kalerkantho

রবিবার । ২৬ মে ২০১৯। ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২০ রমজান ১৪৪০

গোয়ালন্দে প্রতারকচক্রের তিন সদস্য আটক

গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) প্রতিনিধি   

২১ এপ্রিল, ২০১৯ ১৪:১৯ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



গোয়ালন্দে প্রতারকচক্রের তিন সদস্য আটক

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সরকারি মোবাইলফোন নম্বর ক্লোন করে, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার মিথ্যে পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে বিকাশের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছিল প্রতারকচক্রের একদল দুর্বৃত্ত। প্রতারণার শিকার হন গোয়ালন্দ উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা মো. আবুল কালাম ও উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি এ বি এম বাতেন। পরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে লালমনিরহাট জেলা এলাকায় অভিযান চালিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতারকচক্রের তিন সদস্য মো. শিপুল ইসলাম, মো. আশরাফুল আলম ওরফে আশিক ও মো. শামীম আলীকে গ্রপ্তোর করে গোয়ালন্দঘাট থানা পুলিশ। গতকাল শনিবার তাদেরকে রাজবাড়ীর আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় ওই তিন প্রতারককে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন ওই আদালতের বিচারক। 

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের নলিয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মো. আবুল কালাম। তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক। পঞ্চম উপজেলা নির্বাচনের তৃতীয় ধাপে গত ২৪ মার্চ অনুষ্ঠিত গোয়ালন্দ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী ছিলেন। নির্বাচনের দুই দিন আগে ২১ মার্চ সকাল সাড়ে ১০টার দিকে গোয়ালন্দঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সরকারি মোবাইল নম্বর ০১৭১৩৩৭৩৬০১ ক্লোন করে অজ্ঞাত একদল দুর্বৃত্ত আবুল কালামের ব্যাক্তিগত মোবাইল ফোন নম্বরে কল করেন। এ সময় কলটি গ্রহণ করলে অপর প্রান্ত থেকে দুর্বৃত্তদলের একজন নিজেকে ওসি পরিচয় দিয়ে ব্যক্তিগত ০১৮২৩৮১১৯১১ নম্বরে কালামকে কল করতে বলে ওই ফোনকলটি কেটে দেয়। কিছুক্ষণ পর আবুল কালাম ০১৮২৩৮১১৯১১ নম্বরে কল করেন। এ সময় অজ্ঞাত ওই লোক কালামকে অপর একটি মোবাইল ফোন নম্বর ০১৮৭৯৭৫৯৬৪৩ দিয়ে বলেন, নম্বরটি এডিসি স্যারের। দ্রুত কল করে আপনি তার সঙ্গে কথা বলেন। পরে ওই নম্বরে কল করলে অপর প্রান্ত থেকে এডিসি নামধারী এক লোক কালামকে বলেন, উপজেলা নির্বাচনসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আমি রাজবাড়ী ডিসি স্যারের রুমে মিটিং করছি। আপনার নির্বাচন ফিল্ড খুবই ভালো। তাই মিষ্টি খাওয়ার জন্য আপনি আমাদের ৬০ হাজার টাকা দেবেন। আমরা আপনার নির্বাচনের কাজ করে দেব। এ সময় তিনটি বিকাশ নম্বর ০১৮৩০৬৯৭৫৪১, ০১৮৩০৬৮৫০৬৮ ও ০১৮৭১১১৭৭৫২ দিয়ে কালামকে টাকা পাঠাতে বলেন এডিসি নামধারী ওই দুর্বৃত্ত। এদিকে সরল বিশ্বাসে ভাইস চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী আবুল কালাম স্থানীয় বিকাশ এজেন্ট থেকে ওই তিন নম্বরে ভিন্ন ভিন্ন অঙ্কে মোট ৫০ হাজার টাকা পাঠান। বিকাশের মাধ্যমে ওই টাকা পাঠানোর কিছুক্ষণ পর এডিসি নামধারী অজ্ঞাত ওই ব্যাক্তি কালামকে ফোন করে আরো ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন। এতে কালামের মনে সন্দেহ সৃষ্টি হয়। মিথ্যে পরিচয় দিয়ে প্রতারণা করে বিকাশের মাধ্যমে ৫০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়টি তিনি বুঝতে পারেন। পরে ওই দিন (২১ মার্চ) সন্ধ্যায় গোয়ালন্দঘাট থানায় গিয়ে আবুল কালাম একটি সাধারণ ডায়েরী (জিডি) করেন। এদিকে উপজেলা নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী ছিলেন এবিএম বাতেন। তিনি গোয়ালন্দ উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি। নির্বাচনের দুই দিন আগে (২১ মার্চ) একই দিনে একই ভাবে ০১৮৬৭০৮৫৮৭৮, ০১৮৫৩১০৭৬৫১ ও ০১৬৪৩৫২৬০৫৩ নম্বরে বিকাশের মাধ্যমে বাতেনের কাছ থেকে ৬০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয় ওই প্রতারকচক্র। পরে বিষয়টি বুঝতে পেরে এ বি এম বাতেন ওই দিন রাতে গোয়ালন্দঘাট থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। এদিকে ডায়েরির বিষয়ে প্রাথমিক অনুসন্ধান ও তদন্তকালে ঘটনার সত্যতা পাওয়ার পর বিকাশ হেড অফিসের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট নম্বরগুলো ফ্রিজ করে দেয় পুলিশ। পরে গোপন খবর পেয়ে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দঘাট থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বে একদল পুলিশ লালমনিরহাট যায়। সেখানে জেলা পুলিশের (লালমনিরহাট) সহায়তায় গোয়ালন্দঘাট থানা পুলিশ অভিযান চালায়। এ সময় সংশ্লিষ্ট প্রতারকচক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতরা হলো লালমনিরহাট সদর থানার উত্তর সাপটানা মদনের চক গ্রামের আব্দুল হামিদের ছেলে মো. শিপুল ইসলাম (২৫), পাশের ইটাপোতা গ্রামের মো. শাহজাহান আলীর ছেলে মো. আশরাফুল আলম ওরফে আশিক (২৪), একই জেলার আদিতমারী থানার বড় কমলাবাড়ী গ্রামের মো. আবু তাহেরের ছেলে মো. শামীম আলী (৩৮)। এর আগে পুলিশি অভিযানের বিষয়টি বুঝতে পেরে ওই প্রতারকচক্রের অপর সদস্য মো. আব্দুল জলিল ওরফে ইমন (২৮), আরিফুজ্জামান ওরফে আরিফ (২৬) ও  মো. রবিউল ইসলাম ওরফে রাসেল এলাকা ছেড়ে দ্রুত পালিয়ে যায়। তাদের বাড়ি লালমনিরহাট জেলার বিভিন্ন থানা এলাকায়। গ্রেপ্তার ওই তিনজনকে গত শুক্রবার রাতে লালমনিরহাট থেকে গোয়ালন্দঘাট থানায় নিয়ে আসা হয়। সেখানে পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা গোয়ালন্দঘাট থানার ওসির সরকারি মোবাইল ফোন নম্বর ক্লোন করে, রাজবাড়ীর এডিসি নামধারী মিথ্যা পরিচয় দিয়ে উপজেলা নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী মো. আবুল কালাম ও এ বি এম বাতেনের কাছ থেকে বিকাশের মাধ্যমে মোট এক লাখ ১০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার কথা স্বীকার করে। এ ব্যাপারে ভুক্তভোগী মো. আবুল কালাম নিজে বাদী হয়ে গোয়ালন্দঘাট থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। 

গোয়ালন্দঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. এজাজ শফী ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে কালের কণ্ঠকে বলেন, গ্রেপ্তার ওই তিন যুবক সংঘবদ্ধ প্রতারকচক্রের সক্রিয় সদস্য। বিভিন্ন লোকের এনআইডি কার্ড ও ছবি সংগ্রহ করে বিকাশ অ্যাকাউন্ট করে। পাশাপাশি সুবিধামতো দেশের বিভিন্ন এলাকার গণ্যমান্য ব্যাক্তি ও সরকারি কর্মকর্তাদের সরকারি মোবাইল ফোন নম্বর সংগ্রহ করে। পরে সফটঅয়্যারের মাধ্যমে ওই নম্বরগুলো ক্লোন করে, সরকারি কর্মকর্তার মিথ্যে পরিচয় দিয়ে টার্গেট ব্যক্তিদের কাছ থেকে প্রতারণা করে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছিল। 
প্রতারকচক্রে জড়িত অপরদের গ্রেপ্তার করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার জোর চেষ্টা চলছে বলে তিনি জানান।

মন্তব্য