kalerkantho

রবিবার । ২৬ মে ২০১৯। ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২০ রমজান ১৪৪০

রানা প্লাজা ট্রাজেডির ৬ বছর : ধামরাইয়ের ২৫ পরিবারে দুঃসহ স্মৃতি

ধামরাই (ঢাকা) প্রতিনিধি   

২৩ এপ্রিল, ২০১৯ ১১:৫০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



রানা প্লাজা ট্রাজেডির ৬ বছর : ধামরাইয়ের ২৫ পরিবারে দুঃসহ স্মৃতি

আগামীকাল ২৪ এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা ট্রাজেডির ছয় বছর। ধামরাইয়ের হতাহত ২৫ গার্মেন্টকর্মীর পরিবার এখনো স্বজন হারানোর স্মৃতি ভোলেনি। এসব পরিবারে এখনো চলছে শোক। সরকারি ও বেসরকারিভাবে কিছু আর্থিক সাহায্য পেলেও পরিবারগুলো একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষকে হারিয়ে ও পঙ্গু হয়ে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাদের একটাই দাবি- কর্মসংস্থান।

সিরাজগঞ্জের চৌহালীর চানদৈর গ্রামের শুকুর আলীর বিঘায় বিঘায় জমি ও ঘরবাড়ি নিয়ে গেছে নির্দয় যমুনা। যমুনার সঙ্গে সংগ্রাম করে টিকতে পারেনি শুকুর আলী। নদীগর্ভে সব হারিয়ে শুকুর আলী স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে পাড়ি দিয়েছিলেন ধামরাইয়ের কুল্লা ইউনিয়নের বড়কুশিয়ারা গ্রামে। পেটে দুমুঠো ভাত আর বাবা-মায়ের সংসার চালানোর জন্য শুকুর আলীর ছেলে সুরমান আলী চাকরি নিয়েছিলেন সাভারের রানা প্লাজার পোশাক কারখানায়। কিন্তু সেখানের সব স্বপ্নও কেড়ে নিল 'দানব' রানা প্লাজা ট্রাজেডি। রানা প্লাজা ধসে জীবন গেছে সুরমান আলীর। রানা প্লাজা ধসে পড়ার ১৭ দিন পর সুরমান আলীর লাশ খুঁজে পায় স্বজনরা। যমুনায় সবকিছু কেড়ে নিলেও সে শোক মুছে গেছে কিন্তু পুত্র হারানোর শোক এখনো ভুলতে পারেননি শুকুর আলী ও তার স্ত্রী তারাবানু। সুরমানের বৃদ্ধ বাবা-মা কোনো কাজ করতে পারে না। সুরমানের স্ত্রী সুফিয়া বেগমও বেকার। তার ঘরে রয়েছে ৯ বছরের মেয়ে সুমি আক্তার। সুরমান বেঁচে থাকলে আজ হয়তো তাদের সংসারে কোনো অভাব থাকত না। সুফিয়া বেগম অভাবের সংসার টিকিয়ে রাখতে এখন মানুষের বাড়ি বাড়ি ঝিয়ের কাজ করছেন। সুফিয়া জানায়, তার স্বামী মারা যাওয়ার পর সরকারিভাবে ও স্থানীয় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সজাগের উদ্যোগে কিছু অর্থ সহায়তা ছাড়া আর কেউই তাদের খোঁজ নেয়নি। এখন তিনি কর্মসংস্থানের দাবি জানিয়েছেন।

একই গ্রামের মনির হোসেন অষ্টম তলায় কাজ করতেন। তিনি লাফিয়ে পড়ে প্রাণে রক্ষা পেলেও ডান কান ছিঁড়ে গেছে। ওই কানে তেমন শুনতে পান না। কান না থাকায় চাকরিতেও নিচ্ছে না বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। ফলে এখন রাজমিস্ত্রির জোগালের কাজ করছেন। মাঝে মাঝে কানের ভেতর তীব্র ব্যথা হয়। প্রায়ই চিকিৎসকের কাছে যেতে হয়। কিন্তু টাকা-পয়সার অভাবে কানের উন্নত চিকিৎসা করাতে পারছেন বলে জানান তার দরিদ্র পিতা আবদুল হালিম। 

