kalerkantho

বুধবার । ২২ মে ২০১৯। ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৬ রমজান ১৪৪০

শিক্ষা কর্মকর্তার বদলি বাণিজ্য

নড়াইল প্রতিনিধি   

২১ এপ্রিল, ২০১৯ ১৭:৩৫ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



শিক্ষা কর্মকর্তার বদলি বাণিজ্য

লোহাগড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আকবর হোসেন। ছবি : কালের কণ্ঠ

নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অর্থ গ্রহণের বিনিময়ে বিধিলঙ্ঘন করে শিক্ষক বদলির অভিযোগ পাওয়া গেছে। বদলির নিয়ম-নীতি না মেনে জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের বাদ দিয়ে জুনিয়র ও নবীন শিক্ষকদের বদলি, পদায়ন করায় ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েছেন শতাধিক সিনিয়র শিক্ষক। এ ব্যাপারে তারা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বরাবর অনিয়ম বিষয়ে আবেদন করে ঘুষের বিনিময়ে বদলি-পদায়ন বাতিল চেয়েছেন।

লোহাগড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি সূত্রে জানা গেছে, গত ৩১ মার্চ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস লোহাগড়া উপজেলার ১৬ জন সহকারী শিক্ষককে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে বদলির অনুমতি দিয়ে অফিস আদেশ জারি করা হয়। জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে বদলির খবর পেয়ে ক্ষুব্ধ সিনিয়র শিক্ষকেরা ওই দিনই উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে বদলির আবেদনপত্র জমা দিতে গেলে নানা অজুহাতে তা গ্রহণ করেনি উপজেলা শিক্ষা অফিসার। বদলিপ্রত্যাশী জ্যেষ্ঠ শিক্ষকরা অভিযোগ করেন, শিক্ষা কর্মকর্তা নীতিমালা অনুযায়ী সাত দিন আগে আবেদন জমা দেবার কথা বললেও কোনো বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই জুনিয়র শিক্ষকদের বদলি করেছেন, আমরা নিয়ম জানতে গেলে আমাদেরকে বিভাগীয় মামলা দিয়ে চাকরি খেয়ে ফেলার হুমকি দিয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার মরিচপাশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নতুনভাবে বদলিকৃত অঞ্জনা খানম ২০১০ সালে চাকরিতে যোগদান করেন। একই বিদ্যালয়ে বদলির আবেদনকারী মাহাবুবা খানমের যোগদান ২০০৯ সালে হলেও মাহাবুবার আবেদন উপেক্ষা করে অর্থের বিনিময়ে অঞ্জনাকে বদলি করা হয়েছে। মাহাবুবার অভিযোগ, শিক্ষা অফিসের উচ্চমান সহকারী ইলিয়াছ হোসেন তার স্বামীর কাছে ২০ হাজার টাকা দাবি করেছিল, দাবির টাকা না মেটানোয় তার আবেদন গ্রাহ্য করা হয়নি। 

অভিযোগ রয়েছে শূন্য পদসমূহে কোনো ধরনের বিজ্ঞপ্তি না দিয়েই অর্থের বিনিময়ে গোপনে আবেদন সংগ্রহ করে নিয়মবর্হিভূতভাবে শূন্য পদে পদায়ন করা হয়েছে। কেবলমাত্র জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনই নয়, পদ শূন্য না হলেও শিক্ষকদের সুবিধামতো বদলি করে অর্থবাণিজ্য করেছেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস। দিঘলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ফসিয়ার রহমানকে ঝিকিরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এবং লাহুড়িয়া পচাশিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে সহকারী শিক্ষক অর্পনা বিশ্বাসকে দিঘলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্থানান্তর করা হয়েছে। এই দুটি স্কুলে কোনো পদই শূন্য হয়নি।

এ ছাড়া নীতিলঙ্ঘন করে মতিনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে দুজন, গোপালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে দুজন এবং নালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে তিনজন শিক্ষককে বদলি করা হয়েছে। এসব স্কুলে এখন তিনজন করে শিক্ষক রয়েছেন। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কমপক্ষে চারজন শিক্ষক থাকার কথা। 

না প্রকাশ না করার শর্তে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক বলেন, এই অফিসের বদলি বিষয়ে কিছু বললে আমাদের নানা ধরনের ফ্যাসাদে ফেলার হুমকি দেয় কর্মকর্তারা, তাই চুপ করে সব সহ্য করতে হয়। শিক্ষা অফিসের  প্রতিটি কাজেই ঘুষ প্রদান করতে হয়।

মরিচপাশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সালাউদ্দিন আরিফ বলেন, লোহাগড়া উপজেলা শিক্ষা অফিসের উচ্চমান সহকারী ইলিয়াস হোসেনের মাধ্যমে ৩১ মার্চ রাতে উৎকোচ গ্রহণ করে ১৬ জন শিক্ষকের বদলি চূড়ান্ত করেন শিক্ষা কর্মকর্তা। প্রতিনিয়তই এই অফিসে বদলি বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।

লোহাগড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও চাচই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মফিজুর রহমান বলেন, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে অসাধু কর্মচারীরা প্রতিনিয়ত নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ঘুষ এর মাধ্যমে বদলি বাণিজ্য করে যাচ্ছেন।

অভিযুক্ত অফিস সহকারী ইলিয়াস হোসেন বদলির ব্যাপারে শিক্ষকদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার কথা অস্বীকার করে বলেন, বদলির ব্যাপারে স্যারেরা ভালো জানেন, আমি অফিস সহকরী হিসেবে কাজ করেছি মাত্র।

এ বিষয়ে লোহাগড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আকবর হোসেন বলেন, আমি অল্প কিছুদিন হলো এখানে এসেছি, টাকা নেওয়ার বিষয়টা জানি না। তবে নিয়ম-নীতি মেনেই বদলি করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। নিজে বদলি বাণিজ্যের সাথে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে তিনি বলেন, সব মিথ্যা-বানোয়াট।

বদলি বাণিজ্যের ব্যাপারে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মু. শাহ আলম জানান, শিক্ষকদের অভিযোগ আমলে নিয়ে জেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হেমায়েত আলী শাহকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, অনিয়ম পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

মন্তব্য