kalerkantho

বুধবার । ১৭ জুলাই ২০১৯। ২ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৩ জিলকদ ১৪৪০

ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে পঞ্চগড়ের করতোয়া সেতু

পাথর বিটুমিন দিয়ে বার বার ঝুঁকি চাপা দেওয়ার চেষ্টা

পঞ্চগড় প্রতিনিধি   

২৪ জুন, ২০১৯ ২১:৪৬ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে পঞ্চগড়ের করতোয়া সেতু

পঞ্চগড় জেলা শহরে প্রবেশ মুখে থাকা করতোয়া সেতুটি দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে। প্রতিদিন তেঁতুলিয়া থেকে সেতুটির ওপর দিয়ে ধারণ ক্ষমতার অধিক মালামাল নিয়ে চলাচল করছে শত শত ট্রাক। কখনো কখনো ৪০ থেকে ৫০ টন মালামাল নিয়ে চলাচল করছে। সেতুটির সক্ষমতার বেশি ভারি যান চলাচল করায় সেতুটি ক্রমশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। সেতুটির প্রতিটি পোল জয়েন্টে ফাঁকার পরিমাণ বাড়ছে।

এ ছাড়া খসে পড়ছে পলেস্তরা, উঠে যাচ্ছে ওয়েরিং কোর্স। কোথায় কোথাও সেতুর রড বেড়িয়ে গেলে বার বার সড়ক বিভাগ থেকে পাথর বিটুমিনের দিয়ে ঝুঁকি চাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে সেতুটির বড় ধরণের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। তাই তারা বিকল্প সেতু ও বাইপাস সড়ক নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।

জানা যায়, ১৯৮৮ সালে পঞ্চগড় জেলা শহরের প্রবেশ মুখে করতোয়া নদীর ওপর ২৭৫ মিটার করতোয়া সেতু নির্মাণ করা হয়। শহরের কোল ঘেঁষে নির্মিত সেতুটিই হয়ে উঠে পঞ্চগড়ের সাথে দেশের অন্য প্রান্তের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। জেলা শহরে প্রবেশের একমাত্র পথ এটি। সেতুটির সক্ষমতা অনুযায়ী দুই এক্সেল ৬ চাকার ট্রাক সর্বোচ্চ ২০ টন, তিন এক্সেল ১০ চাকার ট্রাক সর্বোচ্চ ৩০ টন ও চার এক্সেল ১৪ চাকার ট্রাক সর্বোচ্চ ৪০ টন মালামাল সেতুটির উপর দিয়ে পরিবহণ করতে পারবে নির্দেশনা দিয়েছে সড়ক বিভাগ।

বর্তমানে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরসহ পঞ্চগড়ের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন ৫’শ থেকে ৬’শ পাথর ও বালিবাহী ট্রাক ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত মালামাল নিয়ে এই করতোয়া সেতুর ওপর দিয়ে চলাচল করছে। ১০ চাকার ট্রাকগুলো ৪০ থেকে ৫০ টন পর্যন্ত মালামাল পরিবহন করছে। এতে ক্রমশ সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।

১৯৯৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর নেপালের সাথে এবং ২০১১ সালের ২২ জানুয়ারি ভারতের এবং ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি ভুটানের আমদানি রপ্তানি কার্যক্রম চালু হয়। এরপর থেকে প্রতিদিন বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর থেকে পাথরসহ ভারি ভারি পণ্য নিয়ে কয়েক শ ট্রাক দেশের স্থানে পৌঁছে দিচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, সেতুটির বিভিন্ন পোলের সংযোগস্থলের ফাঁকা পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। একই সাথে বিভিন্ন স্থানে ওয়েরিং কোর্স উঠে গেছে। কোথাও কোথও খসে পড়েছে পলেস্তরা, বেড়িয়ে গেছে রড। কয়েক দিন পর পর সড়ক বিভাগ বেড়িয়ে যাওয়া রডসহ পোলের সংযোগ স্থলে ফাঁকা বন্ধ করতে পাথর ও বিটুমিট দিয়ে তা ঢেকে দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে আসছে। কিন্তু মেরামতের কয়েক দিনের মাথায় আবার তা উঠে যায়। এভাবেই বার বার ঝুঁকি চাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানান স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, ওভার লোডিং রোধ ও সেতুটির সংস্কার কাজ না করা হলে চরম ভোগান্তি পোহাতে হবে জেলাবাসীকে।

আমাদের পঞ্চগড় নামের একটি সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবী মোকছেদুল ইসলাম বলেন, অবিলম্বে করতোয়া সেতুর ওপর দিয়ে অতিরিক্ত মালামাল নেওয়া যানবাহনের চলাচল বন্ধ করতে হবে। সেতুটি দিন দিন যেমন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে তেমনি শহরের মধ্য দিয়ে অধিক যানবাহন চলাচল করায় শহরটিও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। আমরা চাই পঞ্চগড় জেলা শহরের বাইরে দিয়ে একটি বাইপাস সড়ক ও সেতু নির্মাণ করা হোক। যাতে সেখান দিয়েই পণ্যবাহী যানবাহনগুলো চলাচল করতে পারে। 

কলেজছাত্র আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, প্রতিদিন আমি করতোয়া সেতুর উপর দিয়ে কলেজে যাই। সেতুর ওপরে রড বেড়িয়ে গেছে। পোলের সংযোগের ফাঁকাগুলো বাড়ছে। কয়েকদিন পর পর দেখি তা পাথর ও বিটুমিট দিয়ে ঢেকে দেয় সড়ক বিভাগের লোকজন। কয়েকদিন চলার পর আবার আগের মতো অবস্থার সৃষ্টি হয়।

ট্রাক চালক ইব্রাহিম বলেন, এখন করতোয়া সেতুর উপরে উঠলেই সেতু কেমন যেন নড়ে উঠে। আগে এমনটা হয়নি। আর ব্যবসায়ীদের চাহিদা মতো আমাদের মালামাল নিয়ে হয়। আমি কম নিতে চাইলেও তারা তা মানবে না।

পঞ্চগড় নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এরশাদ হোসেন সরকার বলেন, করতোয়া সেতুর ওপর দিয়ে শত শত ভারি যানবাহন মাত্রাতিরিক্ত পণ্য পরিবহণ করায় সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। কোনো কারণে এই সেতুটি ভেঙে পড়লে জেলা শহরের সাথে অন্যান্য উপজেলার যোগাযোগ বন্ধ হয়ে পড়বে। তাই কঠোরভাবে সেতুটির ওপর দিয়ে ভারি যানবাহন চলাচল বন্ধ করা হোক। সেই সাথে বিকল্প একটি বাইপাস সড়ক নির্মাণ করার দাবি জানাচ্ছি।

পঞ্চগড় মটর পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মোশারফ হোসেন জানান, আমরা চাই নির্ধারিত ওজন নিয়েই আমাদের যানবাহনগুলো চলাচল করুক। তবে সেই ক্ষেত্রে আমাদের জেলার বাইরে থেকে যে সকল ভারি ভারি যানবাহন আমাদের জেলায় আসে। তাদেরকেও এই নিয়মের মধ্যে আনতে হবে। সেতুটির কোনো ক্ষতি হলে আমাদেরই বেশি ক্ষতি হবে।

তেঁতুলিয়া হাইওয়ে থানার ওসি এনামুল হক বলেন, আমরা প্রতিনিয়ন ওভার লোড নিয়ন্ত্রণের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। ব্যবসায়ীদের লাভ জড়িত থাকায় ওভার লোড পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়ে উঠছে না। তারপরও আমরা আমাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। সবার সহযোগিতা পেলে আমরা শতভাগ ওভার লোড নিয়ন্ত্রণ করতে পারবো।

পঞ্চগড় সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী জহুরুল ইসলাম বলেন, সম্প্রতি সেতু বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা করতোয়া সেতু পরিদর্শন করেছেন। তারা জানিয়েছেন সেতুটির মূল কাঠামো এখনো ঠিক আছে। তবে উপরের ওয়েরিং কোর্স নষ্ট হয়ে গেছে। সেটি মেরামত করতে তিন দিন সেতুটির ওপর দিয়ে চলাচল বন্ধ রাখতে হবে। কিন্তু এই সেতুটির ওপর দিয়ে তিন দিন চলাচল বন্ধ রাখা প্রায় অসম্ভব। তারপরও তারা হয়তো কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। তবে আমরা সেতুর কাছেই যানবাহনের ওজন সীমার বিলবোর্ড টানিয়ে দিয়েছি। আমরা বার বার অনুরোধ করছি। এই ওজন সীমার বাইরে যেন পণ্য পরিবহণ না করা হয়। 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা