kalerkantho

শুক্রবার । ১৯ জুলাই ২০১৯। ৪ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৫ জিলকদ ১৪৪০

সাগরে ট্রলারডুবি

সাত দিনেও সন্ধান মেলেনি নিখোঁজ ৫ জেলের, স্বজনদের আহাজারি

এম সোহেল, রাঙ্গাবালী   

১২ জুলাই, ২০১৯ ১১:০১ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সাত দিনেও সন্ধান মেলেনি নিখোঁজ ৫ জেলের, স্বজনদের আহাজারি

আমি কইছি বাবা তুই যাইস না। তোর মামারে ক’  আমারে পাঠাইয়া দেন। তোর ধারে ভাড়ার টাহা (টাকা) না থাকলে আমি টাহা পাঠাইয়া দিমু। তুই মহিপুর তোন (থেকে) আইয়া পর। বাবায় আমার কইছে মা কিচ্ছু অইবে। তুমি দোয়া কইরো। ও হাসান তুই কই বাবা। আমার কোলে আয়। আমার বাবায় কোম্মেরে (কোথায়) গেছে আমারে থুইয়া। ও বাবা ও যাদু ক্যামনেরে থাকবি মায়রে একলা থুইয়া। আমার হাসান ওই ট্রলারেই আছে। আমার বাবারে আইন্না দেও। বঙ্গোপসাগরে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার তিন ট্রলার ডুবির ঘটনায় উপজেলার ছোটবাইশদিয়া ইউনিয়নের কোড়ালিয়া এলাকার রাতুল মাঝির ট্রলার দুর্ঘটনায় নিখোঁজ হাসানের  মা বিউটি বেগম এভাবেই বিলাপ করে কান্নার আহাজারি করছিলেন। বৈরী আবহাওয়ায় বঙ্গোপসাগর উত্তাল থাকায় পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার তিনটি জেলে ট্রলার ডুবে গেছে। এ ঘটনায় ৩৩ জন জেলেকে উদ্ধার করা হলেও পাঁচজন জেলে নিখোঁজ রয়েছে বলে জানা গেছে। গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে আজ শুক্রবার  সকাল পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে এ ট্রলারডুবির ঘটনা ঘটে।

তবে ওই নিখোঁজ জেলেদের উদ্ধার কাজ অব্যাহত থাকলেও আজ শুক্রবার পর্যন্ত সাত দিনেও পাঁচ জেলের কোনো সন্ধান মেলেনি। বৈরী আবহাওয়ায় গত শুক্রবার রাতে ও শনিবার ভোরে গভীর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানকালে দমকা বাতাসের সঙ্গে প্রচণ্ড ঢেউয়ের তোড়ে তিনটি ট্রলারডুবির ঘটনা ঘটে।

নিখোঁজ হাসানের স্বজনদের সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন আগে স্বামী বাচ্চু ফরাজির থেকে আলাদা হয়ে যায় বিউটি বেগম। তখন এক ছেলে ও এক মেয়েকে সাথে নিয়ে জীবনযুদ্ধে নামেন তিনি। বছর তিনেক আগে মেয়েটাকে বিয়ে দিয়েছেন। একমাত্র ছেলেই সংসারের উপার্জন করে আসছে। গত শুক্রবার রাতে বঙ্গোপসাগরে ট্রলার ডুবিতে হাসান নিখোঁজ হয়েছে। তাই একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে মা বিউটি বেগম মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছেন। 

হাসানের বাড়ি পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার ছোটবাইশদিয়া ইউনিয়নে চরইমারশন এলাকায়। মা বিউটি বেগম ও বোন পলি আক্তারসহ তিন সদস্যের সংসারে হাসানই একমাত্র উপার্জন করতো। তার পেশা ছিল মাছ শিকার করা। কিন্তু বেশিকিছু দিন ধরে নদীতে তেমন মাছ ধরা পড়ছে না। তাই সংসারের খরচ মেটাতে মায়ের বাঁধা উপেক্ষা করে স্থানীয় মৎস্য ব্যবসায়ী রাতুল মিয়ার মালিকানাধীন ট্রলারে প্রথমবারের মত সাগরে মাছ ধরতে গিয়েছিল হাসান। কিন্তু এই প্রথম যাত্রায়ই যে এমন অমঙ্গল হবে, তা কারও জানা ছিল না। হাসানের সঙ্গে ওই ট্রলারে থাকা আরেক জেলে কাউখালী গ্রামের মিজানও (২৫) নিখোঁজ রয়েছে। এ ছাড়াও অন্য নিখোঁজ জেলেরা হলেন-চরমোন্তাজ ইউনিয়নের মধ্য চরমোন্তাজ গ্রামের সোহরাব প্যাদার মালিকানাধীন ট্রলারের জেলে নয়ারচর গ্রামের রবিন হোসেন (২০), চালিতাবুনিয়া ইউনিয়নের চরলতা গ্রামের নিজাম ফকিরের মালিকানাধীন ট্রলারের জেলে চরলতা গ্রামের  মনির (৪০) ও মধ্য চালিতাবুনিয়া গ্রামের ইউসূব (৩৭)। এই পাঁচ জেলের সন্ধান এখনও মেলেনি। তাদের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা এখনও কেউ জানে না।  

নিখোঁজ কয়েক জেলের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, প্রিয়জনের সন্ধান না পাওয়ায় স্বজনদের কান্না আর বুকফাটা আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে যার যার গ্রাম। স্বজনদের কেউ হয়েছেন নির্বাক। কেউ আবার শোকে বাকরুদ্ধ হয়ে প্রিয়জনের ফিরে আসার প্রতিক্ষায় পথ চেয়ে আছেন। তবে সময় যতই যাচ্ছে, আবেগ-উৎকণ্ঠা  ততই বাড়ছে।

এদিকে জানা গেছে, গত ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত ৬৫ দিন সাগরে মাছ শিকারে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। কিন্তু এই আইন অমান্য করে বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে ডুবে যাওয়া ওই তিন ট্রলারের মালিক (মহাজোন) মাছ শিকার করতে ৩৮ জন জেলেকে সাগরে পাঠান। পরে সাগরে গিয়ে ট্রলারডুবির ঘটনা ঘটলে ৩৩ জন জেলেকে অন্য ট্রলারের সাহায্যে উদ্ধার করা হলেও বাকি জেলেদের সন্ধান এখনও পাওয়া যায়নি। 

স্থানীয় জেলেরা জানান, বৈরী আবহাওয়ায় সাগরে বেশি ইলিশ মাছ ধরা পড়ে। তাই ওইসময় অতি লোভে পড়ে  ট্রলার মালিক কিংবা মহাজোনরা জেলেদেরকে উৎসাহিত করে সাগরে পাঠিয়ে থাকেন। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ শিকার করতে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার অসংখ্য জেলে বঙ্গোপসাগরে রয়েছে। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জায়েদুল ইসলাম বলেন, ‘৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করার আইন রয়েছে। আমি শিগগিরই অভিযান করব। আর জেলেদেরকে সাগরে পাঠাতে উৎসাহিত করা ট্রলার মালিকদের বিষয়ে আমি জেলা মৎস্য কর্মকর্তা স্যারের সঙ্গে আলাপ করব।’   

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাশফাকুর রহমান জানান, ‘নিখোঁজ জেলেদের এখনও সন্ধান পাওয়ার খবর পাইনি। আমরা এ বিষয়ে সার্বক্ষণিক খোঁজখবর নিচ্ছি। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সাগরে গেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা