kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৭ জুন ২০১৯। ১৩ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

আইলার ১০ বছর

আজও পুনর্বাসিত হয়নি হাজারো পরিবার সংস্কারহীন বেড়িবাঁধ

গৌরাঙ্গ নন্দী (খুলনা) ও মোশাররফ হোসেন (সাতক্ষীরা)   

২৫ মে, ২০১৯ ০০:০৩ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আজও পুনর্বাসিত হয়নি হাজারো পরিবার সংস্কারহীন বেড়িবাঁধ

ফাইল ছবি

আইলার আঘাতে কয়রার কপোতাক্ষ পারের নড়বড়ে বাঁধটি ভেঙে যায়। ঝড়ের গতির সঙ্গে তীব্র জোয়ারে ধেয়ে আসা পানিতে ভেসে যায় গ্রাম। বাঁধসংলগ্ন ঘাটাখালী গ্রামের আবু তৈয়ব ছেলে-মেয়েকে নিয়ে কয়রা সদরের রাস্তার ওপর গিয়ে ওঠেন। মাস ছয়েক পর বাঁধ বাঁধা হলে আবারও এসে ঘর বাঁধেন। কিন্তু নদী ও বাঁধের ভাঙন আর থামে না। বর্তমানে মাত্র কাঠা দেড়েক জমির ওপর থাকার ঘরটিই তাঁর একমাত্র সম্বল। তৈয়ব বলেন, ‘এবার ভাঙলি কোথায় যাব, তা জানি না। এখন আর সরার জায়গা নেই।’ 

২০০৯ সালের ২৫ মে খুলনা-সাতক্ষীরা উপকূলের দাকোপ, কয়রা, শ্যামনগর ও আশাশুনিতে ঘূর্ণিঝড় আইলা আঘাত হানে। আজ সেই ভয়াল দিনের ১০ বছর পূর্ণ হলো। এত বছর পেরিয়ে গেলেও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলজুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত আইলাকবলিত হাজার হাজার পরিবার এখনো পুনর্বাসিত হয়নি। আশ্রয়হীন জনপদে এখনো চলছে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও খাবার পানির জন্য তীব্র হাহাকার। সর্বগ্রাসী আইলা আজও উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষকে কুরে কুরে খাচ্ছে। 

খুলনার কয়রায় ওই ঘূর্ণিঝড়ে সবচেয়ে ক্ষতি হয়েছিল নদীতীরের বাঁধের। চিংড়ি চাষের কারণে বাঁধ যথেচ্ছভাবে কাটাছেঁড়া করায় আগে থেকেই তা দুর্বল ছিল। ঘূর্ণিঝড় আইলায় সৃষ্ট জোয়ারের ধাক্কায় সেই বাঁধে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দেয়। শুরু হয় তীব্র নদীভাঙন। বাঁধের বাইরে নদী পারে আজ আর কোথাও জমি নেই। এ কারণে জোয়ারের চাপ সরাসরি বাঁধের ওপর পড়ে বাঁধ ভেঙে যায়। নিজেদের ঘরবাড়ি হারিয়ে অনেকেই বেড়িবাঁধের কিনারায় আশ্রয় নিয়েছে। কয়রা উপজেলার দুই শতাধিক পরিবার এখনো বাঁধের ওপর বাস করছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার ঘাটাখালীতে ৫০টির মতো পরিবার সব সময় নদী আর বাঁধ ভাঙার আতঙ্কে আছে। তাদের সবারই বাস বাঁধের পাশে বা ওপরে। পাথরখালী এলাকায় বেড়িবাঁধের ওপর আছে ঘর হারানো ২২টি পরিবার। কয়রা সদরের গোবরা সোনাপাড়ায় বাঁধের ওপর আছে ৫০টি পরিবার। সুতির অফিস এলাকা থেকে মঠবাড়িয়া বেড়িবাঁধের ওপর সারি সারি বাস্তুহারা মানুষের বাস। এ ছাড়া ৪ নম্বর কয়রা লঞ্চঘাট এলাকা, ৬ নম্বর কয়রা, দক্ষিণ বেদকাশি, মহেশ্বরীপুরসহ গোটা উপজেলায় বাঁধের ওপর বাস করছে দুই শতাধিক পরিবার। 

