kalerkantho

সোমবার । ২২ জুলাই ২০১৯। ৭ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৮ জিলকদ ১৪৪০

হামলা-লুটপাট, সংবাদ সম্মেলন

নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা : যুবলীগকর্মীকে কুপিয়ে হত্যা

মাদারীপুর প্রতিনিধি   

১৯ জুন, ২০১৯ ১৯:৫২ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা : যুবলীগকর্মীকে কুপিয়ে হত্যা

মাদারীপুর সদর উপজেলা পরিষদ নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় এক যুবলীগকর্মীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী ও সাবেক নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের ছোট ভাই অ্যাডভোকেট ওবাইদুর রহমান কালু খানের সমর্থকদের বিরুদ্ধে। বুধবার বেলা ১টার দিকে মাদারীপুর পৌর শহরের সবুজবাগ এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত জসিম গৌড়া পলাতক আছে।

এছাড়াও মঙ্গলবার রাত ও বুধবার দুপুর পর্যন্ত মাদারীপুর সদর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে সদর উপজেলা নির্বাচন পরবর্তী সহিংস ঘটনায় কমপক্ষে ২৫ জন আহত এবং প্রতিপক্ষের হামলায় দোকানপাটসহ ৪০ বাড়িঘর ভাংচুর ও লুটপাটের সংবাদ পাওয়া গেছে। এ সব ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বিকেলে সংবাদ সম্মেলন করেছে মাদারীপুর জেলা আওয়ামী লীগ।

দলীয় সূত্র, পুলিশ, সংবাদ সম্মেলন, নিহতের পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বেলা ১টার দিকে সবুজবাগ এলাকার নদীর পাড় দিয়ে যাচ্ছিলেন নৌকা প্রতীকের সমর্থক ও পৌরসভার ৩নং ওয়াড যুবলীগের সদস্য এরশাদ মুন্সী (২৩)। 

এ সময় ওঁত পেতে থাকা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে বিজয়ীর সমর্থক ও যুবলীগকর্মী জসিম গৌড়া তার দলবল নিয়ে এরশাদকে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করে। এ সময় এরশাদের আত্ম-চিৎকারে এলাকাবাসী এগিয়ে এসে মুর্মূষ অবস্থায় উদ্ধার করে মাদারীপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এরশাদের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা হাসপাতালে ছুটে আসেন। 

এরশাদ সবুজবাগ এলাকার বেলায়েত মুন্সীর ছেলে। সে ১৮ জুন মঙ্গলবার  অনুষ্ঠিত মাদারীপুর সদর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী কাজল কৃষ্ণ দে’র সমর্থক ছিলেন। 

নির্বাচনে জসিম গৌড়া বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী চেয়ারম্যান ও সাবেক নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের ছোট ভাই অ্যাড. ওবাইদুর রহমান কালু খানের সমর্থক-কর্মী। 

তবে এর আগেও এরশাদ এবং জসিম গৌড়ার সাথে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় প্রভাব নিয়ে বিরোধ চলে আসছিল। 

যুবলীগকর্মী এরশাদের নিহত হওয়ার ঘটনার কিছু সময় পরেই জসিম গৌড়ার বাড়িঘরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। 
মাদারীপুর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা প্রায় দুই ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ঘটনার পর মাদারীপুর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও র‌্যাব ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। ওই এলাকাসহ আশ-পাশে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়ন করা হয়েছে। 

নিহতের মামা যুবলীগ নেতা কাওছার হোসেন অভিযোগ করে জানান, এরশাদ নৌকার সমর্থক হওয়ায় জসিম গৌড়া তার সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে এরশাদকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে। জসিমের বিরুদ্ধে ডাকাতি, খুনসহ একাধিক মামলা রয়েছে। নির্বাচনে আমাদের হত্যা করতে পারে, এই বিষয়টি পুলিশ সুপারকে বার বার বলা হলেও তাকে গ্রেফতার করেনি। এটা পরিকল্পিত হত্যাকান্ড। আমরা জসিমসহ খুনিদের বিচার দাবি করি। 

এদিকে বুধবার সকালে সদর উপজেলার পেয়ারপুর ইউনিয়নের গাছবাড়িয়া এলাকায় প্রতিপক্ষরা হামলা চালিয়ে কমপক্ষে ২৫ বাড়িঘর ভাংচুর ও ব্যাপক লুটপাট করেছে। এ সময় নারীসহ আহত হয় ১৫ জন। 

এই ভাংচুর ও লুটপাটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বজলু মাতুব্বর, আরিফ হাওলাদার, আউয়াল হাওলাদার, ইনু হাওলাদার, রায়হান হাওলাদার, সবুজ জমাদার, ওমর আলী, সাইদুল হাওলাদার ও আবুল মাতুব্বর। এছাড়াও ১০/১৫ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘটনার পর থেকে এলাকা পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে।

এছাড়াও মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে সদর উপজেলার দত্তকেন্দুয়া গ্রামের নৌকার সমর্থক চিত্তরঞ্জন মৃধার বাড়িতে হামলা চালিয়ে ১০ ঘর ভাংচুর করা হয়। এসময় বাড়ির নারীসহ আহত হয় ১০জন। একই রাতে সদর উপজেলার মস্তফাপুর বাজারে আনিছ চৌকিদার, নূরল হক চৌকিদার ও হারেজ চৌকিদারের দোকান ভাংচুর ও লুটপাট করা হয়। এতে ৭ লক্ষাধিক টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে ক্ষতিগ্রস্থরা দাবী করেন।

অপরদিকে মঙ্গলবার রাতে মাদারীপুর সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পাভেলুর রহমান শফিক খানের বাসায় হামলা করেছে দুর্বৃত্তরা। এই ঘটনায় পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে।

স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মাদারীপুর শহরের কলেজ গেট এলাকায় সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পাভেলুর রহমান শফিক খানের বাসায় মঙ্গলবার রাতে হামলা করেছে দুর্বৃত্তরা। এসময় তার বাসায় গেটের সামনের সাটার কুপিয়েছে ও বাসায় ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেছে। তবে এই ঘটনায় কারো হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। 

বাড়ির তত্ত্ববধায়ক মো. মুন্সি জানান, রাতে কিছু বুঝে উঠার আগেই বেশ কয়েক যুবক হামলা করে পালিয়ে যায়। পরে আমরা মুল গেট বন্ধ করে দেই।

চেয়ারম্যানের বড় ভাই বজলুর রহমান মন্টু খান বলেন, আমার ভাইয়ের বাসা লক্ষ্য করে বোমা ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেছে। বাড়ির সামনের সাটার কুপিয়ে ভাঙচুর করেছে। আমরা আওয়ামী লীগের দলীয় লোক। আমাদের বাসাতেই যদি হামলা হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের কি অবস্থা হবে? আমরা দোষিদের বিচার চাই। 

মাদারীপুর সদর থানার এসআই মো. নাহিদ বলেন, এ ধরণের হামলা যারাই করেছে তারা খুব অন্যায় করেছে। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখবো। দোষীদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। 

এসব ঘটনায় বুধবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে সিভিল সার্জন অফিসের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাচনে পরাজিত চেয়ারম্যান প্রার্থী কাজল কৃষ্ণ দে।

তিনি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, নৌকার সমর্থক হয়ে কাজ করায় দুপুরে যুবলীগ নেতা এরশাদকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এছাড়াও নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর পরই রাতে উপজেলা চেয়ারম্যান পাভেলুর রহমান শফিক খানের বাসায় হামলা, শ্রীনদী আওয়ামীলী নেতা মিন্টুর বাড়ীতে হামলা ও লুটপাট, ছিলারচরের নৌকার সমর্থক আকন বাড়ী, নয়াকান্দি, সাবেক চেয়ারম্যানের বোনের বাড়ী, পেয়ারপুরের গাছবাড়িয়ায় নৌকার সমর্থক ইদ্রিস ও ইউনুস চৌকিদারের বাড়ীসহ অনেক বাড়িতে হামলা, দত্ত কেন্দুয়ায় চিত্ত বৈদ্যের বাড়িতে হামলা, খোয়াজপুরে নৌকার অফিসে হামলা, কালিকাপুরে সরোয়ার বেপারীর বাড়ীতে হামলা ও আগুন ধরিয়ে দেয়। নির্বাচন পরবর্তী সকল অন্যায়, জুলুম, সহিংসতার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই এবং সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার পূর্বক আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানাই। 

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পাভেলুর রহমান শফিক খান, জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ও পৌর মেয়র মো. খালিদ হোসেন ইয়াদ, সাংবাদিক গোলাম মাওলা আকন্দ প্রমুখ।

মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার উত্তম প্রসাদ পাঠক বলেন, নিহতের ঘটনার সাথে কে বা কারা জড়িত, তা এখনো বলা যাচ্ছে না। তবে এ এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। কোন কারণে খুন হয়েছে, এখন তা বলা যাচ্ছে না। তবে যেই হত্যার সাথে জড়িত থাকুক না কেন, তদন্ত সাপেক্ষে বের করে শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা