kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

‘লক্ষ্মীনারায়ণ কটন মিলে এক যুগে ৭২ কোটি টাকা লুটপাট’

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি   

১৩ জুন, ২০১৯ ০৩:২১ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



‘লক্ষ্মীনারায়ণ কটন মিলে এক যুগে ৭২ কোটি টাকা লুটপাট’

ছবি: কালের কণ্ঠ

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১০নং ওয়ার্ডের সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইলে অবস্থিত বেসরকারি করণকৃত নিউ লক্ষ্মীনারায়ণ কটন মিলটিতে এক যুগে ৭২ কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া মিলটির শত কোটি টাকা মূল্যের সম্পদ লুটপাটের পাশাপাশি ৭০০ কোটি টাকা মূল্যের মিলটি মাত্র ৩৫ কোটি টাকায় বিক্রির পাঁয়তারা চলছে। শেয়ার হস্তান্তর না করায় মিলটির আন্দোলনরত ৫৩ জন শেয়ার হোল্ডার পরিবারকে উচ্ছেদের চেষ্টা করছে প্রভাবশালী নিট কনসার্ন গ্রুপের ক্যাডার বাহিনী। 

অবৈধভাবে মিলটির পরিচালনা পরিষদের চেয়ারম্যান বনে গেছে নিট কনসার্ন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জয়নাল আবেদীন মোল্লা। অথচ হাইকোর্টের নির্দেশে মিলটির চেয়ারম্যান রয়েছেন জেলা প্রশাসক। আন্দোলনরত শেয়ার হোল্ডারদের উচ্ছেদের চেষ্টা করা হলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেওয়ার পাশাপাশি অবৈধ চেয়ারম্যান দাবিদার জয়নাল আবেদীন মোল্লাকে গ্রেপ্তারের দাবি জানানো হয়েছে।

বুধবার ১২ জুন দুপুরে আন্দোলনরত শেয়ার হোল্ডারদের আবারো উচ্ছেদের চক্রান্তের প্রতিবাদে নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সামনে আয়োজিত মানববন্ধন থেকে এ দাবি ও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়।

নিউ লক্ষ্মীনারায়ণ কটন মিল শেয়ারহোল্ডার স্বার্থরক্ষা সংগ্রাম কমিটির আহবায়ক জাহাঙ্গীর হোসেনের সভাপতিত্বে মানববন্ধনে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন জাতীয় শ্রমিকলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির শ্রমিক উন্নয়ন ও কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক কাউসার আহাম্মেদ পলাশ, ৭৪ শ্রমিক সংগঠনের নেতা এস এম হুমায়ন কবির। আরো বক্তব্য রাখেন নিউ লক্ষ্মীনারায়ণ কটন মিল শেয়ার হোল্ডার স্বার্থরক্ষা সংগ্রাম কমিটির সাবেক আহবায়ক মোহাম্মদ হোসেন, মুক্তিযোদ্ধা বিজয় চন্দ্র সরকার, মোহাম্মদ আইয়ুব আলী, অনিল চক্রবর্তী, নিধু কমল দে, রবি দাস, তামলেক মিয়া, আরমান মিয়া প্রমুখ। 

নিউ লক্ষ্মীনারায়ণ কটন মিল শেয়ার হোল্ডার স্বার্থরক্ষা সংগ্রাম কমিটির সাবেক আহবায়ক মোহাম্মদ হোসেন বলেন, নিউ লক্ষ্মীনারায়ণ কটন মিলটি একটি ঐতিহ্যবাহী লাভজনক প্রতিষ্ঠান ছিল। ২০০১ সালে ২১ মার্চ ৫১০ জন শেয়ার হোল্ডারদের মালিক বানিয়ে মিলটি হস্তান্তর করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার। ২০০১ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত মিলটিতে প্রতি মাসে ৫০ লাখ টাকা আয় হিসেবে ১২ বছরে কমপক্ষে ৭২ কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে। আমরা হিসাব চাইতে গেলে পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান শামসুদ্দিন প্রধানের নেতৃত্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ তাদের ক্যাডার বাহিনী দিয়ে আমাদের হুমকি-ধমকি দিতো।

এরপর মিলটির একজন বিনিয়োগকারী নিয়োগের কথা বলে প্রতারণার মাধ্যমে ৩৮২ জনের শেয়ার হাতিয়ে নিয়ে নিট কনসার্ন গ্রুপের কাছে হস্তান্তর করে। মিলটির মেশিনারীজ লুটপাটের মাধ্যমেও কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। হাইকোর্টের নির্দেশে জেলা প্রশাসক বর্তমানে চেয়ারম্যান হিসেবে থাকলেও পেশীশক্তির মাধ্যমে নিট কনসার্ন গ্রুপের মালিক জয়নাল আবেদীন মোল্লা নিজেকে চেয়ারম্যান দাবি করে আমাদের উচ্ছেদের নোটিশ ও হুমকি দিচ্ছে। আমাদেরকে ১৫ জুনের মধ্যে উচ্ছেদ করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছে তাদের ক্যাডার বাহিনী।

শেয়ার হোল্ডাররা তাদের বক্তব্যে বলেন, বর্তমানে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে নিরীহ শেয়ার হোল্ডারদের হয়রানি করা হচ্ছে। মসজিদের মাইকে উচ্ছেদের হুমকি দিচ্ছে। আমরা জীবন দিলেও শেয়ার হস্তান্তর করবো না।

জাতীয় শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির শ্রমিক উন্নয়ন ও কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক কাউসার আহাম্মেদ পলাশ বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশে মিলটির চেয়ারম্যান ডিসি অথচ শত কোটি টাকা লুটপাটের পরে এখন আবার রাতের আধারে চেয়ারম্যান দাবি করছে নিট কনসার্ন গ্রুপের মালিক জয়নাল আবেদীন মোল্লা। পেছনের দরজা দিয়ে রাতের আধারের কোন এজিএম শ্রমিকরা মানবে না। তারা ডাকাতের মতো ১৫ জুন শেয়ার হোল্ডারদের উচ্ছেদ করার হুমকি দিচ্ছে। আমরা পরিস্কার ভাষায় বলতে চাই ডাকাতের মতো শ্রমিকদের উচ্ছেদের হুমকি দিবেন সেটা বরদাশত করা হবে না। 

শেয়ার হোল্ডারদের উচ্ছেদ করার মতো হুমকি দেন এত বড় সাহস তাকে কে দিল। যদি একজন শেয়ার হোল্ডারের গায়ে একটা আচরও পড়ে তাহলে রাজপথে আগুন জ্বলবে। শেয়ার হোল্ডারদের পক্ষে শ্রমিক লীগসহ ৭৪টি শ্রমিক সংগঠন সকলেই আন্দোলনে নামবে। তখন যেকোনো পরিস্থিতির দায় দায়িত্ব জয়নাল আবেদীন মোল্লাকেই নিতে হবে। আমরা অবিলম্বে জয়নাল আবেদীন মোল্লার গ্রেপ্তার দাবি করছে। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, পালিত কুকুর বেড়াল দিয়ে শ্রমিকদের আন্দোলন বন্ধ করা যাবে না। আপনারা শেয়ার হোল্ডারদের ওপর নির্যাতন করবেন আর আমরা লেবেনচুষ খাবো সেটা ভাববেন না আমরা দাঁতভাঙ্গা জবাব দেব। শেয়ার হোল্ডারদের পক্ষে লাখো শ্রমিক রাজপথ প্রকম্পিত করবে।

উল্লেখ্য, শেয়ার হোল্ডারের রিট পিটিশন অনুযায়ী ২০১৫ সালের ২১ জানুয়ারি হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চের জাস্টিস মো. রেজাউল হাসান নির্বাচন দেওয়ার আদেশ দেন। নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত নিরপেক্ষ হিসেবে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসককে নিউ লক্ষ্মীনারায়ণ কটন মিলের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান পদে ও শেয়ার হোল্ডারদের সরাসরি ভোটে পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক পদে নির্বাচনের নির্দেশ দিয়েছেন। যে কারণে হাইকোর্টের আদেশে অদ্যাবধি মিলটির চেয়ারম্যান পদে রয়েছে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক।

তবে গত ১৬ মে মিলটির প্রবেশ ফটক সংলগ্ন দেয়ালে একটি নোটিশ সাঁটানো হয়েছে যাতে চেয়ারম্যান হিসেবে উল্লেখ করা হয় নিট কনসার্ন গ্রুপের জয়নাল আবেদীন মোল্লাকে। ওই নোটিশে আমাদেরকে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেওয়া হয়। কিন্তু আমরা কেউই নোটিশে কোন ধরনের কর্নপাত না করায় গত ১৯ মে মাইকিং করা হয় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আমাদেরকে শেয়ার জমা দিতে হবে। সর্বশেষ পবিত্র ঈদুল ফিতরের কয়েকদিন আগে মাইকিং করে ১৫ জুনের পরে শেয়ার হোল্ডারদেরকে উচ্ছেদের হুমকি দেয়।

মন্তব্য