আইলার আঘাতে কয়রায় পাউবোর (পানি উন্নয়ন বোর্ড) বেড়িবাঁধের ২৭টি পয়েন্ট ভেঙে যায়। নোনা পানির তোড়ে হারিয়ে যায় ২৬ প্রাণ। স্বজন হারানোরা আজও সেই দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে বেড়িবাঁধেই বাস করছে। দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে কয়রার ২৫ কিলোমিটারের মতো বেড়িবাঁধ খুবই ঝুঁকির মধ্যে আছে। এসব বেড়িবাঁধের উপরিভাগে কোথাও কোথাও মাত্র দেড়-দুই হাত মাটি অবশিষ্ট রয়েছে। অবস্থা এতটাই খারাপ যে বাঁধের অনেক জায়গা দিয়ে চুইয়ে চুইয়ে পানি প্রবেশ করছে।

উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের আংটিহারা, খাসিটানা, জোড়শিং, মাটিয়াভাঙ্গা; উত্তর বেদকাশি ইউনিয়নের গাতিরঘেরি, গাববুনিয়া, গাজীপাড়া, কাটকাটা; কয়রা সদর ইউনিয়নের ৬ নম্বর কয়রা, ৪ নম্বর কয়রার পুরনো লঞ্চঘাটসংলগ্ন এলাকা, মদিনাবাদ লঞ্চঘাট, ঘাটাখালী, হরিণখোলা; মহারাজপুর ইউনিয়নের উত্তর মঠবাড়ী, দশালিয়া, লোকা; মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের কালীবাড়ি, নয়ানি, শেখেরটেক এলাকার বাঁধ ভাঙনের মুখে। এসব বাঁধ দ্রুত সংস্কার করা না হলে আবারও ভেঙে গোটা উপজেলা নোনা পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। 

গত ২০ মে স্থানীয় কয়রাবাসী নাগরিকদের সংগঠন জলবায়ু পরিষদের উদ্যোগে অবিলম্বে বাঁধ বাঁধার দাবিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। 

খুলনা-৬ আসনের (পাইকগাছা-কয়রা) সংসদ সদস্য আখতারুজ্জামান বাবু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যথেষ্ট বরাদ্দ থাকলেও বেড়িবাঁধ বাঁধার দায়িত্ব যাদের ছিল, তারা তা যথাযথভাবে পালন করেনি। এ কারণে বাঁধগুলো আবারও ভেঙে যাওয়ার মুখে।’ 

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা, পদ্মপুকুর ও আশাশুনির প্রতাপনগর এলাকায়ও দেখা গেছে একই চিত্র। আইলায় স্বাভাবিকের চেয়ে ১৪-১৫ ফুট উচ্চতায় সমুদ্রের পানি এসে নিমেষেই ভাসিয়ে নিয়ে যায় এসব এলাকার নারী-শিশুসহ কয়েক হাজার মানুষ, হাজার হাজার গবাদি পশু আর ঘরবাড়ি। মুহূর্তে গৃহহীন হয়ে পড়ে হাজারো পরিবার। লাখ লাখ হেক্টর চিংড়ি আর ফসলের ক্ষেত তলিয়ে যায়। এ ১০ বছরেও থামেনি সেখানকার মানুষের হাহাকার। 

এক মুঠো ভাতের জন্য জীবনের সঙ্গে রীতিমতো লড়াই করতে হচ্ছে তাদের। আইলার পর থেকে এসব এলাকায় সুপেয় পানি সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। খাবার পানির জন্য ছুটতে হচ্ছে মাইলের পর মাইল। আইলাকবলিত এ অঞ্চলের রাস্তাঘাট ও বেড়িবাঁধ এখনো ঠিকমতো সংস্কার করা হয়নি। ফলে উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত সবাই চালাচ্ছে বেঁচে থাকার সংগ্রাম। আইলার আঘাতের পর থেকে গাবুরা ও পদ্মপুকুর এলাকা উদ্ভিদশূন্য হয়ে পড়ে। ফলে কৃষি ফসল ও চিংড়ি উত্পাদন বন্ধ থাকায় গোটা এলাকায় তীব্র কর্মসংস্থানের সংকট দেখা দিয়েছে। কর্মহীন মানুষ অনেকেই এলাকা ছেড়ে কাজের সন্ধানে বাইরে চলে গেছে।

অন্যদিকে বনদস্যুদের অত্যাচারে সুন্দরবন, কপোতাক্ষ ও খোলপেটুয়া নদীর ওপর নির্ভরশীল এ এলাকার মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। বিকল্প তেমন কোনো কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না থাকায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারছে না উপকূলীয় এ জনপদের প্রায় ৮০ হাজার মানুষ। আইলার পরপরই সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে কাজের বিনিময়ে খাদ্য প্রকল্পের আওতায় কিছু কাজ হলেও এখন আর তেমন কোনো কাজ হচ্ছে না। 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা