kalerkantho

শনিবার । ২৫ মে ২০১৯। ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৯ রমজান ১৪৪০

ধর্ষণে পেটে সন্তান নিয়ে একঘরে শিশুটি

আঞ্চলিক প্রতিনিধি, ময়মনসিংহ   

২৪ এপ্রিল, ২০১৯ ১৯:২০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ধর্ষণে পেটে সন্তান নিয়ে একঘরে শিশুটি

জন্ম নিবন্ধনে দেওয়া তারিখ অনুযায়ী (৩১ ডিসেম্বর ২০০৫) শিশুটির বয়স ১৩ বছর ৩ মাস ২২ দিন। আর এই শিশুটিই আর ক'দিন পর জন্ম দিতে যাচ্ছে আরেকটি শিশুর। তাকে প্রতিবেশী দুই স্কুলছাত্র 'পালাক্রমে ধর্ষণে'র কারণে সে এখন ৭ মাস ২২ দিনের অন্তঃসত্ত্বা (আলট্রাসনোগ্রাফি রিপোর্ট অনুযায়ী) বলে জানা গেছে। এখন, একদিকে সে অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী আর অন্যদিকে সামাজিকভাবে ও লোকলজ্জায় তার পরিবার এখন একঘরে অবস্থায় দিনাতিপাত করছে।

স্থানীয় ইউপি সদস্য, দলীয় লোকজন ও গ্রাম্য মাতব্বরদের কারণেই এত দিন কোনো ধরনের আইনি সহায়তা নিতে পারেনি বলে অভিযোগ করে মেয়েটি ও তার পরিবার। এমনই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটেছে ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার সিংরুইল ইউনিয়নের সিংরুইল হিন্দুপাড়া গ্রামে।

খবর পেয়ে আজ দুপুরে ওই গ্রামে গেলে দেখা যায়, লোকলজ্জা ও শরীর অসুস্থ হয়ে কাবু হয়ে যাওয়া শিশুটি ছাপড়া একটি ঘরের এক কোণে বসে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। মা ও বাবা অন্য একটি ঘরের মাটিতে বসে আছেন মহা এক চিন্তা নিয়ে। গত সোমবার রাতে ইউপি মেম্বার ও সালিসকারীরা বলে গেছে, তাদের পক্ষে এখন আর কিছুই করার নেই। এই অবস্থায় আকাশ ভেঙে পড়ছে তাদের মাথায়। এই খবরে শিশুটিও ভেঙে পড়েছে।

শিশুটি জানায়, গত কয়েকমাস আগে নিজ ঘর থেকে বের হয়ে অন্যবাড়িতে টেলিভিশন দেখার জন্য যাচ্ছিল। এ সময় প্রতিবেশী চান্দু মিয়ার অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে মোবারক ও মো. আকরামের একই শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলে রাকিব তাকে গলায় ছুরি ধরে ঘরের পেছনে নিয়ে যায়। সেই ছুরির ভয় দেখিয়ে তারা দুজন তাকে ধর্ষণ করে। ধর্ষণ শেষে চলে যাওয়ার সময় তারা হাতের ছুরি দেখিয়ে কাউকে জানালে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। এরপর সে ভয়ে ওই রাতের ঘটনা কারো কাছে প্রকাশ করেনি। কিন্তু শিশুটির শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন শুরু হলে পাড়ায় প্রথমে কানাঘুষা পরে ঘটনাটি জানাজানি হয়।

শিশুটির বাবা জানান, সন্তানের দুরাবস্থা দেখে তিনি ঘটনাটি এলাকার ইউপি সদস্য মো. সাইদুর রহমান, সাবেক সদস্য আবুল কালাম ও আওয়ামী লীগের স্থানীয় কয়েকজন নেতাকে জানিয়ে প্রতিকার চান। তাদের পরামর্শে তিনি মেয়ের আলট্রাসনোগ্রাম করিয়ে আনেন। কিন্তু আলট্রাসনোগ্রাম প্রতিবেদন দেখার পর জনপ্রতিনিধি ও অন্যরা আমাকে সহায়তা করতে অপারগতা জানায়। আইনি প্রতিকার নেওয়ার জন্যও তারা আমাকে সহায়তা করছেন না। 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অভিযুক্ত ওই দুই কিশোর স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। তাদের স্বভাব-চরিত্রও এলাকায় প্রশ্নবিদ্ধ। এ বিষয়ে দুই কিশোরের বাড়িতে গেলে তাদের পাওয়া যায়নি। তবে রাকিবের মা মোসা. নাসরিন আক্তার ও মোবারকের মা ফরিদা আক্তার দাবি করেন তাদের সন্তানরা নির্দোষ। তারা দুজনই এখন স্কুলে আছে বলে জানান। তবে পাশেই বিদ্যালয়ে গিয়ে জানা যায়, গত বেশ কয়েকদিন ধরেই রাকিব ও মোবারক শ্রেণিতে অনুপস্থিত রয়েছে।

এদিকে গত কয়েকদিন ধরেই শিশুটির বাড়িতে আনাগোনা করছেন ইউপি মেম্বারসহ গ্রামের মাতব্বরারা। তারা ফয়সালার নামে ঘটনাটি নিয়ে কালক্ষেপণ করছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত সোমবার সর্বশেষ সালিসে উপস্থিত ছিলেন আবু রায়হান রেনু, লাল মিয়া, বাচ্চু মিয়া ও আজিম উদ্দিন। তারা জানান, এলাকার ইউপি সদস্য সাইদুর রহমান ও সাবেক সদস্য আবুল কালাম রাতে শিশুটির বাড়ির উঠানে বসে কথাবার্তা বলেন। এ সময় সাবেক মেম্বার আবুল কালাম সালিসের নির্দেশে অভিযুক্তদের কাছে গিয়ে ঘটনা জানতে দায়িত্ব পান। দীর্ঘক্ষণ পরে কালাম সালিসে এসে জানান, মোবারক ঘটনা স্বীকার করেছে। তারা দুজনই এ ধরনের কাজ করেছে। কিন্তু কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত না দিয়েই তারা ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। এ সময় ইউপি মেম্বার বলে যান, তার পক্ষে এখন আর কিছুই করার নেই।

ইউপি সদস্য সাইদুর রহমান বলেন, আমি মাত্র কয়েকদিন আগে ঘটনা জেনেছি। এখন শিশুটির এই অবস্থায় কোনো ধরনের দায়িত্ব নিতে চাই না। তাই থানায় গিয়ে ওসি সাহেবকে ঘটনা জানিয়েছি।

নান্দাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল ইসলাম মিয়া বলেন, ওই মেম্বার গত সোমবার রাতে আমার কক্ষে এসে ঘটনাটি বিচার করা যাবে কি-না জানতে চেয়েছিলেন। এ ধরনের বিচার সালিস গ্রহণযোগ্য নয় জানালে তিনি চলে যান। সেই সাথে মেয়েটির পরিবারকে থানায় এসে অভিযোগ দিতে তাকে বলে দেওয়া হয়েছে।

মন্তব্য