kalerkantho

রবিবার । ২৬ মে ২০১৯। ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২০ রমজান ১৪৪০

নুসরাত হত্যাকাণ্ড : তদন্তে বেরোল স্থানীয় পুলিশের গাফিলতি

এস এম আজাদ    

২৫ এপ্রিল, ২০১৯ ০৮:৫৯ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



নুসরাত হত্যাকাণ্ড : তদন্তে বেরোল স্থানীয় পুলিশের গাফিলতি

ফেনীর সোনাগাজীর ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন পীড়নের পর পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তাদের গাফিলতির তথ্য খুঁজে পেয়েছে তদন্তদল। পুলিশ সদর দপ্তরের তদন্তে কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এ অভিযোগ উঠে এসেছে। সোনাগাজী থানার তৎকালীন ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা ও সাংবাদিকদের কাছে ঘটনাটি আত্মহনন বলে প্রচারের চেষ্টা চালিয়েছিলেন। পরে সংবাদ প্রকাশ করায় ওসি সাংবাদিকদের সঙ্গে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান। রাফির শরীরে আগুন ধরিয়ে দেওয়ায় সারা দেশে তোলপাড় হলেও ফেনীর পুলিশ সুপার (এসপি) জাহাঙ্গীর আলম সরকার ঘটনার চার দিন পর চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) খন্দকার গোলাম ফারুকের সঙ্গে প্রথমবার ঘটনাস্থলে যান। এসপি, ওসিসহ সংশ্লিষ্ট ১০ পুলিশ কর্মকর্তা, মাদরাসার কমিটি, স্থানীয় সাংবাদিক, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের প্রতিনিধি মিলিয়ে কমপক্ষে ৩৭ জনের বক্তব্য নিয়েছে তদন্ত কমিটি। তথ্য পর্যালোচনা শেষে আগামী শনিবারের পর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পুলিশসহ স্থানীয় বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা সচেষ্ট হলে নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনাটি এড়ানো যেত। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেক ব্যক্তির বিতর্কিত ভূমিকাগুলো শনাক্ত করছে তদন্তদল।

এদিকে নুসরাত জাহান রাফির ওপর হামলার আগে (যৌন হয়রানির পর) তার জবানবন্দি ভিডিও চিত্র ধারণ এবং অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়ার মামলায় ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং দুটি মোবাইল ফোন জব্দ করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। গত মঙ্গলবার বিকেলে ঢাকায় পিবিআই সদর দপ্তরে তিন ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ শেষে মোয়াজ্জেম হোসেনকে ছেড়ে দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মামলার আলামত হিসেবে ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের ফোন দুটি ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে। এর মাধ্যমে ফোনে ভিডিও ধারণ, অনলাইনে আপলোড এবং রাফির ঘটনায় মোয়াজ্জেম হোসেনের সংশ্লিষ্টতা পরীক্ষা করে দেখা হবে।

তদন্ত সংস্থা পিবিআই প্রধান, ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সোনাগাজীর সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডেকে কথা বলেছেন। এটি তদন্তের অংশ। কিছু আলামতও জব্দ করা হয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা সর্বোচ্চ পেশাদারি বজায় রেখে তদন্ত করছি। এ মামলায় আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। রহস্য উদ্ঘাটন করে আসামিদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে। তদন্তের বিভিন্ন দিক যাচাই-বাছাই শেষে খুব শিগগির প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।’  

পিবিআই সূত্র জানায়, নুসরাত জাহান রাফিকে জিজ্ঞাসাবাদের জবানবন্দি ভিডিও করে তা অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে গত ১৫ এপ্রিল ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ঢাকার সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দেন। রাফির মৃত্যুর ঘটনা তদন্তের অভিযোগ ওঠার পরই ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে সোনাগাজী থানা থেকে প্রত্যাহার করে ঢাকার আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) সদর দপ্তরে সংযুক্ত করে রাখা হয়েছে। তাঁর কর্মকাণ্ড পুলিশ সদর দপ্তরের তদন্ত কমিটির পাশাপাশি পিবিআইয়ের তদন্তকারীরাও খতিয়ে দেখছেন। এর অংশ হিসেবে মোয়াজ্জেম হোসেনের মোবাইল ফোন দুটি জব্দ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে মোয়াজ্জেম হোসেন ভিডিও করে তা ছড়িয়ে দেওয়ার কথা অস্বীকার করেন। এ কারণে নুসরাত জাহান রাফিকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় থানায় উপস্থিত সবার মোবাইল ফোন জব্দ করে ফরেনসিক পরীক্ষা করা হবে বলে সূত্র জানায়। তদন্ত চলার সময় ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে ঢাকার বাইরে না যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পিবিআইয়ের তদন্তকারী দল গতকাল বুধবার সোনাগাজীতে গিয়ে ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করেছে। তদন্তকারী দলের সদস্যরা থানা, মাদরাসাসহ বিভিন্ন স্থানে গিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য শোনেন।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, তদন্ত কমিটির সদস্যরা ফেনীতে গিয়ে গত মঙ্গলবার পর্যন্ত ৩৭ জনের সঙ্গে কথা বলেছেন। তদন্তকারী দলের সদস্যরা পুলিশ সদস্য ছাড়াও মাদরাসা কমিটির সদস্য, শিক্ষক, অভিভাবক, নুসরাত জাহান রাফির সহপাঠী এবং স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। সাংবাদিকরা তদন্ত কমিটির সদস্যদের বলেন, ওসি মোয়াজ্জেম নুসরাত জাহান রাফির ওপর হামলার ঘটনা প্রচার করায় শীর্ষস্থানীয় দুটি দৈনিক পত্রিকার প্রতিনিধির ওপর চটেছিলেন। তিনি ‘অফ দ্য রেকর্ডে’ রাফির মৃত্যুর ঘটনা আত্মহনন বলেও দাবি করেছিলেন।