ধামরাইয়ের বড়কুশিয়ারা গ্রামের নাছির উদ্দিন রানা প্লাজার ছাদের চাপা পড়ে একটি পা ভেঙে গেছে। তিনি দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর এখন রিকশা চালিয়ে কোনোরকম সংসার চালান। তার স্ত্রী তানিয়া আক্তার ও বৃদ্ধ শ্বশুর-শ্বাশুড়ির ভরণপোষণ করতে হচ্ছে।

ধামরাইয়ের মাখুলিয়া গ্রামের সামছুন্নাহার তার ছেলে মিজানুর রহমান রানা প্লাজার অষ্টম তলায় কাজ করতেন। ছেলের স্বপ্ন ছিল গার্মেন্টে চাকরি করে বাবা-মার জন্য পাকা বাড়ি বানাবেন। বাড়ির কাজেও হাত দিয়েছিলেন। কিন্তু ভবনধসের শিকার হয়ে মিজানুর রহমান নিহত হন। আজ মঙ্গলবার তার বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, ছেলের ছবি বুকে নিয়ে মা সামসুন্নাহার প্রলাপ করছেন, ছেলে বেঁচে থাকলে আজ পাকা বাড়ি নির্মাণের কাজ শেষ হতো। ছেলের মৃত্যুর পর কোনো সাহায্য পেয়েছেন কি-না জানতে চাইলে সামসুন্নাহার বলেন, আমি কোনো সাহায্য চাই না, আমার ছেলেকে চাই। খুনি রানার বিচার চাই।

রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানার নানার বাড়ি ধামরাইয়ের আনন্দনগর গ্রামে। রানা প্লাজা ট্রাজেডির পর ওই গ্রামের আসিয়া খাতুনের মেয়ে রিনা আক্তারের এখনো সন্ধান মেলেনি। মেয়েকে হারিয়ে পাগলপ্রায়। তিনি আজও মেয়ের ছবি হাতে পথ চেয়ে অপেক্ষা করেন। একমাত্র উপর্জনক্ষম মেয়ে রিনাকে হারিয়ে অসুস্থ আসিয়া খাতুন কাজ করতে না পারায় ঠিকমতো খাবার জুটছে না।

একই গ্রামের দরিদ্র আমিন বেপারী তার দুই ছেলে রবিন ও রুবেল রানা প্লাজার পঞ্চম ও সপ্তম তলায় চাকরি করে উপার্জিত অর্থ দিয়ে ওই রানা প্লাজার নিচে একটি দোকান কিনে ব্যবসা শুরু করে। সাভারে রানা প্লাজা ট্রাজেডির ঘটনায় দোকান হারিয়ে এক ছেলে রবিনের মৃত্যু ও অপর ছেলে রুবেল ভারসাম্যহীন হওয়ায় তার বাবা আমিন বেপারী এখন দিশাহারা হয়ে পড়েছেন। ছেলের কথা মনে করে এখনো তার দুচোখ বেয়ে পড়ে পানি।

এ ছাড়া ধামরাইয়ের রূপনগর গ্রামের আব্দুস সালাম, মুক্তা আক্তার, আড়ালিয়া গ্রামের আনোয়ার হোসেন, শিল্পী আক্তার, চরবর্দাইল গ্রামের তহুরা বেগম, লিমা আক্তার, ফড়িংগা গ্রামের আরিফুল ইসলাম, দধিঘাটা গ্রামের পবিত্র মন্ডল, বাঙ্গালপাড়া গ্রামের শিল্পী আক্তার, কদমতলা গ্রামের রোমানা আক্তার, আনন্দনগর গ্রামের রবিন হোসেন, রিনা আক্তারসহ ১৪ জন ওই রানা প্লাজা ধসে মারা গেছেন। তাদের পরিবারেও দেখা দিয়েছে অভাব আর অনটন। পরিবারের সদস্যদের হারিয়ে তাদের মধ্যেও নেই কোনো সুখ। এ ছাড়াও পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন আরো ১১ জন।

মন্তব্য