kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ মে ২০১৯। ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৫ রমজান ১৪৪০

শ্রীবরদীর মিরকি নদী এখন শুধুই ইতিহাস!

শ্রীবরদী (শেরপুর ) প্রতিনিধি   

২৩ এপ্রিল, ২০১৯ ১৫:৪৬ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



শ্রীবরদীর মিরকি নদী এখন শুধুই ইতিহাস!

শান বাঁধানো ঘাট। পালতোলা নৌকার চলাচল। মাঝিদের ভাটিয়ালি সুরে গান। মহানন্দে তাদের বেয়ে চলা নৌকা। ভেসে ভেসে এক স্থান হতে অন্য স্থানে যাওয়া। এখন এ সবই শুধু স্মৃতি। রুই, কাতলা, চিতল, গজার, শোল, বোয়াল, শিং, মাগুর, টাকিসহ নানা জাতের দেশীয় মাছের ভরপুরের গল্পটাও যেন কাল্পনিক মনে হয়। এ নদীতে ছিল শতশত জেলেদের কোলাহল। এটি মিরকি নদীর আদিকথা। কালের স্রোতে ভরাট হয়েছে নদীটি। এখন রাখালেরা নদীর বুকে গরু চড়ায়। পরিণত হয়েছে কৃষি জমি। ক্ষরশ্রোতা এ নদীর ওপর গড়ে ওঠছে বসতবাড়ি।

ভারত থেকে নেমে আসা রাক্ষুসী পাগলা নদী। এর গতিপথ ছিল শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার এই মিরকি নদীতে। নতুন প্রজন্মের কাছে মিরকি নদী শুধু কল্পকাহিনী। সম্প্রতি অনুসন্ধানে গেলে স্থানীয় মানুষের মাঝে দাবি ওঠে নদীটি খননের। এতে অবসান হবে পৌর শহরের জলাবদ্ধতা। কৃষি জমিতে হবে সেচের ব্যবস্থা। বিপ্লব ঘটবে মৎস চাষে। ফিরে পাবে নদীর গতিপথ। প্রকৃতিতে যোগ হবে নতুন মাত্রা।

এলাকাবাসীরা জানান, শ্রীবরদী উপজেলা সদর বাজারে ছিল মিরকি নদীর ঘাট। এ নদীর পূর্বে শ্রীবরদী সদর বাজার, দক্ষিণে বনপাড়া, চককাউরিয়া, পশ্চিমে ঝালুপাড়া, পুটল, উত্তরে গেরামারা ও কাকিলাকুড়া এলাকা। এ ছাড়াও নয়াপাড়া, গেরামারা, কাকিলাকুড়াসহ কয়েকটি স্থানে ছিল ছোট ছোট ঘাঁটি। এ নদীটি ঘিরে শ্রীবরদীর তৎকালীন নাম শম্ভূগঞ্জে গড়ে ওঠেছিল বিশাল পাটের বাজার। এ ঘাট হতে নৌকায় পাট বোঝাই করে নেওয়া হতো জামালপুর জেলা সদরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে।

গেরামারা কয়েকজন বৃদ্ধ জানান, এখান থেকে পাট জামালপুর ও বকশিঞ্জ ঘাটে নিয়ে বিক্রি করা হতো। সেই সময় পাট বিক্রি করে প্রতি বছর মধ্য বয়সীসহ বয়োবৃদ্ধরা হজ করে আসতো। ফলে এ গ্রাম হাজীপাড়া হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল। বর্ষায় পাল তোলা নৌকায় নানা পণ্য সামগ্রী নিয়ে আসতো বেদেনীরা। চলাচল করতো এ ঘাট থেকে ও ঘাটে। মিরকি নদীতে বেদেনীদের পালতোলা নৌকার আনাগোনায় সৌন্দর্যে যোগ হতো এক নতুন মাত্রা।

স্মৃতি বিজরিত এ নদীর রূপকথা তুলে ধরে কালিদাস, গোপাল, শামছুল হক, মেয়াজ্জেমসহ অনেক বয়োবৃদ্ধ জেলে জানান, স্বাধীনতার আগেও এ নদীর গভীরতা ছিল ১৫/২০ ফুট। নদীর ওই জৌলুস হারিয়েছে প্রায় ২৫ বছর আগেই। পাহাড়ি ঢলে প্রতি বছরই এ নদীতে পড়েছে পলিমাটি। এতে ঐতিহ্যবাহী এ নদীর অস্তীত্ব বিলীন হয়েছে। ভারতের লাউচাপড়া হয়ে সিংগাবরনা ও কাকিলাকুড়া ইউনিয়নের ওপর দিয়ে প্রায় ১৩/১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এ নদীর বুকে জেগেছে চর। এ চরে প্রায় দেড় যুগ ধরে চলছে ইরি বোরোসহ বিভিন্ন চাষাবাদ। তবে এর প্রায় ১২ কিলোমিটারের অস্তীত্ব ভরাট হয়েছে। ছিল মিরকি নদী। কয়েক বছর যাবত এই মিরকি নদীতেও গড়ে ওঠছে বসতবাড়ি। কেউবা করছেন চাষাবাদ।

মিরকি নদীর দু’পাড়ে কৃষকরা জানান, এ নদীতে পলিমাটি পড়ে অধিক উর্বর হয়েছে। এ জন্য সারের প্রয়োজন হয় না। রয়েছে সেচ সুবিধা। ফলে স্বাচ্ছন্দ্যে চলছে ইরি বোরো চাষাবাদ। নদীর বুকে চাষাবাদ করে অনেকে বছরের ৫/৬ মাসের খাবার ধান ঘরে তুলছেন। এসব কৃষকের সংখ্যা পাচঁ শতাধিক।

মিরকি নদীর ইজাদার একতা মৎসজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাহিদ হাসান জানান, এ নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন খাল খনন। এতে ফিরে পাবে নদীর নাব্যতা। এখানে মাছের চাষ করে কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে বেকারদের। উপজেলা মৎস কর্মকর্তা কৃষিবিদ সাইদুর রহমান, এখানে পরিকল্পিতভাবে মাছের চাষ করলে বছরে মাছের উৎপাদন হবে কোটি টাকার।

সচেতন মানুষের মতে, এক সময় যেসব জেলে এ নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতো। তাদের অনেকের জীবনে নেমেছে দুর্ভোগের অমানিষা। কেউবা পেশা বদল করে চলে গেছে অন্যত্র। ফলে মৎস এলাকাটি হয়েছে মৎস্য শূন্য। নদীটি ড্রেজিং করা হলে বছরে কোটি কোটি টাকার মাছ উৎপাদন হতে পারে। এ নদীতে হতে পারে মৎস্য খামার। এখানেই হতে পারে হাজারো বেকারের কর্মসংস্থানের পথ। দেশে মেটাতে পারে মাছের চাহিদা। 

মন্তব্য