তদন্ত কমিটির প্রধান এবং পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি এস এম রুহুল আমীন বলেন, ‘বক্তব্য গ্রহণ এবং তদন্তকাজ শেষ হয়েছে। আমরা ১০ জন পুলিশ সদস্যসহ ৩৭ থেকে ৩৮ জনের সঙ্গে কথা বলেছি। এখন পর্যালোচনা শেষে প্রতিবেদন দেব।’ তিনি আরো বলেন, ‘সোনাগাজী থানার সাবেক ওসিসহ পুলিশের কারো কারো ত্রুটি-বিচ্যুতি পাওয়া গেছে। যৌন হয়রানির ঘটনার পর স্থানীয় প্রশাসন, মাদরাসা কমিটিসহ অনেকের গাফিলতি ছিল। এটা না হলে মর্মান্তিক ঘটনা এড়ানো যেত।’

সোনাগাজী থানায় ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের আগে ওসির দায়িত্বে ছিলেন হুমায়ুন কবির। তিনি এখন ফেনীরই ফুলগাজী থানার ওসি। গত মঙ্গলবার মধ্যরাতে তিনি তাঁর ফেসবুক অ্যাকাউন্টে রাফির মৃত্যু এবং ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের কর্মকাণ্ড নিয়ে একটি স্ট্যাটাস দেন। এতে হুমায়ুন কবির দাবি করেন, মোয়াজ্জেম হোসেনের কর্মকাণ্ডের আগে সোনাগাজী বা জেলা পুলিশের অর্জন ভালোই ছিল। তিনি লিখেছেন, “মাননীয় রেঞ্জ ডিআইজি মহোদয়ের গোটা রেঞ্জ ফেলে কেন একটি থানা এলাকায় একাধিকবার যেতে হচ্ছে? সবচেয়ে বড় কথা ওসি মোয়াজ্জেমের কারণে গোটা বাহিনী বাংলাদেশ পুলিশকে কেন মাথা নুইয়ে থাকতে হচ্ছে? পুলিশের ভাবমূর্তি যতটুকু খুইয়েছেন একজন ইন্সপেক্টর মোয়াজ্জেম তার এক সহস্রাংশও কি পুলিশ বাহিনীর জন্য অর্জন করে দিতে পারবেন? আমি উত্তর দিতে পারছি না এমন প্রশ্ন আমার ছেলে-মেয়ে কেন করছে আপনার কারণে? অপমানের চেয়ে মৃত্যু হওয়াই আপনার জন্য শ্রেয় নয় কি?’

অন্যদিকে আজ বৃহস্পতিবার নুসরাত জাহান রাফির লাশের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ। গত ১০ এপ্রিল এ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে রাফির মৃত্যুর পর ময়নাতদন্তের সময় বেশ কিছু আলামত রাখা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, রাফির শরীরে অগ্নিদগ্ধ হওয়া ছাড়া অন্য কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। দাহ্য পদার্থের (কেরোসিন) মাধ্যমে দেওয়া আগুনে শরীর দগ্ধ হয়েই রাফির মৃত্যু হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে এমনটি উল্লেখ করা হবে বলে জানিয়েছে সূত্র।

প্রসঙ্গত, গত ২৭ মার্চ নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন পীড়িন করেন মাদরাসার অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ উদ দৌলা। রাফির মায়ের করা মামলায় অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ উদ দৌলাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ৬ এপ্রিল রাফি আলিম পরীক্ষা দিতে গেলে চারতলা ভবনে নিয়ে তার শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয় এস এম সিরাজ উদ দৌলার অনুসারীরা। ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় রাফি। এ ঘটনায় রাফির ভাইয়ের করা মামলায় এখন পর্যন্ত ২০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ও পিবিআই। কিলিং মিশনে অংশগ্রহণকারী শাহাদাত হোসেন শামীম, জাবেদ হোসেন, জোবায়ের আহমেদ, উম্মে সুলতানা পপি, কামরুন নাহার মনিসহ আটজন দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে হুকুমদাতা অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ উদ দৌলা, আশ্রয়দাতা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিন, অর্থদাতা পৌর কাউন্সিলর ও পৌর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম এবং মাদরাসার শিক্ষক আবছার উদ্দিনকে।

মন্তব্য