kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৭ জুন ২০১৯। ১৩ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

১৪-৩০, এমনকি দুই বাচ্চার মা-ও আত্মহত্যা করে বসছেন, গ্রামে গ্রামে বাড়ছে প্রবণতা

বিরামপুরে গত ৫ মাসে প্রায় ৫৮ জন বিষপানে ও ৯ জন গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা চালায়

মো.মাহাবুর রহমান, বিরামপুর (দিনাজপুর) প্রতিনিধি   

২৪ মে, ২০১৯ ১৫:৪৮ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



১৪-৩০, এমনকি দুই বাচ্চার মা-ও আত্মহত্যা করে বসছেন, গ্রামে গ্রামে বাড়ছে প্রবণতা

দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার গ্রামাঞ্চলগুলোতে বিভিন্ন কারণে আত্মহত্যার প্রবণতা দিন দিন অস্বাভাবিক হারে বেড়েই চলেছে। এ যুগের তরুণ-তরুণীদের মধ্যে এমন প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। বিগত ৫ মাসে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে প্রায় অর্ধশতাধিক আত্মহত্যা চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে।

সমাজ বিশ্লেষক ও মনোবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, যখন কারো জ্ঞান-বুদ্ধি, বিবেক ও অনুধাবন শক্তি লোপ পায় এবং নিজেকে অসহায় মনে করে, ঠিক তখনই সব ভুলে মানুষ আত্মহত্যা করে বসে। প্রচণ্ড মনস্তাত্ত্বিক চাপও আত্মহত্যার পেছনে কাজ করে। আবার জাগতিক দুঃখ-কষ্ট, লাঞ্ছনা ও অপমান থেকে আত্মরক্ষা করতে দুর্বল চিত্তের মানুষরা আত্মহননের মধ্য দিয়ে মুক্তির পথ খুঁজে নেন।

এলাকার সচেতন মহল বলছে,পারিবারিক কলহ, অতিরিক্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষা, মাদকের মরণ নেশা, স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া, প্রেমে ব্যর্থতা, ঋণের টাকা পরিশোধ করতে না পারা, পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া, ইভটিজিংয়ের শিকার, পরকিয়া প্রেম ও দূরারোগ্য ব্যাধিসহ ছোটখাটো বিষয়ে আবেগতাড়িত হয়ে অনেকে আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছেন। নারীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার তুলনামূলক বেশি। এ পেছনে রয়েছে নির্যাতন, যৌতুক, সম্ভ্রমহানি, অবমাননা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা না থাকা ও আর্থ-সামাজিক অবস্থার অবক্ষয়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ১৪ বছর থেকে শুরু করে ৩০ বছর বয়সী, এমনকি ২-৩ সন্তানের জননীরা পর্যন্ত মান-অভিমান করে আত্মহত্যা করে বসছেন। এদের কেউ কেউ বেঁচে যাচ্ছেন। তবে দৈহিক ও মানসিকভাবে মারাত্মক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। উঠতি বয়সী ছেলেমেয়েরাও এ প্রবণতা দেখাতে পিছিয়ে নেই। কেউ আত্মহত্যা করছেন বা চেষ্টা চালাচ্ছেন কীটনাশক সেবন করে, কেউ নেশাজাতীয় অতিরিক্ত ট্যাবলেট খেয়ে, কেউ বা ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে, আবার বিষাক্ত ওষুধ পান করেও অনেকে দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছেন। এছাড়া গলায় ওড়না, শাড়ি ও রশি দিয়ে একলা ঘরে ঝুলে আত্মহত্যা করছেন নারী-পুরুষ। 

চলতি মে মাসে শুরুর দিকে উপজেলার সীমান্তঘেঁষা দক্ষিণ দাউদপুর গ্রামে পরপর তিন দিনে তিনজন আত্মহত্যার উদ্দেশ্যে বিষপান করেছিলেন। যদিও তিনজনই বেঁচে গেছেন। 

হাসপাতালে গিয়ে বেঁচে যাওয়া আবেদিন হোসেনের ছেলে  রনি বাবু (২৫) জানান, বাবা-মা আমাকে বিয়ে না দেয়ায় তাদের ওপর অভিমান করেই আমি বিষপান করেছিলাম। একই গ্রামের আব্দুল লতিফের ছেলে নুর আলম (২৭) জানান, পারিবারিক বিষয়ে আমার স্ত্রীর সাথে ঝগড়া করে বিষপান করেছিলাম।

বিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, গত ৫ মাসে প্রায় ৫৮ জন বিষপানে আক্রান্ত রোগী ও ৯ জন গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা চেষ্টায় অসুস্থ রোগীর নাম-পরিচয় পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে অনেক রোগীই মারা গেছেন। 

এ ব্যাপারে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, কিছু রোগী তাদের নিজ এলাকা থেকে মুমূর্ষ অবস্থায় নিয়ে আসার পথেই মারা যান। তারপরও নিশ্চিত হওয়ার জন্য হাসপাতালে নিয়ে আসেন স্বজনরা।

বিরামপুর থানা সূত্রে জানা যায়, ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত থানায় জিডিমূলে ৯টি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। তবে থানার ওসি (তদন্) সোহেল রানা জানান, অনেকেই আইনি জটিলতার ভয়ে ও লাশ মর্গে কাটাছেঁড়ার বিড়ম্বনা এড়াতে আত্মহত্যার খবরটি পুলিশকে দেন না। ফলে আত্মহত্যার সঠিক তথ্য রেকর্ড করা সম্ভব হয় না।

বিরামপুর সরকারি কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মুক্তারী বেগম জানান, বিষণ্ন ও চিন্তাগ্রস্ত রোগীদের মধ্যে এক ধরনের তীব্র হতাশা কাজ করে। আর তখন সে নিজের ও অন্যের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নেতিবাচক চিন্তা পোষণ করতে থাকে। ফলে তারা সবকিছুতেই  আশা হারিয়ে ফেলে। সে ভাবে, এ থেকে শত চেষ্টা করেও কোনো লাভ হবে না। এ থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় নিজেকে শেষ করে ফেলা। আর এ চিন্তায় তাড়িত হয়েই সে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।

বিরামপুর সার্কেলের সিনিয়র সহকারি পুলিশ সুপার মিথুন সরকার বলেন, মানসিক বিকারগ্রস্ততা থেকে অনেকেই আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। তাদের সাথে ভালো আচরণ করে ব্যক্তিগত কাউন্সেলিং ও কোনো সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব আত্মহত্যাপ্রবণ এলাকাতে জীবনের মূল্যবোধের ওপর উদ্বুদ্ধকরণ কর্মশালার মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান অনেকটাই সম্ভব।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা