kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২২ আগস্ট ২০১৯। ৭ ভাদ্র ১৪২৬। ২০ জিলহজ ১৪৪০

কালের কণ্ঠের অবসরের প্রতিবেদনের

সেই লাল চাঁনের ছেলে চাকরি পেল পুলিশে

নওগাঁ প্রতিনিধি   

১৬ জুলাই, ২০১৯ ০৩:৩৫ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সেই লাল চাঁনের ছেলে চাকরি পেল পুলিশে

দুই সন্তানসহ তাঁর ভাঙ্গা ঘরটির সামনে দাঁড়িয়ে লাল চাঁন মোল্লা। ছবি: কালের কণ্ঠ

স্বপ্নের আশা যে বাস্তবে ধরা দিবে এমন স্বপ্ন কি সত্যিই সে দেখেছিল! তাই মাঝে মাঝে নিজের শরীরে সে চিমটি কেটে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছে। যাকে দেখে সমাজের মানুষ কতইনা কৌতুকে মেতে ওঠে। কিন্তু সেও তো মানুষ। তার ভেতরের গুমড়ে থাকা বেদনার কথা কি কখনো কেউ ভেবেছে। লাল চাঁন মোল্লার অব্যক্ত কথা গুলো এখন অনবরত তাঁর দুই চোখ বেয়ে অশ্রু হয়ে বেরিয়ে আসছে। আবেগ অনুভূতির কাছে আজ মুখের ভাষা যেন অবরুদ্ধ।

নওগাঁর মান্দা উপজেলার পাকুরিয়া গ্রামের হতদরিদ্র পরিবারের মৃত তারা মোল্লার ছেলে মাত্র ৩৮ ইঞ্চি লম্বা লাল চাঁন মোল্লার সহায় সম্পদ বলতে কিছুই নেই। খর্বকায় (বামন) মাত্র ৩৮ ইঞ্চি লম্বা লাল চাঁন মোল্লা নওগাঁর নওহাটামোড় (চৌমাশিয়া) বাজার বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়ানো বাসের যাত্রীদের কাছে থেকে হাত পেতে নেওয়া ভিক্ষার টাকায় সংসার চালানোর পাশাপাশি তার দুটি ছেলেকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন। ভিক্ষুক লাল চাঁন মোল্লার কলেজে পড়ুয়া বড় ছেলে মেধাবী মো. ফিরোজ হোসেন এবার পুলিশ কনস্টেবল পদে চাকরি পেয়েছেন। লাল চাঁনকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল কালে কণ্ঠের ‘অবসর’ পাতায়। তখন লাল চান প্রতিবেদককে বলেছিলেন ছেলের পুলিশে চাকরি হলে আর ভিক্ষে করব না।

যেদিন ফিরোজের চাকরিটি নিশ্চিত হয় সেদিন অনেকটা রাত হয়েছিল। অসহায় লাল চান ছেলেকে নিয়ে দাঁড়িয়ে দিলেন নওগাঁ পুলিশ লাইন্স মাঠের এক কোণে। তাঁকে ছেলেকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন নওগাঁর পুলিশ সুপার মো. ইকবাল হোসেন। তিনি বাবা-ছেলেকে ডেকে নেন। নওগাঁ সদর থেকে প্রায় ৩৭ কিলোমিটার দূরে মান্দা উপজেলার পাকুড়িয়া গ্রামে পুলিশের পিক-আপ ভ্যানে পৌঁছে দেন তাদের। শুধু লাল চান ও তার ছেলেকে নয় অনেক নারী কনস্টেবল প্রার্থিকেও অনুরূপভাবে রাতে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে মানবতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এবারে নওগাঁ জেলায় বাংলাদেশ পুলিশের ট্রেইনি রিক্রুট কনস্টেবল (টিআরসি) পদে ৪২ জন নারীসহ মোট ১২০ জন যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ পেয়েছে।

এ ব্যাপারে মাত্র ৩৮ ইঞ্চি লম্বা লাল চাঁন মোল্লা বলেন, আমি একজন সহায় সম্বলহীন মানুষ, আমি বাসের যাত্রীদের কাছে হাত পেতে ভিক্ষা করে সংসার চালিয়েছি এবং ছেলেকে লেখাপড়া শিখিয়েছি। কাঁদতে কাঁদতেই বলেন, মহান আল্লাহ নওগাঁতে ভালো পুলিশ সুপারকে পাঠিয়েছেন বলেই আমার শিক্ষিত ছেলেটির চাকরি হলো। পুলিশ সুপার স্যার আগে থেকেই বলেছেন কেউ যেন চাকরির জন্য কোনো দালাল চক্র বা কাউকে টাকা না দেয়। আমি পুলিশ নিয়োগ পক্রিয়া শুরু থেকেই সেখানে ছিলাম। আমার মতো সেখানে আসা আরো লোকজনের সঙ্গেও আমি কথা বলেছি সবাই এবার বলেছে স্যার খুবই ভাল মানুষ টাকা ছাড়াই চাকরি হবে।

অবশেষে সেই কথাই সত্য হলো আমার ছেলেসহ রিকশা চালকের মেয়ে, হতদরিদ্র মুক্তিযোদ্ধার নাতী সব মিলিয়ে ১২০ জন নারী-পুরুষকে চাকরি দিলেন। চাকরি পাওয়ার প্রায় সবই দরিদ্র হতদরিদ্র ও মাঝারি পরিবারের সন্তান বলেও ভিক্ষুক লাল চাঁন আলী জানিয়েছেন।

নওগাঁর পুলিশ সুপার মো. ইকবাল হোসেন পিপিএম বলেন কনস্টেবল নিয়োগের বিষয়টি শুরু থেকেই বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার করায় প্রার্থীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহের সৃষ্টি হয়। ফলে একটি স্বচ্ছ ও পরিচ্ছন্ন নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে নিয়োগ কমিটির সকলে প্রাণান্ত পরিশ্রম করেন। পরিচ্ছন্ন নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকৃত মেধাবীরাই এবার নিয়োগ পেয়েছে। অবিরাম বর্ষায় ওয়াটারপ্রুফ প্যান্ডেলের মাধ্যমে পরীক্ষার্থীদেরকে আরামদায়ক পরিবেশসহ তাদের জন্য বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা করা হয়।

এতে করে পরীক্ষার্থীরা সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অংশগ্রহণ করেন। পুলিশ সুপার মো. ইকবাল হোসেন, পিপিএম আরো বলেন, 'জাতির পিতার স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি মোতাবেক আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী মহোদয়ের নির্দেশনায় নওগাঁ জেলায় পুলিশের টিআরসি পদে সম্পূর্ণ মেধা ও যোগ্যতার মানদণ্ডে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়'।

প্রাথমিকভাবে মনোনীতদের অধিকাংশই দরিদ্র পরিবারের সন্তান। চূড়ান্ত মনোনয়ন শেষে দেখা যায়, মেধা এবং শারীরিক যোগ্যতাই একমাত্র নিয়ামক। পারিবারিক পরিচয় নয় ধনী-গরিব বা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে যোগ্যতমরা পুলিশ কনস্টেবল পদে নিয়োগ পেয়েছেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা