kalerkantho

মঙ্গলবার। ১৬ জুলাই ২০১৯। ১ শ্রাবণ ১৪২৬। ১২ জিলকদ ১৪৪০

সড়ক সংস্কারকাজে চরম অনিয়ম

ঠিকাদার প্রভাবশালী, মন্ত্রীর কাছের লোক!

হাফিজুর রহমান চয়ন, হাওরাঞ্চল    

১৬ জুন, ২০১৯ ১৪:০৪ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ঠিকাদার প্রভাবশালী, মন্ত্রীর কাছের লোক!

এলজিইডির অধীনে প্রায় সাড়ে ৬৪ লাখ টাকা ব্যয়ে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ-চেঁছড়াখালী জিসি সড়কের মাঘান ব্রিজ হতে বাখরপুর ব্রিজ পর্যন্ত সড়কের প্রায় আড়াই কিলোমিটার ভাঙা স্থান মেরামত কাজে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে ঠিকাদার নিজের ইচ্ছেমতো যেনতেনভাবে এ সড়কের মেরামত কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে কাজ করার সঙ্গে সঙ্গেই রাস্তা থেকে কার্পেটিংয়ের মালামাল উঠে গিয়ে রাস্তার পাশে জমা হচ্ছে।

এতে করে এ সড়কপথে প্রতিদিন শত-শত যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী যান চলাচলকারীরাসহ এলাকাবাসীর মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হচ্ছে। 

এলাকাবাসীর অভিযোগ, এ কাজের তদারকির দায়িত্বে থাকা উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলীদের ম্যানেজ করেই ঠিকাদার যেনতেনভাবে এ সড়কের মেরামত কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন বলেই তারা এ ব্যাপারে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন না।

রাস্তাসংলগ্ন মানশ্রী গ্রামের বেশ ক'জন বাসিন্দা অভিযোগ করে বলেন, আমরা এলাকাবাসী এ কাজের শুরু থেকেই অনিয়মের ব্যাপারে বাধা দিয়ে আসছি। কিন্তু আমাদের কথা কে শোনে। তারা আরো বলেন, উপজেলা প্রকৌশলীদের ম্যানেজ করে তাদের সামনেই ঠিকাদার এ ধরনের নিম্নমানের কাজ করলেও তারা এ ব্যাপারে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেননি। 

মাঘান গ্রামের সিদ্দিক মিয়া বলেন, শুনেছি ঠিকাদার নাকি কোনো এক মন্ত্রীর কাছের লোক। তাই ওই ঠিকাদারের কাজের অনিয়মের বিরুদ্ধে কেউ কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ নেওয়ার সাহস পায় না। 

তবে তাদের বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে এ কাজের তদারকির দায়িত্বে থাকা উপজেলা এলজিইডির উপসহকারী প্রকৌশলী আতিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, এ কাজ শুরু করার আগে থেকেই আমরা ঠিকাদারকে সাইড থেকে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী অপসারণের জন্য তাগিদ দিয়ে আসছি। এমনকি লিখিতভাবেও তাকে জানানো হয়েছে। কিন্তু তিনি প্রভাবশালী হওয়ায় তিনি অফিসিয়াল নিয়ম-নীতির কোনো তোয়াক্কা না করেই নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করেই এ কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও তিনি জানান।

এদিকে এসব অভিযোগের ভিত্তিতে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে উপজেলা চেয়ারম্যান মো. শহীদ ইকবাল উপজেলা এলজিইডি প্রকৌশলী এম এম মামুন হাসানসহ স্থানীয় সাংবাদিকদেরকে নিয়ে ওই রাস্তার কাজ পরিদর্শনকালে তিনি কাজের মান নিয়ে ব্যাপক অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং এ কাজ বন্ধ রাখার জন্যও উপজেলা প্রকৌশলীকে নির্দেশ দেন উপজেলা চেয়ারম্যান। 

উপজেলা এলজিইডি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা এলজিইডি কার্যালয়ের অধীনে থাকা মোহনগঞ্জ-চেঁছড়াখালী জিসি সড়কের মাঘান ব্রিজ হইতে বাখরপুর ব্রিজ পর্যন্ত প্রায় আড়াই কিলোমিটার স্থান ভেঙে ছোট-বড় অসংখ্য গর্তের সৃষ্টি হয়ে তা যান চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। পরে এলজিইডি কার্যালয় থেকে ওই রাস্তার ক্ষতিগ্রস্ত স্থান মেরামতের জন্য প্রায় সাড়ে ৬৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়ে গত বছরের এপ্রিল মাসের শেষের দিকে দরপত্র আহ্বান করা হয়। দরপত্র অনুযায়ী এ কাজের দায়িত্ব পায় নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলাধীন 'জননী এন্টারপ্রাইজ' নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। আর এ কাজ গত ২০১৮ সালের মে মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে কাজ শুরু করে ৩০ জুনের মধ্যে মেরামত কাজ শেষ করার জন্য ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। কিন্তু সময়সীমার প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো পর্যন্ত রাস্তা মেরামতের অর্ধেক কাজও সম্পন্ন করতে পারেনি ঠিকাদার।

এ ব্যাপারে 'জননী এন্টারপ্রাইজ' এর স্বত্বাধিকারী ঠিকাদার সাইদুর রহমানের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, আমার জানামতে রাস্তা মেরামতের কাজ সঠিকভাবেই করা হচ্ছে। তবে কাজের অনিয়মের বিষয়ে এ পর্যন্ত আমি কোনো অফিসিয়াল চিঠি পাইনি। এ সময় অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মূলত কাজটি আমি নিজে করছি না। আমারই লাইসেন্সে নেত্রকোনার অরুণ নামে একজন ঠিকাদার এ কাজটি করছেন। তবে এ সংবাদটি প্রকাশ না করার জন্য কালের কণ্ঠের এ প্রতিনিধিকে অনুরোধ করে তিনি বলেন, আজকের মধ্যেই আমি আপনার সাথে 'সাক্ষাৎ' করব।

এ ব্যাপারে উপজেলা এলজিইডি প্রকৌশলী এম এম মামুন হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, আমি এ কার্যালয়ে মাত্র কয়েকদিন হলো যোগদান করেছি। তবে আমি বৃহস্পতিবার বিকেলে উপজেলা চেয়ারম্যান মহোদয়ের সাথে গিয়ে ওই রাস্তার কাজ পরিদর্শন করে অনিয়মের বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে ওই দিন বিকেলেই ঠিকাদারকে সাইটে মজুদকৃত নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী অপসারণসহ ত্রুটিপূর্ণ কাজ সংশোধন করার জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে। অন্যথায় এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা