kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

৯ দিন ধরে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন

আগুন দিয়ে স্ত্রীর শরীর ঝলসে দিল পাষণ্ড স্বামী

বড়লেখা (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি   

১২ জুন, ২০১৯ ২৩:২২ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আগুন দিয়ে স্ত্রীর শরীর ঝলসে দিল পাষণ্ড স্বামী

আছমিনা বেগম। ছবি: কালের কণ্ঠ

আছমিনা বেগম (২৫)। স্বামীর সঙ্গে তিন বছরের সংসার জীবন। তাদের এ সংসারে এক ছেলে সন্তান রয়েছে। তিন বছরের এই সংসার জীবনে একবারও সুখের মুখ দেখা হয়নি আছমিনার। তিন বছর আগে দরিদ্র বাবার সংসার ছেড়ে স্বামীর ঘরে যাবার সময় আছমিনার দুই চোখ জুড়ে ছিল সুখের স্বপ্ন। কিন্তু আছমিনার সেই স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেল। তিন বছরের সংসারে স্বামী সাহেদ আহমদের কাছ থেকে ভালোবাসার বদলে পেয়েছেন নির্যাতন। সর্বশেষ স্বর্ণালংকার না পেয়ে পাষণ্ড স্বামী নির্মমভাবে তাঁর শরীর আগুনে ঝলসে দিয়েছে।

মঙ্গলবার (৪ জুন) ভোর রাতে মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার সদর ইউনিয়নের মুছেগুল গ্রামে ঘটনাটি ঘটেছে। নির্যাতনের শিকার ওই নারী একই ইউনিয়নের জফরপুর গ্রামের ছমির উদ্দিনের মেয়ে। অভিযুক্ত স্বামী সাহেদ আহমদ মুছেগুল গ্রামের আনু মিয়ার ছেলে। এ ঘটনায় গতকাল মঙ্গলবার ওই নারীর বাবা বাদী হয়ে বড়লেখা থানায় মামলা করেছেন।

এদিকে আগুনে ঝলসে আছমিনার শরীরের অন্তত ৬০ ভাগ পুড়ে গেছে। পাঁচদিন চিকিৎসা দিয়ে ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দিয়ে বাড়ি পাঠানো হয়েছে মুমূর্ষু এই রোগীকে। এই পোড়া শরীর নিয়ে ৯ দিন ধরে অস্য যন্ত্রণায় মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। দরিদ্র বাবার পক্ষে আছমিনার চিকিৎসা করানোও অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তাঁর উন্নত চিকিৎসা দরকার। এ অবস্থায় আজ বুধবার হতদরিদ্র পরিবারের মেয়ে আছমিনাকে ঢাকায় ভালো চিকিৎসা করানোর উদ্যোগ নিয়েছেন বড়লেখা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)। এক্ষেত্রে স্থানীয় উপজেলা চেয়ারম্যানসহ জনপ্রতিনিধিরাও এগিয়ে এসেছেন।

মামলা ও নির্যাতিতার পরিবার সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার সদর ইউনিয়নের জফরপুর গ্রামের হতদরিদ্র ছমির উদ্দিন ৩ বছর পূর্বে মূছেগুল গ্রামের আনু মিয়ার ছেলে সাহেদ আহমদের সঙ্গে মেয়ে আছমিনা বেগমের বিয়ে দেন। তাদের ২ বছরের একটি ছেলে রয়েছে। বিয়ের পর থেকে প্রায়ই স্বামীর মারধরের শিকার হতেন আছমিনা। সংসার ধরে রাখার চেষ্টায় মুখ বুজে সব সহ্য করতেন। কিন্তু বন্ধ হয়নি নির্যাতন। ঘটনার কয়েকদিন আগে আছমিনার কানের স্বর্ণের অলংকার বিক্রি করার চেষ্টা করেন স্বামী সাহেদ। বিষয়টি বুঝতে পেরে আছমিনা ওগুলো বাবার বাড়িতে গিয়ে সেখানে রেখে আসেন। 

ঘটনার ভোররাতে আছমিনার কাছে স্বর্ণের অলংকার চায় সাহেদ। তখন আছমিনা বাবার বাড়িতে রেখে আসার কথা জানায়। এতে সাহেদ ক্ষুব্ধ হয়ে ঘরে থাকা আছমিনার সব কাপড় চোপড় জড়ো করে আগুন ধরিয়ে দেয়। আছমিনা বাধা দিতে গেলে শারীরিকভাবে আঘাত করে আগুনের মধ্যে চেপে ধরে রাখে। এতে আছমিনা বেগমের শরীরের বেশিরভাগ অংশই ঝলসে যায়। এরপর মুমূর্ষু অবস্থায় আছমিনাকে বড়লেখা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রেখে পাষণ্ড স্বামী সাহেদ আহমদ পালিয়ে যায়। জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে খবর পেয়ে আছমিনার বাবা-মা ও বোন বড়লেখা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে মুমূর্ষু আছমিনাকে দেখতে পান। 

এ সময় চিকিৎসকরা আছমিনাকে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করেন। ওইদিন মঙ্গলবার (৪ জুন) দুপুরে আছমিনাকে ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ৫ দিন চিকিৎসা দিয়ে গুরুতর অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আছমিনা বেগমকে ছাড়পত্র দিয়ে দেয়। বর্তমানে সে মুমূর্ষু অবস্থায় তাঁর বাবার বাড়ি রয়েছে।

অন্যদিকে গত সোমবার স্থানীয়ভাবে খবর পেয়ে বড়লেখা থানা পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ও নির্যাতিতা নারীর বাবার বাড়ির লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে। এ সময় পুলিশ নির্যাতিতাকে আইনি সহযোগিতার আশ্বাস দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল মঙ্গলবার আছমিনার বাবা বাদী হয়ে আছমিনার স্বামী ও শ্বাশুড়িকে আসামি করে মামলা করেন। 

মামলার বাদী ও আছমিনা বাবা ছমির উদ্দিন আজ বুধবার বিকেলে বলেন, ‘মাত্র পাঁচ দিন চিকিৎসা দিয়ে গুরুতর অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় ওসমানী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আমার মেয়েকে হাসপাতাল থেকে রিলিজ দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। আমি গরিব মানুষ। মেয়েকে যে চিকিৎসা করাবো। এই সামর্থ্য নেই। বাড়িতে কষ্ট করছিল। মেয়ের উন্নত চিকিৎসা দরকার। উপজেলা চেয়ারম্যান সাহেব ও পুলিশের সহযোগিতায় রাতে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হবে।’ 

বড়লেখা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইয়াছিনুল হক বুধবার বিকেলে বলেন, ‘ঘটনাটি অত্যন্ত অমানবিক। স্থানীয়ভাবে খবর পেয়েই একজন উপ-পরিদর্শককে (এসআই) ঘটনাস্থলে পাঠাই। নির্যাতিতার পরিবারকে মামলা দিতে বলি। পরে তার বাবা বাদী হয়ে দুজনের নামে এজাহার দিয়েছেন। এজাহারভুক্ত দুই আসামিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। মেয়েটির দ্রুত ভালো চিকিৎসা করানো দরকার। গরিব পরিবার। তাই আমি নিজেই ঢাকা পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছি। স্থানীয় উপজেলা চেয়ারম্যান মহোদয়ও সহযোগিতা করছেন।’

মন্তব্য