kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

মির্জাপুরে চাল ক্রয়ে নজিরবিহীন দুর্নীতি!

মির্জাপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি   

২২ মে, ২০১৯ ১৬:১১ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মির্জাপুরে চাল ক্রয়ে নজিরবিহীন দুর্নীতি!

টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে সরকারি উদ্যোগে চাল ক্রয়ে নজিরবিহীন দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। খাদ্যগুদাম ও স্থানীয় চাতাল মালিকদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হলেও বন্ধ চাতাল কল মালিকদের নামে চাল ক্রয় দেখানো হয়েছে। খাদ্যগুদাম পরিদর্শক ও উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তার যোগসাজসে এসব চাল ক্রয় করছেন বলে অভিযোগে জানা গেছে। এ ছাড়া চুক্তিবদ্ধ চাতাল কল মালিকরা কিছু চাল দিলেও গুদামের কর্মকর্তাদের কেজিপ্রতি তিন থেকে পাঁচ টাকা হারে ঘুষ দিতে হচ্ছে। সিন্ডিকেটর মাধ্যমে নিম্নমানের চাল কিনে খাদ্যগুদাম ভরা হচ্ছে। এর মাধ্যমে অসাধু কর্মকর্তারা লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। 

উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্র মতে, এ বছর মির্জাপুর উপজেলায় সরকারিভাবে ১৪৮২ মেট্রিকটন চাল সংগ্রহ করার কথা। গত ৬ মে উপজেলার সাতজন চাতালকল মালিক জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। এর মধ্যে দেওহাটা মেসার্স ইন্নছ রাইস মিল, কদিম ধল্যার মেসার্স কাজী রাইস মিল ও মেসার্স থ্রি ব্রাদার্স রাইস মিল, মেসার্স হেলাল উদ্দিন রাইস মিল বন্ধ রয়েছে। চুক্তিমতে আগামীকাল বৃহস্পতিবারের মধ্যে প্রথম পর্যায়ে ৬৩১ মেট্রিকটন চাল সংগ্রহের কথা রয়েছে। এ জন্য সরকার মির্জাপুর থেকে কেজিপ্রতি ৩৬ টাকা চালের দাম বেঁধে দিয়েছে। 

সূত্রটি জানায়, গত ১৩ মে থেকে মির্জাপুরে চাল সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হয়। নিয়মানুযায়ী চাতাল কল মালিকেরা স্থানীয়ভাবে নতুন চাল সংগ্রহ করে তা সরকারকে দেবে। কিন্তু খাদ্যগুদামের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাদের পছন্দের ব্যবসায়ীদের দিয়ে কালিহাতি, জামালপুর, শেরপুর, রংপুরসহ উত্তরাঞ্চল থেকে ট্রাকযোগে দিনে ও রাতের আঁধারে চাল গুদামে ঢুকাচ্ছেন। আর কাগজে কলমে চুক্তিবদ্ধ মিলারদের নামে চাল সরবরাহ হচ্ছে বলে উল্লেখ করছেন। দেওহাটা মেসার্স ইন্নছ রাইস মিল, কদিম ধল্যার মেসার্স কাজী রাইস মিল ও মেসার্স থ্রি ব্রাদার্স রাইস মিল ও মেসার্স হেলাল উদ্দিন রাইস মিল বন্ধ থাকলেও তাদের নামে ১৯০ মেট্রিকটন ২ শ কেজি চাল ক্রয় দেখানো হয়েছে। 

এ ব্যাপারে খাদ্য পরিদর্শক মোহাম্মদ তোফায়েল আহমেদ বলেন, মিলারের সাথে আমার ডিসি ফুডের চুক্তি হয়েছে। আমি ওদের নামে বিল দিচ্ছি। চুক্তিবদ্ধ চাতাল মালিকদের নামে চাল এসেছে আমি শুধু বুঝে রেখেছি। বাইরে কে কি করছে তা আমার দেখার সুযোগ নেই। চাল কোন জায়গায় থেকে আসবে তার তদারকি করেন উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা ও সাব-ইন্সপেক্টর কায়েস। তারা মিলে গিয়ে চাল দেখবেন। তারপর চাল এখানে (গুদামে) পাঠাবেন। চাল গুদামে মজুদ করার কাজ হারুন অর রশিদ নামে একজন লেবার হ্যান্ডেলিং করে থাকেন। 

তিনি আরো বলেন, আগামী ৩০ আগস্টের মধ্যে ১৪৮২ মেট্রিকটন চাল ক্রয় করতে হবে। তা ছাড়া ২৩ মের মধ্যে ৬৩১ টন চাল সংগ্রহ করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এ জন্য চাতালের মালিকেরা আগের ধান থাকলেও সেই ধান চাতালে শুকিয়ে চাল দিচ্ছেন। 

মঙ্গলবার পর্যন্ত ৫৭৭.২০০ মেট্রিকটন চাল সংগ্রহ করা হয়েছে বলে খাদ্য পরিদর্শক জানান। 

মির্জাপুর উপজেলা কৃষি অফিস সূত্র জানান, এ উপজেলায় আবাদকৃত বোরো ধানের আনুমানিক ৪০ ভাগ ধান কাটা হয়েছে। অথচ এর মধ্যেই সরকারিভাবে চাল ক্রয় লক্ষ্যমাত্রার প্রায় অর্ধেক চাল সংগ্রহ করা হয়েছে। যা স্থানীয় কৃষকসহ অনেকের মধ্যেই নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

খাদ্যগুদামে চাল নিয়ে আসা মেসার্স স্মৃতি ট্রেডার্স ট্রাকের (ঢাকা মেট্রো-ট-১১-৭২৫৭) হেলাপার জানান, জামালপুর পুলিশ লাইনস এলাকার রত্না রাইস মিল থেকে ৩০ কেজি ওজনের ৭৩০ বস্তা (২২ টন) চাল নিয়ে এসেছেন। তারা তিন ট্রাকে ৬২ টন চাল এনেছেন বলে জানান।  

এএনজেএস এন্টারপ্রাইজ ২ (ঢাকা-মেট্রো-ট-১৮-৪৭৬১) ট্রাকের চালক রায় মোহন বংশী জানান, কালিহাতী ফায়ার সার্ভিসের পাশের এক অটো রাইস মিল থেকে ৫০ কেজি ওজনের ৩৫০ বস্তা চাল এনেছেন। 

রবিবার রাত পৌনে ১০টার দিকে রংপুরের পীরগঞ্জের মিঠাপুকুর এলাকা থেকে চাল নিয়ে আসা ট্রাক চালক রুহুল আমিন বলেন, টিপু মুন্সি নামে এক ব্যক্তির মাধ্যমে ১৬ টন চাল নিয়ে এসেছেন।  

মুঠোফোনে কাজী রাইস মিল নামক চাতাল কল মালিক কাজী ওবাইদুর রহমান বলেন, আমারে ৯০ টন চালের টার্গেট দেওয়া হয়েছিল। আমার মিলে ১৫ দিন ধরে শ্রমিক নেই। বাইরে থেকে ৮৯ মেট্রিকটন চাল এনে দিয়েছি। আর যে যেখান থেকে পারছে, আনছে। কেউ কালীহাতি, কেউ বগুড়া। আর গুদামে চাল ঢুকাতে কেজিপ্রতি টাকা দিতে হয়। 

অপর চাতালকল থ্রি ব্রাদার্স রাইস মিলের পরিচালক আব্দুল মালেক জানান, তার মিলে পর্যাপ্ত শ্রমিক নেই। মাঝে মধ্যে বন্ধ রাখতে হচ্ছে। ২১১ মেট্রিকটন চালের মধ্যে এ পর্যন্ত নিজের মিলসহ ৯০ টন চাল চাল দিয়েছি। 

চাতালকল মালিকদের দেওয়া তথ্য মতে, প্রতিটন চাল গুদামে দিতে চাতাল মিল মালিকদের টনপ্রতি ৩-৫ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে। 

এ ছাড়া খাদ্যগুদাম পরিদর্শক ও উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা মির্জাপুরের বাইরে থেকে কম দামে নিম্নমানের চাল ক্রয় করে অনৈতিকভাবে মোটা অংকের টাকা লাভবান হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। 

চালকল মালিক সমিতির সভাপতি মেসার্স ইন্নছ রাইস মিলের মালিক মো. মোয়াজ্জেম হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে বার বার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি। 

উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা মো. আলী আযম বলেন, মির্জাপুরের সাতটি চাতাল মিলের সঙ্গে তাদের চুক্তি হয়েছে। জামালপুর, কালিহাতি ও রংপুর এলাকা থেকে চাল আনা হয়েছে জানতে চাইলে বলেন, এটি কোনোভাবেই সম্ভব নয়। 

টাঙ্গাইল জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. কামাল হোসেন বলেন, চুক্তিবদ্ধ মিলের মালিকরা স্থানীয়ভাবে ধান ক্রয় করবে। সেই ধান চাল করে গুদামে সংগ্রহ করতে হবে। তা ছাড়া চাল সংগ্রহে কোনো অনিয়ম হলে তার জন্য কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে তিনি জানান।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা