kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

মজুরি খেটেও তুহিন ও শান্ত'র জিপিএ-৫

পঞ্চগড় প্রতিনিধি    

২৪ মে, ২০১৯ ১৯:৫১ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



মজুরি খেটেও তুহিন ও শান্ত'র জিপিএ-৫

জিপিও-৫ পাওয়া তুহিন ও শান্ত। ছবি : কালের কণ্ঠ

সংসারে নিত্য অভাব অনটন। খেয়ে না খেয়ে কাটে দিন। সংসারের ঘানি টানতে কখনও পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে মজুরির কাজও করতে হয়। তারপরও লেখাপড়া থেকে সরে আসেনি পঞ্চগড়ের তুহিন প্রামানিক ও শান্ত রায়।

লেখাপড়ার প্রতিটি ধাপে আলো ছড়িয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে এই দুই শিক্ষার্থী। সম্প্রতি প্রকাশিত এসএসসি পরীক্ষার ফলে জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে এই দুই মেধাবী। তাদের এই ধারাবাহিক সাফল্যে দরিদ্র বাবা মায়ের মুখে হাসি ফুটেছে। একইসঙ্গে উচ্চ শিক্ষা নিয়ে শঙ্কাও তৈরি হয়েছে তাদের মধ্যে। এই দুই অদম্যের স্বপ্ন দেশের সনামধন্য প্রতিষ্ঠানে পড়ে লেখাপড়া করা।

তুহিনের স্বপ্ন ডাক্তার হওয়া। আর শান্ত হতে চায় ইঞ্জিনিয়ার। তবে তাদের উচ্চ শিক্ষার পথে এখন প্রধান অন্তরায় অর্থনৈতিক দুরাবস্থা।

তুহিন
তুহিনের বাড়ি পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার সোনাহার মল্লিকাদহ ইউনিয়নের মাস্টারপাড়া গ্রামে। সে ওই গ্রামের রিকশাচালক হাবিবুর রহমান প্রামানিকের ছেলে। দুই ভাই এক বোনের মধ্যে তুহিন সবার বড়। বাবা হাবিবুর প্রামানিকের রিকশা  চালানোর আয়েই চলে তাদের সংসার।

সম্পদ বলতে কেবল ভিটেবাড়ি। তাই দারিদ্রের চাপ সামলাতে মা তাসলিমা প্রামানিককেও নামতে হয়েছে দিনমজুরের কাজে। আর মায়ের কষ্ট লাঘবে বিদ্যালয়ের ছুটির দিনে তুহিনকেও করতে হয় দিনমজুরের কাজ। বিদ্যালয়ের ছুটির দিনগুলো তুহিনের কাটতো দিন মজুরের কাজ করে। পরিবারের তিনজনের আয়ে কোনরকমে চলতো সংসারের চাকা।

জননী কিন্ডার গার্টেন থেকে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় জিপিএ-৫ ও গোবিন্দ আইডিয়াল মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে জেএসসিতে জিপিএ-৫ (সাধারণ) পেয়ে উত্তীর্ণ হয় তুহিন। এবারও একই প্রতিষ্ঠান থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ (সাধারণ) পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে সে।

পিইসি ও জেএসসিতে সাধারণ কোটায় বৃত্তি পায় তুহিন। এই বৃত্তির টাকা তাকে সাহস জুগিয়েছে অনেকটাই। খেয়ে না খেয়ে বাড়ি থেকে তিন কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে যাতায়াত করেছে বিদ্যালয়ে। এরপর নিজের লেখাপড়ার পাশপাশি ছোট ভাই নাঈম প্রামানিক এবং বোন হাবিবা জান্নাতেরও লেখাপড়া দেখভালের ভার বহন করতে হয়েছে তাকে।

ছোট ভাই নাঈম প্রমানিক চৌধুরীপাড়া হাফেজিয়া মাদ্রাসায় পড়ে। আর বোন হাবিবা গ্রামের বিষপানি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্রী।

