ মানুষ

ওষুধ খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট

এস এম রানা ও জাহাঙ্গীর আলম, সাতকানিয়া (চট্টগ্রাম) থেকে   

১৬ জুলাই, ২০১৯ ০৫:০৭ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সাতকানিয়ায় ১৭ ইউনিয়নে পানিবন্দি দুই লাখ মানুষ

সোমবার দুপুর ১টা। চারদিকে থইথই পানি। সড়কে অন্তত আট ফুট। ঘরবাড়ির ভেতর চার থেকে পাঁচ ফুট। স্কুল, মসজিদ ও দোকান ডুবে আছে পানিতে। এরই মধ্যে একটি তিনতলা ভবন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এটি সাতকানিয়ার কেঁওচিয়া ইউনিয়নের তেমুহানি আশ্রয়কেন্দ্র। নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে ছয় দিন আগে এখানে আশ্রয় নিয়েছে অন্তত দুই শতাধিক বন্যার্ত মানুষ।

সেখানে আশ্রয় নেওয়া ৭০ বছরের বৃদ্ধ মোস্তাক আহমদ বললেন, ‘অ্যাঁরা মরি যাইরগ্গ্যই, ঘর ডুবি গিয়্যে, এন্ডে অভুক্ত অবস্থায় আঁধারত আছি। চিন্তা গরির মরি গেলে দাফন অইবু কেনে?’ (আমরা মারা যাচ্ছি। ঘর ডুবে গেছে। এখানে অভুক্ত অবস্থায় অন্ধকারে আছি। চিন্তা করছি, মারা গেলে দাফন হবে কোথায়?) বলতে বলতে বৃদ্ধ মোস্তাক আহমদের কপালে চিন্তার রেখা বড় হয়। এলাকায় এক খণ্ড মাটিও অবশিষ্ট নেই যেটি ডোবেনি। যেখানে দাফন সম্ভব। বেঁচে থাকার আকুতির চেয়ে কবরের মাটি পাওয়াই যেন এই বৃদ্ধের কাছে বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

ছয় দিন ধরে এই আশ্রয়কেন্দ্রে খাবারের জন্য হাহাকার চলছে। বিশুদ্ধ পানি নেই। এক কলস পানির ব্যবস্থা হলে তৃষ্ণার্ত মানুষ এক গ্লাস পানির আশায় তার চারপাশে ভিড় করছে। এখানে খাবার রান্নার ব্যবস্থা নেই। আশপাশের পাকা ঘরের ছাদে কেউ রান্না করতে পারলে একমুঠো খাবার খাওয়া সম্ভব হচ্ছে। অন্যথায় উপোস। একই আশ্রয়কেন্দ্রে আছেন কেঁওচিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজা মিয়া। তিনি বললেন, ‘আমাদের জীবন অচল। বিদ্যুত্ নেই। পুরো এলাকা রাতে ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে থাকে। টানা কয়েক দিন বিদ্যুৎ না থাকায় মোবাইল ফোনের চার্জ শেষ। স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ।’

সাতকানিয়ার তেমুহানি নয়াখালের মুখ থেকে নৌকা নিয়ে যাত্রা শুরু করে বিকেল পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার ঘুরে গ্রামে গ্রামে একই ধরনের দুর্ভোগের চিত্র দেখা গেছে। কেঁওচিয়া গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, রবিবারের চেয়ে পানি অন্তত দুই ফুট কমেছে। বিকেলেও পানি ছিল কমতির দিকে। ঘরগুলো অন্তত সাত ফুট ডুবে ছিল। 

কেঁওচিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় তলায় গরু নিয়ে অবস্থান করছেন স্থানীয় চৌকিদার আবুল বশর। তিনি বললেন, ‘এখানে না আনলে গরুগুলোর জীবনও বাঁচত না।’ পাকা ঘরের পানি কিছুটা কমে যাওয়ার পর ঘরে প্রবেশ করে একজন প্রবাসীর স্ত্রী দেখেন, ফ্রিজ, আইপিএস, পানির মোটর, বিছানা, তোষকসহ সব কিছুই পানির নিচে। কাজিপাড়ায় দেখা গেছে, স্থানীয় দোকানগুলো সব বন্ধ। দোকানের সামনেই কয়েকজন জাল ফেলে মাছ ধরছে। 

কেঁওচিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনির আহমদ বলেন, পুরো ইউনিয়নের অন্তত ১৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি। বিদ্যুত্হীন অন্ধকার এলাকায় রাত নামে আতঙ্ক নিয়ে। খাবার পানি, ওষুধ, খাবারের সংকটে ভুগছে মানুষ।’ আশ্রয়কেন্দ্রের মানুষ অভুক্ত থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রতিদিনই সাহায্য দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ১৫-২০ হাজার পানিবন্দি মানুষকে যথেষ্ট পরিমাণ ত্রাণ দেওয়া অনেক কঠিন। তার পরও শুকনো খাবার ও রান্না করা ভাত বিতরণ করা হচ্ছে।’ 

এবার এত বড় বন্যার কারণ কী? এমন প্রশ্নের জবাবে স্থানীয় বাসিন্দারা বলল, ১৯৯৭ সালেও প্রমত্ত শঙ্খ নদের তীর ভেঙে পুরো উপজেলায় বড় আকারের বন্যা হয়েছিল। অবশ্য, তার কয়েক বছর আগে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক সংস্কার করে উঁচু সড়ক নির্মিত হয়েছিল। কিন্তু কেরানীহাট থেকে মৌলভীর দোকান পর্যন্ত পর্যাপ্ত সেতু নির্মাণ করা হয়নি। এ কারণে শঙ্খে ভাঙনের পর পানি দ্রুত নিষ্কাশন হতে পারেনি। এবারও একই কারণে ভয়াবহ বন্যার মুখোমুখি হয়েছে সাতকানিয়ার দুই লাখ মানুষ। 

উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলেন, সাতকানিয়ার বাজালিয়া, ধর্মপুর, কালিয়াইশ, কেঁওচিয়া, ছদাহা, ঢেমশা, খাগরিয়া, নলুয়া, আমিলাইষ, চরতি, কাঞ্চনাসহ ১৭টি ইউনিয়ন এবং একটি পৌরসভা বন্যায় আক্রান্ত। বন্যার সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোবারক হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সোমবার সাতকানিয়ার বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। কিন্তু এখনো প্রায় তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি।’ তিনি জানান, সাতকানিয়ার বন্যা দুর্গতদের জন্য ৯৫ মেট্রিক টন চাল, সাড়ে তিন হাজার বস্তা শুকনো খাবার ও আড়াই লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। আরো ত্রাণ সহযোগিতা চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বার্তা পাঠানো হয়েছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা