kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৮ জুলাই ২০১৯। ৩ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৪ জিলকদ ১৪৪০

কুলাউড়ায় ট্রেন দুর্ঘটনা

মানবতার দৃষ্টান্ত, মাটি খুঁড়ে লাশ বের করলেন যারা

মাহফুজ শাকিল, কুলাউড়া থেকে   

২৫ জুন, ২০১৯ ২৩:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মানবতার দৃষ্টান্ত, মাটি খুঁড়ে লাশ বের করলেন যারা

‘এমন সময় কানে আসল ট্রেনের ভেতরে থাকা কোনো এক মেয়ের আর্তচিৎকার। বুকফাটা কান্নার আওয়াজে আমি স্থির থাকতে পারলাম না। দৌঁড়ে গিয়ে দেখলাম, একজন নারীর (কুলাউড়ার আব্দুল বারীর স্ত্রী মনোয়ারা পারভীন) শরীর ট্রেনের ভেতরে আর মাথাটা ট্রেনের জানালার বাইরে মাটির ভেতরে চাপা পড়ে আছে। মেয়েটা (রুকশানা পারভীন) বলতে লাগল, 'ভাই, আমি আমার মাকে না নিয়ে যাব না, আমার মাকে বের করেন।'
 
লোমহর্ষক এই কথাগুলো বলেন গত রবিবার (২৩ জুন) উপবন ট্রেন দুর্ঘটনাস্থল মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার বরমচাল ইউনিয়নের স্থানীয় সাবেক ফুটবলার ফখরুল আমিন চৌধুরী মিছলু।
 
তিনি বলেন, ওই দুর্ঘটনার পর বরমচাল ইউনিয়নের সর্বস্তরের মানুষ এগিয়ে এসে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিল।
 
প্রতিবেদককে দেওয়া প্রত্যক্ষদর্শী ও উদ্ধারকর্মী মিছলুর দেওয়া বিস্তারিত বর্ণনা নিচে তুলে ধরা হলো-
 
‘মাত্র খেয়ে টেবিল থেকে উঠলাম। এমন সময় বিকট শব্দ। ভেবেছিলাম ভূমিকম্প হয়েছে হয়তো। ওই সময় আমার চাচাতো ভাই দীপু (এজাজ কবির দীপু) ফোন দিয়ে বলল, ‘তোমাদের বাড়ির সামনে উপবন ট্রেন এক্সিডেন্ট করেছে, দ্রুত আসো।’ কোনো কিছু না ভেবে আমি ও আমার আরো দুই ভাই হুছনুল আমিন চৌধুরী ফাজু, লুৎফুল আমিন চৌধুরী মারফু ঘটনাস্থলে যাই। সেখানে গিয়ে উপলব্ধি করলাম- বিভৎস অবস্থা, চারিদিকে অন্ধকার, ভীতিকর পরিবেশ, সুনসান নিরবতা।
 
দৌঁড়ে গিয়ে উল্টে যাওয়া ট্রেনের ওপর উঠে যাই। ওপর থেকে ভেতরের দৃশ্য দেখে মনে হয়েছিল সবাই লাশ হয়ে পড়ে আছে। আমার উপস্থিতি টের পেয়ে দুই একজন বলতে শুরু করলেন, ‘ভাই, আমার হাত নাই, আমাকে বের করেন।’ আর একজন যাত্রী বললেন ভাই, ‘আমার পা তুলতে পারছি না, আমাকে বের করেন।’ বুঝলাম ওখানে লাশের চেয়ে আহতের সংখ্যা বেশি। উদ্ধার কাজ শুরু করলাম, আমাদের স্থানীয় জয়নুল ইসলামকে বলি, ‘একটা মইয়ের ব্যবস্থা করো। নতুবা মানুষদের নামাতে পারব না।
 
এভাবেই উদ্ধার করা হচ্ছিল আহত ব্যক্তিদের। এমন সময় কানে আসল কোনো এক মেয়ের আর্তচিৎকার। বুক ফাটা কান্নার আওয়াজে আমি স্থির থাকতে পারলাম না। দৌড়ে গিয়ে দেখলাম, একজন নারীর (পরে জানতে পারি তিনি কুলাউড়ার আব্দুল বারীর স্ত্রী মনোয়ারা পারভীন) শরীর ট্রেনের ভেতরে আর মাথাটা ট্রেনের জানালার বাইরে মাটির ভেতরে চাপা পড়ে আছে। মেয়েটা (রুকশানা পারভীন) বলতে লাগল, ‘ভাই, আমি আমার মাকে না নিয়ে যাব না, আমার মাকে বের করেন।
 
ওই অবস্থাতেই ট্রেনের ভেতর থেকে আমি, জয়নুল ইসলাম, আমার ভাই ফাজু, মারফু, সালামত খান, হাসান উদ্দিন, নুর আলী, শফিক, জাকির আহমদ, সাহিদ মিয়া ট্রেনের দুই জানালার নিচের মাটি সরানো শুরু করলাম। এক পর্যায়ে নারীর মাথাটি বের করতে সক্ষম হলাম। বিকৃত হয়ে যাওয়া মাথাটা দেখে উপস্থিত কেউ কেউ ভয় পাচ্ছিলেন। আমি নারীর মেয়ের গায়ের ওড়না নিয়ে অর্ধেক করে লাশটি ঢেকে বেঁধে নিলাম। পরে নারীর গায়ের শাড়ির আঁচল দিয়েও মাথাটা বেঁধে দিলাম।
 
এদিকে, একই বগির শেষ মাথায় আরো দুইজন নারীর (সিলেট ওসমানী মেডিক‍্যাল কলেজ হাসপাতালের নার্স সানজিদা আক্তার (২০) ও ফাহমিদা ইয়াসমিন ইভা (২০) পা ট্রেনের ভেতরে পড়ে থাকতে দেখা যায়। কিন্তু শরীরের বেশিরভাগ অংশ ট্রেনের নিচে চাপা পড়ে আছে। আমি ওপরে উঠে উপস্থিত কয়েকজনকে চিৎকার করে বললাম, ট্রেনের উল্টো পাশে গিয়ে মাটি সরিয়ে লাশ দুটি বের করতে খননে সাহায্য করেছেন স্বপন, শফিক, কালাম। 
 
এরপরের সর্বশেষ বগি থেকে একজন পুরুষের (হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল উপজেলার নুর হোসেনের ছেলে কাওছার হোসেন (২৬) লাশ বগি থেকে বের করে কাধে করে মাটিতে নামান কয়ছর টেইলার। এ সময় উদ্ধার কাজে নিরলস শ্রম দেন মো. আবু হানিফ, তাজুল ইসলাম সাইকুল, এম. জামাল হোসেন, চুনু প্রমুখ।
 
এ ছাড়াও উদ্ধার কাজে অক্লান্ত পরিশ্রম করেন কুলাউড়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এ কে এম সফি আহমদ সলমান, ভাটেরা ইউপি চেয়ারম্যান এ কে এম নজরুল ইসলাম, বরমচালের নজরুল ইসলাম লিজাত, আব্দুল বাছিত, আব্দুস সালাম, মাতাব, আব্দুল করিম, রিপন, কাওছার, ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নের নজরুল ইসলামসহ শতাধিক স্থানীয় লোক। এ সময় স্থানীয় অনেক নারীও মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসেন।
 
লাশ উদ্ধারের শেষ মুহূর্তে ফায়ার সার্ভিসের টিম আমাদের কাছ থেকে লাশগুলো গ্রহণ করে।
 
‘শুধু আমরা না বরমচাল ইউনিয়নের সকল শ্রেণী-পেশার মানুষ সাহোয্যে এগিয়ে আসেন। ভাটেরা-ব্রাহ্মণবাজারের অনেক মানুষও উদ্ধার কাজে সহযোগীতা করে। বরমচাল ইউনিয়নের সিএনজি মালিক-ড্রাইভার সমিতির উদ্যোগে মানবতার খাতিরে আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কাজে নিয়োজিত ছিল। সিএনজি মালিক ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ইছহাক চৌধুরী ইমরান, সাহান উদ্দিন আহমদ, আব্দুল জহুর ডেন ও সিএনজি ড্রাইভার সমিতির সভাপতি আব্দুস সালাম, সাধারণ সম্পাদক বাবেল মিয়া আহতদের উদ্ধারপূর্বক হাসপাতালে স্থানান্তরে সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন।’
 
এ বিষয়ে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ইছহাক চৌধুরী ইমরান বলেন, ‘বরমচালের সর্বস্তরের মানুষ অনেক অক্লান্ত পরিশ্রম করে মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যে আহত মানুষকে উদ্ধার করে। লাশগুলোকে উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিসের ইউনিটের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পরে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বাকি উদ্ধার কাজে সহায়তা করে।
 
সাবেক ফুটবলার ও সংগঠক এম জামাল হোসেন বলেন, ‘খবর পেয়ে বরমচালের সর্বস্থরের মানুষ এগিয়ে আসেন। মানুষের সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় হতাহতের সংখ্যা কমে যায়।’
 
সাবেক ফুটবলার ও সংগঠক তাজুল ইসলাম সাইকুল বলেন, ‘উদ্ধারকাজে যেভাবে বরমচালবাসী এগিয়ে এসে সহায়তা করেছে তা সত্যিই ইতিহাসে লিপিবদ্ধ থাকবে। মানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করল বরমচালবাসী।’
 
প্রসঙ্গত, ২৩ জুন রবিবার সিলেট থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী উপবন ট্রেন কুলাউড়ার বরমচাল রেলস্টেশন সংলগ্ন ইসলামাবাদ এলাকার বড়ছড়া ব্রীজে ট্রেনটি লাইনচ্যুত হয়ে ৫টি বগি ছিটকে পড়ে। ওই দুর্ঘটনায় তিনজন নারী ও একজন পুরুষের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন শতাধিক।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা