kalerkantho

বুধবার । ১৭ জুলাই ২০১৯। ২ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৩ জিলকদ ১৪৪০

উৎপাদন ৩০ লাখ টন, সরকার কিনছে ২৫ হাজার

বোরোর বাম্পার ফলনের পরও হতাশায় রংপুরের কৃষকরা

স্বপন চৌধুরী, রংপুর    

২৬ জুন, ২০১৯ ০৯:২৪ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বোরোর বাম্পার ফলনের পরও হতাশায় রংপুরের কৃষকরা

তিস্তা ব্যারাজের মাধ্যমে নদীর পানি জমিতে সেচ হিসেবে ব্যবহার করে রংপুর অঞ্চলের তিন জেলার সাত উপজেলায় প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ করে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে কৃষকরা। ফলনও হয়েছে বাম্পার। এতে অতিরিক্ত এক লাখ মেট্রিক টন ধান উৎপাদিত হয়েছে বলে দাবি পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের। এ ছাড়া বিভাগের আট জেলায় বোরো ধানের আশাতীত ফলন হয়েছে। কিন্তু ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না কৃষকরা।

বোরো ধানের ন্যায্য মূল্য দেওয়ার লক্ষ্যে সরকার চাষিদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনা শুরু করলেও মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাজারে এর খুব একটা প্রভাব পড়েনি। এক মাস আগে বাজারে ধানের যে দাম ছিল, এখনো প্রায় তাই রয়েছে। বর্তমানে রংপুর বিভাগে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকায়। অর্থাৎ প্রতি কেজি ধান বিক্রি হচ্ছে ১৬ থেকে ১৭ টাকায়। প্রতি কেজি মোটা চাল খুচরা বাজারে এলাকাভেদে ২২ থেকে ২৪ টাকায় কেনাবেচা হচ্ছে। অথচ এ চালের সরকারি সংগ্রহমূল্য ৩৬ টাকা।

রংপুর বিভাগে আট লাখ হেক্টরের বেশি জমিতে বোরো উৎপাদিত হয়েছে ৩০ লাখ টনের বেশি। সরকার এ বিভাগে কৃষকদের কাছ থেকে মাত্র ২৫ হাজার টন ধান কিনছে। বাজরদরের চেয়ে সরকারি ক্রয়মূল্য বেশি হলেও এর সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কৃষকরা। ফলে এ অঞ্চলের কৃষকদের হতাশা কাটছে না। সরকারের সংগ্রহ বাদ দিলে কৃষকের কাছে ধান থাকছে ২৭ লাখ টনের ওপর। এ ধান কৃষকরা বাজারে গিয়ে বিক্রির চেষ্টা করছে।

অন্যদিকে মধ্যস্বত্বভোগী অটো রাইসমিল মালিক ও বড় বড় ধান-চাল ব্যবসায়ী এখন ধান ক্রয়ে তেমনভাবে মাঠে নামেনি। ফলে ধানের দাম অনেকটা আগের মতোই রয়েছে। মৌসুমের শুরুতে প্রতি মণ ধানের দাম ৪৫০ থেকে ৫৫০ টাকা ছিল।

রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার শহীদবাগ এলাকার সাদেকুল ইসলাম, পীরগাছার কল্যাণী এলাকার বুলবুল মিয়া, রংপুর সদরের মমিনপুরের সিরাজুল ইসলাম প্রমুখ কৃষক জানান, সরকার ধান কিনছে। কিন্তু কৃষকরা কখনোই সরকারি গুদামে ধান-চাল বিক্রি করতে পারে না। এক শ্রেণির মধ্যস্বত্বভোগী মিলার সিন্ডিকেট কৃষকদের কাছ থেকে কম দামে ধান সংগ্রহের পর তা চালে রূপান্তর করে সরকারি গুদামে বিক্রি করে।

কাউনিয়ার চাল ব্যবসায়ী নূর আলম জানান, সরকারি দর বেশি থাকলেও বেশির ভাগ কৃষকই সরাসরি ধান সরকারি গুদামে বিক্রি করতে পারছে না। মিল, চাতাল ও ব্যবসায়ীরা এখনো পুরোপুরি ধান কেনা শুরু করেনি। তাই বাজারে ধানের দাম বাড়ছে না।

পাউবো সূত্রে জানা যায়, তিস্তা নদী বেষ্টিত রংপুর অঞ্চলের রংপুর, দিনাজপুর ও নীলফামারীতে বছরে আমন ধান ছাড়া আর কোনো ফসল হতো না। তিস্তা ব্যারাজ নির্মিত হওয়ার পর পাউবো ক্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে তিস্তা নদী থেকে শুষ্ক মৌসুমে পানি সরবরাহের পরিকল্পনা করলেও ভারত উজানে গজলডোবায় বাঁধ নির্মাণ করে পানির প্রবাহ বন্ধ করে দেয়। ফলে পানির অভাবে এসব এলাকায় বোরো ধান চাষ করতে পারছিল না কৃষকরা। কিন্তু এবার শুকনো মৌসুমে একদিকে আবহাওয়া অনুকূলে ছিল, অন্যদিকে তিস্তা ব্যারাজের মাধ্যমে পানি পেয়েছে কৃষকরা। ফলে সেচ কমান্ডিং এরিয়ার ১২ উপজেলার মধ্যে সাতটিতে ৩২ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও তা হয়েছে ৪০ হাজার হেক্টরে। উপজেলাগুলো হলো নীলফামারীর জলঢাকা, ডিমলা, কিশোরগঞ্জ, নীলফামারী সদর, সৈয়দপুর, রংপুরের তারাগঞ্জ ও গঙ্গাচড়া।

সরেজমিনে তিস্তা ব্যারাজ সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, একসময়ের পতিত থাকা বালুমিশ্রিত জমিতে ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। ধান কাটতে ব্যস্ত সময় পার করছে কৃষকরা। জলঢাকার কৃষকরা জানায়, প্রতিবছর শুকনো মৌসুমে ব্যারাজের দিনাজপুর পর্যন্ত তৈরি করা খালগুলোতে প্রয়োজনীয় পানি না পাওয়ায় তাদের ধানের ফলন ভালো হতো না। তাদের বেশি দামে গভীর ও অগভীর নলকূপের মাধ্যমে জমিতে সেচ দিতে হতো। কৃষক জাফর আলী, রইছ মিয়া ও আবেদ আলী জানান, সেচযন্ত্রের মাধ্যমে আর যা-ই হোক, বালুমিশ্রিত জমিতে বোরো ধান আবাদ করা অসম্ভব। কারণ এসব জমি পানি ধারণ করতে পারে না। অন্যদিকে তিস্তা ব্যারাজের মাধ্যমে পাওয়া নদীর পানি দিয়ে ধান চাষ করলে ফলনও ভালো হয়। এবার তাঁরা সার্বক্ষণিক তিস্তা সেচ ক্যানেলের মাধ্যমে পানি পাওয়ায় ফলনও হয়েছে ভালো। হেক্টরপ্রতি গড়ে চার টন ধান উৎপাদিত হয়েছে।

তিস্তা ব্যারাজের মাধ্যমে ধান চাষ করা গঙ্গাচড়া উপজেলার আলমবিদিতর এলাকার কৃষক আরমান আলী, সৈয়দ আলী, কিশোরগঞ্জ উপজেলার হামিদুল ইসলাম ও নয়া মিয়া জানান, নদীর পানি দিয়ে জমিতে সেচ দিতে পাউবোকে দিতে হয় একরপ্রতি মাত্র ৪৫০ টাকা। অন্যদিকে গভীর ও অগভীর নলকূপের মাধ্যমে সেচ দিতে খরচ পড়ে একরপ্রতি দুই হাজার টাকার বেশি।

তিস্তা ব্যারাজের সেচ সম্প্রসারণ কর্মকর্তা রাফিউল বারী জানান, গত ২০ বছরেও সেচ কমান্ডিং এরিয়ার ১০ হাজার হেক্টর জমি, যেখানে বোরো ধান চাষ করা যায়নি, সেখানেও এবার নদীর পানি সরবরাহ করায় বাম্পার ফলন হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকার পাশাপাশি তিস্তা ব্যারাজ থেকে ক্যানেলের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে। ফলে অতিরিক্ত এক লাখ মেট্রিক টন ধান উৎপাদিত হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আলী জানান, এবার রংপুর অঞ্চলে বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। রংপুর অঞ্চলেই উৎপাদিত হয়েছে ২০ লাখ টন ধান। তিস্তা ব্যারাজের মাধ্যমে পানি সেচ দিতে পারায় সেখানেও ভালো ফলন হয়েছে।

খাদ্য অফিস সূত্র জানায়, ২৫ এপ্রিল থেকে ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান শুরুর কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে শুরু হয়েছে। প্রতি কেজি ধান ২৬ টাকা, সিদ্ধ চাল ৩৬ টাকা এবং আতপ চাল ৩৫ টাকায় কেনা হচ্ছে।

রংপুর বিভাগীয় খাদ্য কর্মকর্তা রায়হানুল কবির জানান, প্রতি কেজি চালের সরকারি সংগ্রহমূল্য ৩৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ মূল্য আশানুরূপ। কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনা হচ্ছে। রংপুর বিভাগে ২৫ হাজার টন ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার কৃষকের কাছ থেকে সাড়ে তিন হাজার টন ধান কেনা হয়েছে। সরকার আরো ধান কেনার ঘোষণা দিয়েছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা