kalerkantho

বুধবার । ২৪ জুলাই ২০১৯। ৯ শ্রাবণ ১৪২৬। ২০ জিলকদ ১৪৪০

কুলাউড়া হাসপাতালে স্বজনদের ভিড়

মাহফুজ শাকিল, কুলাউড়া থেকে   

২৫ জুন, ২০১৯ ০৩:২৭ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



কুলাউড়া হাসপাতালে স্বজনদের ভিড়

ছবি: কালের কণ্ঠ

উপবন এক্সপ্রেস দুর্ঘটনায় আহত ও নিহতদের দেখতে কুলাউড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভিড় করেছে হাজার হাজার মানুষ। সেখানে এসেছেন ওই রেলে থাকা যাত্রীদের স্বজনরা। এ সময় নিখোঁজ স্বজনের খোঁজে এসে অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। 
 
কুলাউড়ার ভূকশিমইল গ্রামের বাসিন্দা আনু মিয়া এসেছেন তাঁর কলেজ পড়ুয়া ছেলে শাকিলের খোঁজে। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, উপবন এক্সপ্রেসে করে তাঁর ছেলে ঢাকায় যাচ্ছিল। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে তিনি হাসপাতালে ছুটে আসেন। এখন পর্যন্ত ছেলে শাকিলের খোঁজ পাননি আনু মিয়া। মুঠোফোনেও ছেলেকে পাচ্ছেন না বলে তিনি জানান। 
 
চিকিৎসা নিতে আসা রুবেল নামের এক যাত্রী জানান, রেলের নিচে অনেক লাশ এখনো চাপা পড়ে আছে। কুলাউড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মূল ফটক থেকে ভেতর পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অনেক মানুষ অ্যাম্বুলেন্সে করে নিয়ে আসা আহতদের দেখতে অ্যাম্বুলেন্স থামিয়ে পরিচিতদের খোঁজ করেন। 
 
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আহতদের দেখতে আসেন মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক মো. তোফায়েল ইসলাম, পুলিশ সুপার মো. শাহজালাল, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এ কে এম সফি আহমদ সলমানসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। কালের কণ্ঠকে তাঁরা নিশ্চিত করেছেন, কুলাউড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৪ জনের লাশ ছিল। এদের মধ্যে ৩ জন নারী ও ১ জন পুরুষ।
 
মেয়ের বাসায় বেড়াতে গিয়ে আর ফেরা হলো না মায়ের
মেয়ের বাসা সিলেট বেড়াতে গিয়ে আর বাড়ি ফেরা হলো না মনোয়ারা পারভিন (৪৫) নামের এক নারীর। উপবন এক্সপ্রেস ট্রেনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় তিনি ঘটনাস্থলে মারা যান। মনোয়ারা পারভিন কুলাউড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মো. আব্দুল বারীর স্ত্রী।
 
শনিবার দুপুরে পারাবাত ট্রেনে মনোয়ারা পারভিন তাঁর দ্বিতীয় মেয়ে কুলাউড়া ইয়াকুব তাজুল মহিলা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের স্নাতক ২য় বর্ষের ছাত্রী রুকশানা পারভিনকে সঙ্গে নিয়ে তার বড় মেয়ে ইশরাত আরা মুন্নির সিলেটের বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলেন। ২৩ জুন রবিবার নিহত মনোয়ারার একমাত্র ছেলে সিলেট শাহজালাল সিটি কলেজের ছাত্র শাহরি আহমদ দীপু সিলেট থেকে তার মা ও বোন রুকশানাকে একটি সিএনজি অটোরিকশা দিয়ে সিলেট স্টেশন পাঠায়। সেখানে তারা বিকেলে পারাবত ট্রেন কুলাউড়ায় ফেরার কথা ছিল। পারাবত ট্রেন সিলেট সময় মতো ধরতে না পারায় তারা রাতের উপবন ট্রেনে উঠেন।
 
এরপর ট্রেন কুলাউড়ার বরমচাল রেলক্রসিং এলাকায় আসার পর দুর্ঘটনার শিকার হলে ট্রেনের বগি উল্টে পড়ে যায়। এ সময় নিহত মনোয়ারার মেয়ে রুকশানা তাঁর মাকে উদ্ধারের প্রাণপ্রণ চেষ্টা চালায়। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর বাবাকে ফোন দেয়, বাবা আম্মা মারা গেছেন, ট্রেনের ভেতর আটকা পড়ছেন, গাড়ি থেকে উনাকে বের করতে পারছি না।
 
খবর পেয়ে মনোয়ারার স্বামী কুলাউড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য মো. আব্দুল বারী ঘটনাস্থলে স্ত্রীকে উদ্ধারের জন্য বাসা থেকে রওয়ানা দেন। কিন্তু তিনি সেখানে গিয়ে স্ত্রীকে পাননি। এর আগে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা তার লাশ উদ্ধার করে কুলাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসে। সেখানে মনোয়ারার স্বামী আব্দুল বারী তার লাশ শনাক্ত করে মরদেহ কুলাউড়ার টিটিডিসি এলাকায় বাসায় নিয়ে আসেন। মরদেহ বাসায় আনার পর শোকের মাতম শুরু হয়। তাকে একনজর দেখার জন্য বাসায় সহস্রাধিক লোকের সমাগম ঘটে।
 
মৃত্যুকালে মনোয়ারা পারভিন স্বামী, দুই মেয়ে ও এক ছেলে, আত্মীয়স্বজনসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। সোমবার দুপুরে সরেজমিন নিহত মনোয়ারা পারভিনের বাসায় যাওয়ার পর দেখা যায় স্বজনদের আহাজারি। বাসার বাইরে গাছের নিচে বসে স্ত্রীকে হারিয়ে বিলাপ করছেন স্বামী মো. আব্দুল বারী। এ সময় তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সহযোদ্ধাসহ বিভিন্ন আত্মীয়স্বজন এসে সান্তনা দিচ্ছেন।
 
ঘরের ভেতরে মাকে হারিয়ে আহাজারি করে কান্না করছেন মেয়ে রুকশানা পারভিন, ইশরাত আরা মুন্নি ও ভাই শাহরি আহমদ দীপু। সোমবার বিকেল ৫টায় সময় মো. আব্দুল বারীর গ্রামের বাড়ি কুলাউড়া উপজেলার কাদিপুর ইউনিয়নের গুপ্তগ্রামে জানাজার নামাজ শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
 
মাইকিং শুনে ছুটে আসে ‘নারী-পুরুষ’
উপবন এক্সপ্রেস ট্রেন মর্মান্তিক দুর্ঘটনার খবর শুনে স্থানীয় বরমচাল ও ভাটেরা ইউনিয়নের কয়েক শতাধিক মানুষ উদ্ধার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। ঘুম ভেঙে পুরুষ সদস্যদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে উদ্ধার কাজে অংশ নেন নারীরাও।
 
তাৎক্ষণিক যাত্রীদের চিৎকার শুনে পার্শ্ববর্তী বরমচাল বাজারে অবস্থানরত স্থানীয় বাসিন্দা এগিয়ে আসেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে স্থানীয় স্টেশন বাজার মসজিদে মাইকিং করে উদ্ধার কাজে নামেন এলাকাবাসী। মাইকিং শুনে ঘর ছেড়ে ঘুম ভেঙে উদ্ধার কাজে নামেন নারী-পুরুষ উভয়ে।
 
স্থানীয় বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম বলেন, সরকারি উদ্ধারকর্মীরা পৌঁছার আগেই আমরা এলাকাবাসী মিলে প্রায় ৫০ ভাগ মানুষকে উদ্ধার করে ফেলি। পরে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও অন্যান্য বাহিনী এসে উদ্ধার কাজ শুরু করে। আমরা তখনো তাদের সাহায্য করেছি। এলাকার মানুষ এগিয়ে না এলে নিহতের সংখ্যা আরো বাড়তো বলে জানান তিনি।
 
দুর্ঘটনা কবলিত ট্রেনের চ বগির যাত্রী চাঁদপুর জেলার বাসিন্দা মিজানুর রহমান ও মুহিবুর রহমান জাহাঙ্গীর বলেন, এলাকার মানুষের সহায়তায় আমরা প্রাণে রক্ষা পেয়েছি। তারা এসে আমাদের উদ্ধার করে আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে। অক্ষতদের নিজেদের বাড়িঘরে আশ্রয় দিয়েছেন। আমরা তাদের কাছে আজীবন কৃতজ্ঞ থাকব।
 
স্থানীয়দের এমন স্বেচ্ছায় অংশগ্রহণের প্রশংসা করেছেন মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক মো. তোফায়েল ইসলাম, পুলিশ সুপার মো. শাহজালাল, কুলাউড়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এ কে এম সফি আহমদ সলমান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রাশেদুল ইসলাম।
 
নড়বড়ে লাইনে ক্লিপ ‘ছাড়াই’ চলছিল ট্রেন!
কুলাউড়া উপজেলার বরমচাল রেলস্টেশনের কাছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা করা হয়েছিল কয়েক মাস আগে থেকেই। ওই এলাকার রেল লাইন দীর্ঘদিন থেকে নড়বড়ে ছিলো বলে স্থানীয় এলাকাবাসীরা জানিয়েছেন। রেল লাইনে ছিল না ক্লিপ। অবশেষে সেই আশঙ্কাই সত্যি হলো। রবিবার ২৩ জুন রাতে সিলেট থেকে ছেড়ে আসা উপবন এক্সপ্রেস ট্রেনটি বরমচাল স্টেশনের ইসলামাবাদ এলাকার বড়ছড়া ব্রিজে লাইনচ্যুত হয়ে একটি বগি খাদে পড়ে যায়। এ ঘটনায় ৪ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ। 
 
ক্লিপ ছাড়া নড়েবড়ে রেললাইন নিয়ে ‘কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাকে’ দায়ী করে বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুলে ধরেছিলেন প্রবাসী লুৎফর রহমান রাজু নামের স্থানীয় এক ব্যক্তি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ফেসবুকে চারটি ছবিসহ তিনি পোস্টটি দিয়েছিলেন।
 
আম্মা আমি ঢাকা যাচ্ছি
ফাহমিদা ইয়াছমিন ইভা। সে সিলেট নার্সিং কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। রবিবার উপবন ট্রেনে ঢাকায় একটি নার্সিং ক্যাম্পেইনে যাবার কথা ছিল। শনিবার বিকেলে ইভা তার মা রহিমা খানমকে মুঠোফোনে জানায় আম্মা আমি ঢাকায় যাচ্ছি প্রশিক্ষণে। দোয়া করবে। এটাই ছিল ইভার মায়ের সঙ্গে শেষ কথা। উপবন ট্রেন দুর্ঘটনায় তার আর ঢাকা যাওয়ার স্বপ্ন ভন্ডুল হয়ে গেল। 
 
ঘটনার দিন রাত প্রত্যক্ষদর্শী একজন তার ব্যবহৃত মোবাইলে ফোনে ইভার বান্ধবীকে ফোনে জানায়া তার মৃত্যুর কথা। বান্ধবীর মাধ্যমে ইভার পরিবার তার মৃত্যু সংবাদ জানতে পারে। পরে ইভার স্বজনরা কুলাউড়া হাসপাতালে এসে তার লাশ শনাক্ত করে বাড়িতে নিয়ে যায়। 
 
ফাহমিদা ইয়াসমিন ইভা সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলার জালালপুরের আব্দুল্লাহপুর গ্রামের আব্দুল বারীর মেয়ে। এদিকে ইভার আরেক বান্ধবী সিলেট নার্সিং কলেজের ছাত্রী সানজিদা আক্তারও একই ট্রেনে ঢাকায় যাচ্ছিলো। দু’জন আজ আর পৃথিবীতে নেই। 
 
নিহত সানজিদা আক্তার বাগেরহাট জেলার মোল্লার হাট থানার ভানদর খোলা গ্রামের মো. আকরাম মোল্লার মেয়ে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা