kalerkantho

শনিবার । ২০ জুলাই ২০১৯। ৫ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৬ জিলকদ ১৪৪০

বগুড়ার একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে তদন্ত করছে দুদক

লিমন বাসার, বগুড়া   

১২ জুলাই, ২০১৯ ০৮:৪৫ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বগুড়ার একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে তদন্ত করছে দুদক

বগুড়ায় ব্যাংক বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাৎ, দলিল জালিয়াতি করে জমি বিক্রি, ঘুষ লেনদেন, ভুয়া সার্টিফিকেট বাণিজ্যসহ নানা দুর্নীতি ও জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তৎপর হয়ে উঠেছে। এরই মধ্যে রাজনীতিবিদ, সংসদ সদস্য, ব্যবসায়ী, শ্রমিক নেতা, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যাংক কর্মকর্তাসহ ৫০ জনেরও বেশি ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেছে এবং তাঁদের কেউ কেউ মামলার আসামি হয়ে জেলে গেছেন বা জামিনে আছেন। সাবেক একজন মন্ত্রী বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। রাজনীতিবিদ যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তাঁদের বেশির ভাগই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা।

জানা গেছে, দুদকের নজরে রয়েছেন আরো অন্তত ৫০ ব্যক্তি।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, দু-একটি বাদে অভিযোগ পেয়ে নোটিশ দেওয়া ও মামলা করার বেশির ভাগ ঘটনাই ঘটেছে গত তিন মাসে। এ ব্যাপারে দুদক সমম্বিত জেলা কার্যালয়, বগুড়ার সহকারী পরিচালক আমিনুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বগুড়ার আরো অনেকেই এই তালিকায় যুক্ত হবেন। জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ পাওয়া গেলে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে জানা গেছে, বগুড়ার প্রভাবশালী নেতা ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মঞ্জুরুল আলম মোহন ও তাঁর স্ত্রী কোহিনুর মোহনের বিরুদ্ধে দুদকে দায়ের করা একটি অভিযোগ আমলে নিয়ে তাঁদের চিঠি দেওয়া হয়েছে। একইভাবে দুদকের চিঠি গেছে জেলা আওয়ামী লীগের আরেক প্রভাবশালী নেতা ও দলের সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুর রহমান দুলু ও তাঁর স্ত্রী শামিমা জেসমিনের কাছে। সম্পদ অর্জনের তথ্য গোপন করার অভিযোগ তাঁদের বিরুদ্ধে। একই অভিযোগ উঠেছে বগুড়ার প্রভাবশালী পরিবহন ব্যবসায়ী ও বগুড়া মোটর মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক সদর উপজেলা যুবলীগের সহসভাপতি আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধেও। দুদকের জালে ধরা পড়েছেন আমিনুল ইসলামের বাবা বগুড়ার ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুল লতিফ মণ্ডল। তাঁর বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করা হয়েছে।

সম্প্রতি বগুড়া জেলা ট্রাক মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক যুবলীগ নেতা আব্দুল মতিন সরকারও জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদকের করা মামলায় জেল খেটে জামিনে ছাড়া পেয়েছেন। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের বগুড়া শাখা থেকে ছয় কোটি ৪৭ লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনায় করা মামলায় বগুড়া যুবলীগের সাবেক নেতা মাকছুদুল আলমকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি এখনো জেলহাজতে রয়েছেন। একই মামলায় শুকরা এন্টারপ্রাইজের মালিক আবদুল মান্নান কারাগারে যাওয়ার আগে ব্যাংকের পাওনা ২৬ লাখ টাকা পরিশোধ করেন। সে কারণে তিনি জামিন পেয়ে গেছেন।

দুদক সূত্র জানায়, বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলায় ‘ক’ তফসিলভুক্ত ৩৩ শতাংশ জমির ভুয়া মালিক সাজিয়ে বিক্রি দলিল করার দায়ে উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রারসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে সাব-রেজিস্ট্রার ইউসুফ আলী ছাড়াও আছেন আওয়ামী লীগ নেতা নিসরুল হামিদ। একই এলাকার সান্তাহার পৌরসভার কয়েক কোটি টাকা মূল্যের ৩৩ শতাংশ খাসজমির দলিল জালিয়াতির ঘটনায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগের নেতাসহ ১২ জনের নামে মামলা করা হয়েছে। আসামিরা হলেন আদমদীঘি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নিসরুল হামিদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম, সহসভাপতি আবু রেজা খান, যুবলীগের সভাপতি শাহিনুর রহমান, উপজেলা শ্রমিক লীগের আহ্বায়ক রাশেদুল ইসলাম, কৃষক লীগের সভাপতি হারুন অর রশিদ, আদমদীঘি উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার, দলিল লেখক রাকিব হোসেন, জমির বিক্রেতা নওগাঁ সদর উপজেলার রবীন্দ্রনাথ রায় চৌধুরী।

দরপত্র আহ্বান না করে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের আড়াই একর জমি বিক্রির মামলায় সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীসহ দুজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে দুদক। লতিফ সিদ্দিকী এই মামলায় এখন বগুড়া কারাগারে রয়েছেন।

প্রধান শিক্ষকদের পদায়নে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ ওঠায় বগুড়া জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ডিপিইও) হোসেন আলীকে সম্পদের হিসাব বিবরণী দিতে বলেছে দুদক।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, লতিফ সিদ্দিকীকে কারাগারে পাঠানোর আগে বগুড়া-৫ আসনের আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য হাবিবর রহমান, তাঁর স্ত্রী খাদিজা হাবিব, ছেলে আছিফ ইকবাল সনি, মেয়ে ফারজানা দিবার জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের তদন্ত শুরু করে সংস্থাটি।

বগুড়া-২ আসনের জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য শরিফুল ইসলাম জিন্নাহকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারি টাকা আত্মসাৎ, জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আছে। সম্পদের মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অভিযোগে বিএনপি নেতা ও বগুড়া-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল মোমিন তালুকদার খোকা ও তাঁর স্ত্রীকে তলব করা হয়।

অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমির সাবেক ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক আব্দুল মতিনসহ সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। আরেকটি অভিযোগ পেয়ে মতিন ও তাঁর স্ত্রী শামীমা আফরোজের সম্পদের হিসাব বিবরণীও চেয়েছে দুদক।

ঘুষ দুর্নীতির অভিযোগে বগুড়ার ধুনটের সেটলমেন্ট অফিসার আরিফুল ইসলাম ও মমতাজ আলীর বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। বগুড়ার আলোচিত নারী নির্যাতনকারী তুফান সরকারের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং তা গোপন করার অভিযোগে মামলা করা হয়েছে।  দেড় শ কোটি টাকার সার আত্মসাতের ঘটনায় বগুড়ার সান্তাহার বাফার গুদামের সাবেক ইনচার্জ ও সাবেক উপপ্রধান প্রকৌশলী (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) নবির উদ্দিন খান ও রাজা এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মালিক রাশেদুল ইসলাম রাজার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।

জালিয়াতির মাধ্যমে বগুড়া শিল্প সমবায় সমিতির সোয়া কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে সমিতির চেয়ারম্যান জহুরুল ইসলাম ও সাবেক জেলা সমবায় কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহিনুর ইসলামের (বর্তমানে পাবনা জেলা সমবায় কর্মকর্তা) বিরুদ্ধে। রূপালী ব্যাংক মহাস্থানগড় শাখার টাকা আত্মসাতের মামলায় ওই শাখার সাবেক ব্যবস্থাপকসহ সাতজনের বিরুদ্ধে এর মধ্যে অভিযোগপত্র দিয়েছে দুদক। শিবগঞ্জ উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রার এসকেন্দার আলী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের অবৈধ সম্পদের হিসাব চেয়ে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এসকেন্দার আলী বর্তমানে ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলায় কর্মরত রয়েছেন।

জেলা দুদক কার্যালয় সূত্র জানায়, ভুয়া সার্টিফিকেট কারবারি নুরুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী আকলিমা খাতুন, অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের চেয়ারম্যান সাখাওয়াত হোসেন টুটুল, বগুড়া স্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী দুলাল চন্দ্র সরকার ও তাঁর স্ত্রী কাকলী রানীও দুদকের নোটিশ পেয়েছেন। তাঁদের সম্পদের হিসাব বিবরণী দিতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনকারী বগুড়ার একাধিক পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও তদন্ত করছে দুদক।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা