kalerkantho

রবিবার। ১৬ জুন ২০১৯। ২ আষাঢ় ১৪২৬। ১২ শাওয়াল ১৪৪০

শাশুড়ি গ্রেপ্তার

আগুনে পোড়ানো গৃহবধূর চিকিৎসার দায়িত্ব নিলেন 'মানবিক ওসি'

লিটন শরীফ, বড়লেখা (মৌলভীবাজার)    

১৩ জুন, ২০১৯ ১৮:১১ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আগুনে পোড়ানো গৃহবধূর চিকিৎসার দায়িত্ব নিলেন 'মানবিক ওসি'

মৌলভীবাজারের বড়লেখায় গৃহবধূকে আগুনে পোড়ানোর ঘটনায় দায়ের করা মামলায় শাশুড়ি কমই বেগমকে (৫০) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অপরদিকে থানার ওসির উদ্যোগে ওই গৃহবধূকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। বুধবার (১২ জুন) রাতে ওই গৃহবধূকে ঢাকায় পাঠানো হয়। সেখানে তাঁর চিকিৎসা চলছে।

বিক্রির জন্য কানের সোনার অলংকার না পেয়ে আছমিনা বেগম (২৫) নামের ওই গৃহবধূকে স্বামী আগুনে পুড়িয়ে দগ্ধ করেছে। আগুনে ওই গৃহবধূর শরীরের বেশির ভাগ অংশই পুড়ে গেছে। গত ৪ জুন ভোররাতে উপজেলার বড়লেখা সদর ইউনিয়নের মুছেগুল গ্রামে এই ঘটনাটি ঘটেছে। এই ঘটনায় গত মঙ্গলবার (১১ জুন) ওই গৃহবধূর বাবা ছমির উদ্দিন বাদী হয়ে গৃহবধূর স্বামী ও শাশুড়িকে আসামি করে বড়লেখা থানায় একটি মামলা করেন।

পুলিশ, মামলা ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় তিন বছর পূর্বে বড়লেখা উপজেলার বড়লেখা সদর ইউনিয়নের মুছেগুল গ্রামের আনু মিয়ার ছেলে সাহেদ আহমদের সাথে একই ইউনিয়নের জফরপুর গ্রামের হতদরিদ্র ছমির উদ্দিনের মেয়ে আছমিনা বেগমের বিয়ে হয়। তাদের দুই বছরের একটি ছেলে রয়েছে। বিয়ের পর থেকে প্রায়ই স্বামীর মারধরের শিকার হতেন আছমিনা বেগম। সংসার ধরে রাখার চেষ্টায় মুখ বুজে সব মেনে নিতেন। কিন্তু বন্ধ হয়নি নির্যাতন। ঘটনার কয়েকদিন আগে আছমিনার বেগমের কানের স্বর্ণের অলংকার বিক্রি করার চেষ্টা করেন স্বামী সাহেদ আহমদ। বিষয়টি বুঝতে পেরে আছমিনা বেগম বাবার বাড়িতে গিয়ে সেখানে অলংকার রেখে আসেন। ঘটনার দিন (৪ জুন) ভোররাতে আছমিনা বেগমের কাছে সোনার অলংকার চান সাহেদ আহমদ। তখন আছমিনা বেগম তা বাবার বাড়িতে রেখে আসার কথা জানান। এতে সাহেদ আহমদ ক্ষুব্ধ হয়ে ঘরে থাকা আছমিনা বেগমের সব কাপড় চোপড় জড়ো করে আগুন ধরিয়ে দেন। আছমিনা বেগম বাধা দিতে গেলে তাঁকে শারীরিকভাবে আঘাত করে আগুনের মধ্যে চেপে ধরে রাখেন। এতে আছমিনা বেগমের শরীরের বেশির ভাগ অংশই ঝলসে যায়। এরপর মুমূর্ষু অবস্থায় আছমিনা বেগমকে বড়লেখা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রেখে স্বামী সাহেদ আহমদ পালিয়ে যায়। 

জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে খবর পেয়ে আছমিনা বেগমের বাবা-মা ও বোন বড়লেখা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে দেখতে পান। ওই দিনই চিকিৎসকের পরামর্শে আছমিনাকে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করা হয়। সেখানে পাঁচ দিন চিকিৎসা দিয়ে গুরুতর অগ্নিদগ্ধ অবস্থাতেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আছমিনা বেগমকে ছাড়পত্র দিয়ে দেয়। এরপর থেকে মুমূর্ষু অবস্থায় তিনি বাবার বাড়ি রয়েছেন। দরিদ্র পিতার পক্ষে মেয়ের উন্নত চিকিৎসা করানো সম্ভব হচ্ছিল না। 

এদিকে গত সোমবার (১০ জুন) স্থানীয়ভাবে খবর পেয়ে বড়লেখা থানা পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ও নির্যাতিতা গৃহবধূর বাবার বাড়ির লোকজনের সাথে যোগাযোগ করে। এ সময় পুলিশ ওই গৃহবধূকে আইনি সহযোগিতার আশ্বাস দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত মঙ্গলবার (১১ জুন) আছমিনার বাবা বাদী হয়ে আছমিনার স্বামী ও শাশুড়িকে আসামি করে মামলা করেছেন। এই অবস্থায় বড়লেখা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইয়াছিনুল হক আছমিনা বেগমকে ঢাকায় পাঠিয়ে উন্নত চিকিৎসা করানোর উদ্যোগ নেন। সে লক্ষ্যে বুধবার রাতে আছমিনাকে অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় পাঠানো হয়। বড়লেখা উপজেলা চেয়ারম্যান সোয়েব আহমদও এতে সার্বিক সহযোগিতা করেন।

বড়লেখা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইয়াছিনুল হক বৃহস্পতিবার (১৩ জুন) বলেন, নিজ উদ্যোগে উন্নত চিকিৎসার জন্য গৃহবধূকে ঢাকা মেডিক্যালে পাঠিয়েছি। উপজেলা চেয়ারম্যান সোয়েব আহমদও সার্বিক সহযোগিতা করেছেন। ঢাকায় চিকিৎসা শুরু হয়েছে। ড্রেসিং করা হয়েছে। সব সময় খোঁজ নিচ্ছি। চিকিৎসক ও গৃহবধূর সাথেও কথা হয়েছে। গৃহবধূর শাশুড়িকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। স্বামী পলাতক রয়েছে। তাকে গ্রেপ্তারের জন্য বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হয়েছে।

ওসি আরো জানান, ওরা তো গরিব মানুষ। ঠিকমতো যোগাযোগ করেনি। ঘটনা জানার পর এদের ডেকে এনে মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। ওদের অবস্থা খুবই খারাপ। আশ্রায়ন প্রকল্পে থাকে। সে জন্য নিজে ওকে ঢাকায় পাঠানোর উদ্যোগ নিই। ওর চিকিৎসা আমরাই করাব।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা