kalerkantho

অনিবার্য কারণে আজ শেয়ারবাজার প্রকাশিত হলো না। - সম্পাদক

নিভে যাওয়া প্রদীপের কাণ্ডারি 'সৈনিক শাহিন'

রেজাউল করিম বকুল, শ্রীবরদী (শেরপুর) প্রতিনিধি   

২১ এপ্রিল, ২০১৯ ১৭:৩০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



নিভে যাওয়া প্রদীপের কাণ্ডারি 'সৈনিক শাহিন'

দারিদ্র্যের নির্মম কষাঘাতে নিভে যায় প্রদীপ। ছিল বেঁচে থাকার আকুতি। অভাবের তাড়না কুড়ে কুড়ে হয় নিঃশেষ। মেঘে ঢাকা পড়ে মনের সুপ্ত বাসনাগুলো। অন্ধকারে ডুবে যায় আশা-ভরসা। চুকে যায় পড়ালেখা। জীবন মানে যন্ত্রণা। জন্ম মানে মা বাবার বোঝা।

এমনি পরিস্থিতির শিকার হয়েছিল শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার গড়জরিপা ইউনিয়নের গোপালখিলা গ্রামের শওকত আলীর ছেলে বাবুল মিয়ার। তার পরিবারে সদস্য সংখ্যা চার জন। শওকত আলী দিন মজুরি করে সংসার চালায়। বাবুল মিয়া গোপালখিলা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করে। এরপর অভাবে তাড়নায় নেমে পড়ে অর্থ উপার্জনে। বন্ধ হয় পড়ালেখা। কখনো ভাবেনি পড়ালেখার সুযোগ সে পাবে। দেড় বছর পর নজরে পড়ে সৈনিক শাহীনের। তার সহায়তা আর পরামর্শে বাবুল মিয়া ভর্তি হয় শ্রীবরদী সরকারি কলেজে। এখান থেকে পাশ করে এইচএসসি। এবার সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। এখন বাবুল মিয়া স্বপ্ন দেখছে ওপরে ওঠার।

হতদরিদ্র বাবুল মিয়ার মতো আহমেদ হোসেন জনি। তার বাবা অসুস্থ। পরিবারে উপার্জনের আর কেউ নেই। বাধ্য হয়ে সে নেমেছিল বাবার পেশা কৃষিতে। এখান থেকে আবারো শিক্ষা মুখী হয় আহমেদ হোসেন জনি। এবার সে অর্থনীতি বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে।

ওদের মতো শারমিন আক্তার। তার বাবা একজন ক্ষুদ্র মাছ বিক্রেতা। অর্থের অভাবে তার পড়ালেখা বন্ধ হয়েছিল। চলছিল তাকে বাল্যবিয়ে দেওয়ার প্রস্তুতি। এখান থেকে উঠে এসেছে শারমিন। এই মেয়ে এবার ফিসারিজ বিষয়ে ভর্তি হয়েছে ঢাকা ব্শ্বিবিদ্যালয়ে।

ওদের মতো শামীম রহমান, নুসু মিয়া, নমিতা রানী বর্মণ, মাহমুদুল হাসান, আলী আকবর, ওয়াসিম আকরাম, নাছিমা খাতুন ও আলমগীর কবির এবার দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। তাদের চোখে মুখে এখন আলোর ঝলকানি। এসবই সৈনিক শাহীন মিয়ার পরামর্শ আর সহায়তা।

সৈনিক শাহীন সেনা বাহিনীর একজন গর্বিত সৈনিক। তার মধ্যে ছিল দেশ সেবার টান। তার প্রচেষ্টা নিভে যাওয়া প্রদীপে আলো ছড়াতে। তিনি আলোকিত করতে চান পরিবার, সমাজ ও দেশ। তার এ প্রচেষ্টায় অল্পদিনেই ডানা মেলেছে। সাড়া পড়েছে চারিদিকে। ওই ১১ জনের মতো অনেক নিভে যাওয়া প্রদীপে এখন আলো জ্বলছে। কেউবা হয়েছেন তরতাজা। আলো ছড়াচ্ছেন চারিদিকে। শতশত ছেলে মেয়ে দেখছে স্বপ্নীল স্বপ্ন। যারা কখনোই স্বপ্ন দেখেনি। তারা তাকিয়ে আছে সৈনিক শাহিনের দিকে। কেউ বা চড়েছেন স্বপ্নের চুড়ায়।

এই সাহসী যুবক শাহীন শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার গড়জরিপা ইউনিয়নের গোরজান গ্রামের এক মধ্যবিত্ত কৃষকের সন্তান। ছোট থেকেই তিনি ছিলেন পরোপকারী। কোনো বাধাই তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। গরীব শিশু কিশোর আর যুবকদের প্রতি বরাবরই ছিল দুর্বলতা। সম্প্রতি এক বৈশাখী মিলন মেলায় ওইসব প্রদীপে দেখা যায় আলো ছড়াতে। কথা হয় অনেকের সাথে। তারা তুলে ধরেন নিভে যাওয়ার দুঃসহ যন্ত্রণার কথা। জানান সাফল্যের নানা কথা।

শাহীন মিয়া ২০০১ এ যোগ দেন সেনাবাহিনীতে। সততা, শৃংখলা আর আদর্শ তার মধ্যে দারুণভাবে প্রভাব ফেলে। ছুটিকালীন সময়ে খোঁজেন সামাজিক সমস্যা। এর মধ্যে তার চোখে পড়ে বিদ্যালয় থেকে ঝড়ে পড়াদের। সেই থেকে চলে তার সংগ্রাম। দেখেন মাধ্যমিকের সিঁড়ি পাড় না হতেই ঝড়ে পড়ে অনেকে। তিনি তাদেরকে স্কুলগামী করেন। সহায়তা দেন উপকরণ।

এভাবে বাড়তে থাকে ঝড়ে পড়াদের সংখ্যা। তার এই পথচলার মান দিতে প্রতিষ্ঠিত করেন একটি সামাজিক সংগঠন। যার নাম দরিদ্র্য ও অসহায় শিক্ষার্থী উন্নয়ন সংস্থা (The development Organization for the helpless and poor students) সংক্ষেপে ডপস (DOHPS)| এখন ডপসের সদস্য সংখ্যা সহাস্রাধিক। ঝড়ে পড়া এসব শিক্ষার্থীরা এখন মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয়েও রয়েছে। উপজেলা প্রশাসন থেকে জেলা প্রশাসনেও ডপসকে নিয়ে চলছে আলোচনা। এদের মধ্যে কয়েকজন উচ্চতর শিক্ষা লাভ করে ভাল চাকরির সুযোগও পেয়েছেন।

স্বপ্নের এ ফেরিওয়ালার রয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা। তবুও চলছে তার নিরলস প্রচেষ্টা। এ কারণে ২০১৫ সালে তিনি অর্জন করেছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গর্বিত সৈনিক হিসেবে মহামান্য রাষ্ট্রপ্রতি কর্তৃক ‘বিশিষ্ট সেবা পদক’। এটি শুধু শ্রীবরদী না শেরপুরের অহংকার। এ অভিযানে যোগ দিয়েছেন অনেকে। সচেতন মানুষের ধারনা, এ অভিযানে সরকাারি, বেসরকারি, এনজিও বা সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে এলে আলোকিত হবে ঝড়ে পড়াদের ভাগ্য।

শাহীন মিয়া জানান, যারা বেকার তাদেরকে খুঁজে দেওয়া হয় কর্মসংস্থানের পথ। কখনো পায়ে হেঁটে, আবার কখনো বাইসাইকেলে যেতে হয় প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে। নজরে পড়ে মাধ্যমিক বা মাধ্যমিকে পা না রাখা অসংখ্য ছেলে মেয়ে। মাসের বেতনের বেশিরভাগ টাকা ব্যয় হয় তাদের পেছনে। দেওয়া হয় বই, খাতা, কলম, স্কুলব্যাগ, ড্রেসসহ নানা শিক্ষা উপকরণ।

ডপস সূত্র জানান, ২০০৭ সাল থেকে চলছে তার এ সংগ্রাম। প্রথমত একক প্রচেষ্টায় নিজ এলাকায় কাজ করেছেন। পর্যায়ক্রমে এ কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়ে গ্রাম থেকে ইউনিয়ন। পরে এর প্রসার ঘটে শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ীসহ জেলার সর্বত্র। ২০১১ সালে সমাজসেবা অধিদপ্তর হতে এ সংগঠনটি নিবন্ধন পায়।

ডপসের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক শাহীন মিয়া বলেন, ডপস থেকে দরিদ্র অসহায় শিক্ষার্থীদের দেওয়া হয় শিক্ষা উপকরণ। প্রত্যেকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ কার্যক্রম চালু করতে চান তিনি। তবে বিশাল অংকের অর্থের প্রয়োজন বলে মনে করেন ডপস সংশ্লিষ্ঠরা।

তাদের মতে, নালিতাবাড়ি, শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতি উপজেলার ঝড়েপড়া অনেকে ছিনিয়ে নিয়েছে বিশ্ব্যবিদ্যালয়ের দুর্লভ আসন। একদিকে আনন্দে বুক ফুলে ওঠে শাহীন মিয়াসহ ডপস ভক্তদের। তবে বিশাল অংকের খরচ যোগানো যেন দুশ্চিন্তার মেঘ দাঁড়ায় সামনে। যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে তারা সবাই তাকিয়ে থাকে শাহীনের দিকে। তিনি আর কতদিন তাদের চাহিদা পূরণ করবেন? তবে ওদের পরিবারের সামর্থ্য নেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর। এ জন্য প্রয়োজন সরকারি, বেসরকারি, এনজিও, সমাজের বিত্তবান ও দানশীল ব্যক্তিদের এগিয়ে আসা। এমনটাই মনে করেন ডপস সংশ্লিষ্ট্যসহ সচেতন মানুষরা।

মন্তব্য