kalerkantho

চোখের সামনে মা-ভাইকে কুপিয়ে হত্যা করল, কিছুই করতে পারলাম না

দেবীদ্বার (কুমিল্লা) প্রতিনিধি   

১৬ জুলাই, ২০১৯ ০৩:১৯ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



চোখের সামনে মা-ভাইকে কুপিয়ে হত্যা করল, কিছুই করতে পারলাম না

ছবি: কালের কণ্ঠ

দেবীদ্বারে রিকশাচালক ঘাতক মোখলেছ কর্তৃক ভয়ঙ্কর রক্তের হলি খেলায় প্রকাশ্যে মা-ভাইকে দা’ দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যার দৃশ্য প্রত্যক্ষকারী নিপা আক্তার (১৫) ঘটনার বর্ণনা দিতে যেয়ে বুকফাটা আর্তচিৎকারে বার বার মূর্চ্ছা যাচ্ছিল। সারাক্ষণ চোখে-মুখে আতঙ্ক নিয়ে নির্ঘূম রাত কাটাচ্ছে। দিনের আলোও যেন তার কাছে অন্ধকার। সর্বক্ষণ তাকে যেন কোনো এক অদৃশ্য ভয়ঙ্কর কিছু একটা তাড়া করছে।

মাকে হারিয়ে নিপা এখন নিঃস্ব, তার ভবিষ্যৎ অন্ধকার জীবন নিয়ে বিচলিত। মা-বাবা, ৪ বোন ও ২ ভাইয়ের সংসার এখন ফাঁকা। তার লেখাপড়াও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। নিপা মোহনপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণীতে বাণিজ্য শাখায় পড়ে।

বাবা শাহ আলম প্রায় তিন মাস পূর্বে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। বাবাকে হারিয়ে পরিবারটি যখন অভিভাবকহীন দিশেহারা, ঠিক সে মুহূর্তে সর্বশেষ ভরসা মা’ আনোয়ারা বেগম ও ছোট ভাই আবু হানিফকে নির্মমভাবে উপর্যুপরি কুপিয়ে হত্যা করল নরপশু মোখলেছ। 

সে জানায় ঘটনার দিন (বুধবার) সকালে স্কুলে যাওয়ার পথে মা বলেন, আজ স্কুলে যেও না, আমি হালি (ধানের চারা) উঠাতে জমিতে (মাঠে) যাচ্ছি, তুমি রান্নার কাজ সেরে নিও। নিপা রান্না ঘর থেকে লোকজনের চিৎকার শোনে ঘর থেকে বেড়িয়ে আসে। পাশের বাড়ির সড়কের পাশে তার ছোট ভাই হানিফ (১০)কে কুপিয়ে সড়কে ফেলে রেখেছে। এ সময় সে তার ভাইকে কিভাবে হাসপাতালে নেবে? কি করবে? কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে ঘর থেকে মোবাইল ফোনটি আনতে দৌড়ে যাওয়ার সময় মাও চিৎকার করে ভাইয়ের দিকে এগিয়ে যেতে দেখে। মোবাইল ফোনটি এনে দেখে ঘাতক তার মাকে দৌড়াচ্ছে।

এক পর্যায়ে মা-ভাইয়ের লাশ আনতে যেয়ে পেছলে পড়ে গেলে তার মাথায় সজোরে কূপ মারে। বিকট শব্দে মায়ের মগজ বেড়িয়ে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরুচ্ছে। আমি কি করব ভেবে পাচ্ছিলাম না। মা নিথর হয়ে গেছেন, তারপরও কুপানো থামাচ্ছে না। আমি একটি লাঠি নিয়ে মাকে বাঁচাতে তার দিকে এগিয়ে গেলে সে আমাকে ধাওয়া করে। আমি দৌড়ে প্রাণ বাঁচাই, ভয়ে আর আগাতে পারি নাই, আমি যদি আগাতাম ওই ঘাতক আমাকেও মেরে ফেলতো। কিন্তু কিছু দূর গিয়ে দেখি সে ফিরে গেছে। 

মা যদি পেছলে না পড়ত তাহলে মাকে মারতে পারত না। এ সময় মা ও ভাইকে বাঁচাতে আমি চিৎকার করছি কিন্তু এ সময় আমার পাশে আর কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। একটি লোকও এগিয়ে আসেনি, সবাই প্রাণ বাঁচাতে এদিক ওদিক ছুটে যাচ্ছে। এই কথাগুলো বলে আর্তনাদে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন নিহত আনোয়ারা বেগম আনুর নবম শ্রেণীতে পডুয়া মেয়ে নিপা আক্তার (১৫)। নিপার এমন বুকফাঁটা আর্তনাদ-আহাজারিতে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠে। তাকে কিছুতেই থামাতে পারছে না স্বজনরা। বারবার জ্ঞান হারান, পুনরায় জ্ঞান ফিরলেই অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছেন নিপা। ঘরের মা ও ভাইয়ের পরনের কাপড়ের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। একটু পরপর চিৎকার করে বলছেন, আপনারা আমার মা ও ভাইকে ফিরিয়ে দেন, আমাদের তো দেখার আর কেউ রইল না।