তুহিনের স্বপ্ন ভাল মেডিক্যাল কলেজে পড়ে একজন চিকিৎসক হওয়া। মাধ্যমিকের গণ্ডি পার করলেও তার উচ্চ শিক্ষার পথে এখন অনেক বাধা। তিন ভাই-বোনের লেখাপড়ার খরচ চালানো তার পরিবারের পক্ষে অনেকটাই অসম্ভব। তাই ভালো  ফলের পরই দুশ্চিন্তায় কাটছে তার দিন।

তুহিন জানায়, স্কুলের স্যারেরা বিনা বেতনে পড়িয়েছেন। সহযোগিতা করেছেন বই খাতা দিয়ে। একসাথে তিন ভাই-বোনের লেখাপড়ার খরচ দেওয়া আমার পরিবারের পক্ষে অসম্ভব। তাই বিদ্যালয়ের ছুটির দিনগুলো আমি দিনমজুরের কাজ করতাম। আমি উচ্চ মাধ্যমিক পাশের পর মেডিক্যাল কলেজে পড়ে চিকিৎসক হতে চাই। কিন্তু উচ্চ মাধ্যমিকের খরচ কোথা থেকে পাবো সেটা নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় আছি।

তুহিনের বাবা হাবিবুর প্রামানিক বলেন, বাড়ির ভিটা ছাড়া অন্য কোনও সম্পদ নেই আমার। মহাজনের রিকশা চালিয়ে পরিবারের পাঁচ সদস্যের ঠিকমতো খাবার জুটাতে পারি না। এরপর তিন সন্তানের লেখাপড়ার খরচ বহন করা সম্ভব হয় না আমার পক্ষে। তাই সংসারের ঘাটতি আর সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে তুহিনের মাকে নামতে হয় কৃষি শ্রমিকের কাজে। স্কুল ছুটি হলে মায়ের সাথে তুহিনও কাজ করে। এখন ছেলেকে ভালো কলেজে পড়াতে অনেক টাকার প্রয়োজন। সে টাকা আমি কোথায় পাবো?

তুহিনের মা তাসলিমা খাতুন বলেন, পরীক্ষার সময়ও ছেলেকে ভালো খাওয়া দিতে পারিনি। পুরনো  কাপড় পরে গেছে স্কুলে। খেয়ে না খেয়ে ভালো ফল করলেও এখন কলেজে পড়ানোর সামর্থ্য নেই আমাদের।

শান্ত রায় 
শান্ত রায়ের বাড়ি দেবীগঞ্জ উপজেলার সোনাহার মল্লিকাদহ ইউনিয়নের প্রধানপাড়া গ্রামে। সে ওই এলাকার দিনমজুর সত্যেন্দ্রনাথের ছেলে। দুই ভাই এক বোন। শান্ত মেজ। বড় ভাই সবুজ রায় সোনাহার মহাবিদ্যালয়ে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ে আর ছোট বোন শান্তনা রাণী রায় সোনাহার প্রধানপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে।

পাঁচ বছর বয়সেই মাকে হারায় শান্ত। নানা প্রতিকূলতা আর দারিদ্র্যের মধ্যেও লেখাপড়ায় পিছিয়ে যায় এই তরুণ। লেখাপড়ার প্রত্যেকটি ধাপের ভালো ফল করে এগিয়ে যাচ্ছে। সে সোনাহার-২ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক সমাপনী পিইসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে এবং সোনাহার গোবিন্দ আইডিয়াল মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে জেএসসিতে জিপিএ-৫ (সাধারণ) পেয়ে উত্তীর্ণ হয়।

একই প্রতিষ্ঠান থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয় শান্ত। জেএসসিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পায় সে। বৃত্তির টাকা থেকে নিজের লেখাপড়ার খরচ বাদ দিয়ে ভাই বোনদের লেখাপড়ার খরচও দিত শান্ত। তিন ভাই-বোনের লেখাপড়া আর পাঁচ সদস্যের সংসারের খরচ জোগানো দিনমজুর সত্যেন্দ্রনাথের পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাই সাপ্তাহিক ছুটির দিন কিংবা দীর্ঘ সময়ের জন্য স্কুল ছুটি হলেই বাবার সাথে দিন মজুরের কাজ করতে হয় শান্ত ও তার বড় ভাইকে। তাদের সম্মিলিত মজুরির আয়ে কোনমতে চলতো টানাপড়েনের সংসার।

ছেলের প্রতিটি পরীক্ষার ভালো ফল দিনমজুর বাবা মায়ের মনে আনন্দ সৃষ্টি করলেও তার উচ্চ শিক্ষার কথা চিন্তা করতেই মুখ ফ্যাকাশে হয়ে আসে। শান্ত উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে বুয়েটে পড়ে ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়। তবে তার সেই স্বপ্ন পূরণে পথে অনেক বাধা। সবচেয়ে বড় বাধা অর্থনৈতিক দৈন্যতা।

শান্ত রায় বলে, আমাদের অভাবের সংসার। তবে সব সময় আমি চেয়েছি যেভাবেই হোক লেখাপড়া চালিয়ে যাবো। আমার ভালো ফলের জন্য আমার প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের অনেক অবদান রয়েছে। তাঁরা আমাদের বিনা পয়সায় পড়াতেন। বই খাতা কিনে দিতেন। আমার স্বপ্ন আমি একজন ইঞ্জিনিয়ার হবো। তবে উচ্চ মাধ্যমিকে ভালো কলেজে পড়তে টাকার জোগান কোথা থেকে হবে ভেবে পাচ্ছি না। আমাদের তিন ভাই-বোনের লেখাপড়ার খরচ ও সংসারের খরচ চালাতে আমার বাবা হিমশিম খাচ্ছেন। 

শান্ত'র বাবা সত্যেন্দ্রনাথ বলেন, ছেলেটি খুব কষ্ট করে লেখাপড়া করে যাচ্ছে। ঠিকমতো লেখাপড়ার খরচ দিতে পারি না তারপরও সে প্রত্যেক পরীক্ষায় ভালো  ফল করেছে। এবার এসএসসি পরীক্ষায়ও গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে। ছেলের ভালো ফলাফল এখন আমাদের কাছে আনন্দের পাশাপাশি দুঃশ্চিন্তার সৃষ্টি করছে। কলেজে পড়ার খরচ কোথায় পাবো? তিন ছেলে-মেয়ের লেখাপড়া করানো আমার মতো দিনমজুরের পক্ষে অসম্ভব হয়ে উঠেছে।

সোনাহার গোবিন্দ আইডিয়াল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গোবিন্দ চন্দ্র রায় বলেন, এবার দিনাজপুর বোর্ডের অধীনে আমার বিদ্যালয় থেকে মোট ২৭ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। সবাই বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী। এদের প্রত্যেকে ভালো ফল করেছে। ২৭ জনের মধ্যে শান্ত রায়, তুহিন প্রামানিক, আল আমিন, লিপন ইসলাম এই চারজন জিপিএ-৫ পেয়েছে। তুহিন ও শান্ত'র পরিবার খুবই দরিদ্র।

গোবিন্দ রায় আরো বলেন, এই দুই ছাত্রকে সংসারের খরচ চালাতে কখনও দিনমজুরের কাজও করতে হয়েছে। আমরা তাদের বিনা বেতনে পড়িয়েছি। কিন্তু এখন তারা কলেজে পড়বে সেই খরচ কোথা থেকে পাবে ভেবে পাচ্ছে না। সমাজের বিত্তবানরা এমন মেধাবীদের পাশে দাঁড়ালে তারা তাদের জ্ঞান চর্চাটা চালিয়ে যেতে পারে। তাদের যে মেধা আমি মনে করি তারা খুব ভালো করবে।  

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা