kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

দুস্থ মাতাদের ৮০ বস্তা চাল কালোবাজারে বিক্রি!

আঞ্চলিক প্রতিনিধি, ময়মনসিংহ    

২৪ মে, ২০১৯ ০৮:১৬ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



দুস্থ মাতাদের ৮০ বস্তা চাল কালোবাজারে বিক্রি!

ময়মনসিংহের নান্দাইলের আচারগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ভেতর থেকে খাদ্য অধিদপ্তরের সিলমোহর করা ৮০ বস্তা ভিজিডির চালভর্তি দুটি ট্রলি জব্দ করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে ওই চাল জব্দ করেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহমুদা আক্তার। পরে ট্রলি ভর্তি চাল থানায় নেওয়া হলেও মামলা হয়নি। এ নিয়ে এলাকায় চলছে নানা সমালোচনা।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ওই ইউনিয়নের জন্য ভিজিডির বরাদ্দ কার্ড ২১১টি। গত বুধবার থেকে উপকারভোগীদের চাল দেওয়া শুরু হয়। জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসের বরাদ্দ ১২ কেজি করে। এই হিসাবে প্রত্যেককে চার বস্তা করে (প্রতি বস্তা ৩০ কেজি) চাল পাওয়ার কথা। এর মধ্যে গত বুধবার মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা ও টেগ অফিসারের (তদারকি কর্মকর্তা) উপস্থিতিতে ১০০ জনের মধ্যে চাল বিতরণ করা হয় বলে দাবি করেন মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা রাশিদা রহমান। তবে বৃহস্পতিবার চাল বিতরণ করা হবে না বলে টেগ অফিসারকে জানিয়েছেন ইউনিয়ন পরিষদের সচিব নজরুল ইসলাম। এ কথা কালের কাণ্ঠ’র কাছে স্বীকার করেছেন উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা রেজাউল করিম।

এর পরও কিভাবে পরিষদ থেকে চাল বিতরণের কর্মকাণ্ড চলছিল জানতে চাইলে টেগ অফিসার বলেন, এ ঘটনা তাঁর জানা নেই। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন উপকারভোগী জানান, তাঁর বাড়ি পরিষদের পাশে হওয়ায় চাল দেওয়ার ঘটনা জানতে পেরে আগেভাগেই পরিষদে গিয়ে হাজির হয়ে নিজের বরাদ্দের চাল নিয়ে নেন। এ সময় তিনি কয়েকজন ইউপি সদস্য ও সচিবের কথায় জানতে পেরেছেন আর কাউকে চাল দেওয়া হবে না। সব চাল বিক্রি করে দেওয়া হবে।

গতকাল সকাল সাড়ে ১১টায় ওই ইউপিতে গিয়ে দেখা যায় মো. আলম মিয়া নামে এক ক্রেতা একটি নছিমন ও একটি পাওয়ারট্রলিতে চালের বস্তা ভরছেন। চাল বিক্রির কাজ তদারকি করছিলেন ইউপি সদস্য মফিজ উদ্দিন ও এমদাদুল হক।

জানতে চাইলে চাল ক্রেতা আলম মিয়া দাবি করেন, চালের বস্তাগুলো তিনি ভিজিডি কার্ডধারী নারীদের কাছ থেকে কিনেছেন। কিন্তু ইউপিতে তখন কোনো ভিজিডি কার্ডধারী নারী উপস্থিত ছিলেন না। পরিষদের পাশের একটি কক্ষে ওয়ার্ল্ডভিশনের একটি ওয়ার্কশপ চলছিল। এ সময় পরিষদের হল রুমে চালের বস্তা স্তূপাকারে ছিল। সচিব ভেতরে থেকে দুজন গ্রাম পুলিশকে দাঁড় করিয়ে শ্রমিক দিয়ে স্তূপ থেকে চালের বস্তা বাইরে দাঁড় করানো ট্রলিতে তুলছিলেন। এ সময় বারান্দায় দাঁড়ানো ছিলেন দুই ইউপি সদস্য। তাঁরা পুরো কাজটি তদারকি করছিলেন।

গ্রাম পুলিশ বিমল ও আব্দুল কদ্দুস জানান, তাঁরা চালের বস্তা কক্ষের ভেতর থেকে বের করে দিয়েছেন। পরে শ্রমিকরা ট্রলিতে উঠিয়েছে।

জানতে চাইলে ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আচারগাঁও ইউনিয়নে ২১১ জন দুস্থ মাতাকে ভিজিডি কার্ড দেওয়া হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত চার মাসের বরাদ্দ ১২০ কেজি চাল (চার বস্তা) কার্ডধারী উপকারভোগীদের একসঙ্গে দেওয়া হয়েছে।’ তিনি দাবি করেন গত দুই দিনে ১৭৬টি কার্ডের বরাদ্দ বিতরণ করা হয়েছে। ৩৫টি কার্ডের বরাদ্দ ১৪০ বস্তা চাল পরিষদে রয়ে গেছে। তবে বস্তা গুনে দেখা যায় সেখানে ১৫৪ বস্তা চাল। কোনো কার্ডধারী নারী উপস্থিত নেই।

এ অবস্থায় ভিজিডির চাল কার কাছে বিতরণ করছেন জানতে চাইলে ইউপি সচিব কোনো জবাব দিতে পারেননি।

এ সময় ইউপি সদস্য মফিজ উদ্দিন ও এমদাদুল হক এসে এ প্রতিবেদককে ম্যানেজ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রশাসনের লোক আসছেন খবর পেয়েই তাঁরা দুজন সটকে পড়েন। পরে সহকারী কমিশনার মাহমুদা আক্তার এসে কালোবাজারে বিক্রির সময় চালের বস্তাগুলো জব্দ করে দুই গ্রাম পুলিশ দিয়ে থানায় পাঠিয়ে দেন।

আচারগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোফাজ্জল হোসেন কাইয়ুম জানান, শরীর খারাপ থাকায় তিনি পরিষদে যেতে পারেননি। তিনি বলেন, এখন প্রত্যেক নারীর ঘরে ভালো মানের ধান রয়েছে। ফলে এই চাল বিক্রি করে দিয়েছেন।

নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোসাদ্দেক মেহদী ইমাম বলেন, ঘটনাটি তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মন্তব্য