নিপার ছোট ভাই নিহত হানিফ তালতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণীতে পড়ত। বর্তমানে হানিফ ছাড়াও নিপার শিউলি, আকলিমা, কুলসুমসহ আরো তিন বোন আছে, তিন বোনই বিবাহিতা, ওরা থাকেন স্বামীর বাড়িতে। ওদের বিয়ে হয়ে যাওয়ায় নিপা আক্তার (১৫) তার মা ও ছোট দুই আবু হানিফ এবং বড় আলমকে নিয়ে থাকেন নিজের বাড়িতে। বড় ভাই আলম (১৭) লেখাপড়া ছেড়ে পরিবারের হাল ধরতে ভাড়ায় সিএনজি চালাচ্ছে। নিপার বাবার রেখে যাওয়া মাছ ধরার বেল জাল বেয়ে তার মা আনোয়ারা বেগম আনুও এতদিন সংসারের সহযোগীতা করে আসছিলেন।

ঘটনার দিন ভোরে নিপার মা আনোয়ারা বেলে মাছ ধরে, জমিতে ধানের চারা উঠাতে গিয়েছিলেন। বেল থেকে মাছ ধরে বাড়িতে এনে নিপাকে রান্না করার জন্য বলেছিল। এর আগেই ঘাতক মোখলেছ কেড়ে নিলো মা আনোয়ারা ও তার ছোট ভাই আবু হানিফকে।

শুক্রবার বিকেলে সরেজমিনে নিহত আনোয়ারার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, দু'চালা একটি টিনের ঘর, ঘরে মাটির চুলার ওপরে রান্নার খালি হাড়ি-পাতিল। ঘরের চৌকিতে আনোয়ারার চার মেয়ে ও এক ছেলে বুকফাঁটা আর্তনাদ-আহাজারি করছে। পাশে স্বজনরা সান্তনা দিয়ে থামানোর চেষ্টা করছে। 

নিহত আনোয়ারার স্বজনরা সাংবাদিকদের জানান, আনোয়ারার তিন মেয়ে বিয়ে দিলেও ছোট মেয়ে নিপা এখনো বিয়ে দেওয়ার বাকি। নিপাদের বাড়ির ভিটে-মাটি ছাড়া আর কোনো সম্পদ নেই। কয়েক মাস আগে নিপার বাবার চিকিৎসার জন্য ব্যাংক থেকে ঋণও নিয়েছিল। চিকিৎসা করেও ক্যান্সারে আক্রান্ত বাবাকে বাঁচাতে পারেনি। অবশেষে পিতার পথযাত্রী হলেন মা আনোয়ারা ও তার ছোট আদরের ভাই হানিফ। মা ও ছোট ভাইকে হারানোর কারণে তাদের সংসারে নিপা ও তার ১৭ বছর বয়সী বড় ভাই আলম ছাড়া আর কেউ রইল না। তাই নিপা ও আলমের চোখে এখন শুধুই দিশেহারার ছাপ।

নিপার তিন বোন শিউলি, আকলিমা, কুলসুম জানান, আমাদের সংসার আছে, টানাপোড়নের সংসার। ছোট ভাই আলম ও বোন নিপাকে সহযোগীতা করার সামর্থ্যও নেই। ওরা এখন একা কিভাবে বাড়িতে থাকবে, এ চিন্তাও আমাদের তাড়া করছে। বোনটি আমার মেধাবী ছিল, তার লেখাপড়ারও আগ্রহ ছিল। এখন তার লেখাপড়া বন্ধ করে নাবালিকা অবস্থায়ই তাকে বিয়ে দিয়ে দিতে হবে। নিপা ও তার লেখাপড়ার অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়েও চিন্তা করছে।

উল্লেখ্য, গত বুধবার সকাল ১০টার দিকে রাধানগর গ্রামের মুর্তুজ আলীর ছেলে রিকশাচালক মোখলেছুর রহমান একটি ধারাল দা ক্রয় করে বাড়িতে এসে আকস্মিক লোকজন এলোপাতাড়ি কুপিয়ে রক্তের হলিখেলা শুরু করে। এতে হতাহত লোকজন বিকৃত অবস্থায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে মাটিতে পড় থাকতে দেখা যায়। এ সময় প্রতিবেশী নুরুল ইসলামের স্ত্রী নাজমা আক্তার (৪০), মৃত শাহ আলমের ছেলে আবু হানিফ (১০) এবং স্ত্রী আনোয়ারা বেগম আনু (৪৫) ঘটনাস্থলেই মারা যান।

ওই সময় ঘাতক মোখলেছের দায়ের কূপে আব্দুল লতিফ(৪৫), মাজেদা বেগম (৬৫), নুরুল ইসলাম (৫০), রাবেয়া বেগম (৪০), ফাহিমা (১০), জাহানারা বেগম (৫০), লোকমান (১৭) সহ আরো ৭ জন আহত হয়। লোকমান ছাড়া বাকী ৬ জনকে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

এ সময় ঘাতকের রক্ত খেলার তাণ্ডব লীলা দেখে স্থানীয় লোকজন মসজিদের মাইকে ঘোষণা করলে বিপুলসংখ্যক জনতা ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাকে আটক করে গণপিটুনি দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই ঘাতক মোখলেছ মারা যায়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা