kalerkantho

চট্টগ্রামে বিপুল উন্নয়ন সত্ত্বেও ফের জলাবদ্ধতার আশঙ্কা

নূপুর দেব, চট্টগ্রাম   

২১ এপ্রিল, ২০১৯ ০২:১৩ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



চট্টগ্রামে বিপুল উন্নয়ন সত্ত্বেও ফের জলাবদ্ধতার আশঙ্কা

বন্দরনগরী চট্টগ্রামে গত ১০ বছরে একের পর এক মেগা প্রকল্পসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে শুধু সিডিএ ও ওয়াসাকে অন্তত ৩৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে বর্তমান সরকার। এ ছাড়া চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক), পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সহ সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে উন্নয়ন প্রকল্পে আরো কয়েক হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে বন্দরনগরীর দুঃখখ্যাত জলাবদ্ধতা নিরসনেই সরকার সিডিএ, ওয়াসা ও চসিককে ১০ হাজার কোটি বরাদ্দ দিয়েছে। আট হাজার কোটি টাকাই ব্যয় করবে সিডিএ। চট্টগ্রামবাসীর জন্য এই প্রকল্প ও বরাদ্দগুলো আশার খবর হলেও আশঙ্কার বিষয় হলো, এত উন্নয়ন সত্ত্বেও আসন্ন বর্ষা মৌসুমেও চট্টগ্রামে মারাত্মক জলাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে।

এই আশঙ্কার জন্য সিডিএর দিকে আঙুল তুলছে সিটি করপোরেশন। কারণ জলাবদ্ধতা নিরসনে মেগা প্রকল্পগুলো তারাই বাস্তবায়ন করছে। অথচ তাদের প্রকল্পের কাজে ধীরগতি চলছে। ফলে জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ ভরাট হয়ে যাওয়া খালগুলো এখনো খনন করা হয়নি।

জানা গেছে, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে দেশের প্রথম টানেল নির্মিত হচ্ছে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকায়। নগরে গত ১০ বছরে সিডিএ প্রায় ১০০ কিলোমিটার সড়ক চার লেন করেছে। বিপুল ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে একাধিক ফ্লাইওভার ও ওভারপাস।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, চট্টগ্রাম নগরে এই উন্নয়ন জোয়ারের মধ্যেও আসন্ন বর্ষা মৌসুমে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতে পারে। নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এগিয়ে এসে গত কয়েক বছরে যে চারটি মেগা প্রকল্প বরাদ্দ দিয়েছেন ইতিমধ্যে সিডিএর দুটি প্রকল্পের কাজ এক বছর আগে শুরু হয়। কিন্তু তার পরও এবার বর্ষায় জলাবদ্ধতার আশঙ্কার বিষয়টি নিয়ে নানামুখী আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। 

গত ২ এপ্রিল রাতের বৃষ্টির পর নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা হওয়ায় চলতি বছর বর্ষায় জলাবদ্ধতার আশঙ্কা ব্যক্ত করছেন সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলররা। পরদিন ৩ এপ্রিল চসিক সম্মেলন কক্ষে চসিক প্যানেল মেয়র চৌধুরী হাসান মাহমুদ হাসনীর সভাপতিত্বে জরুরি সভায় কাউন্সিলররা ২ এপ্রিল রাতে বৃষ্টিতে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে এবার বর্ষায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতার আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

চৌধুরী হাসান মাহমুদ হাসনী বলেন, নগরীর প্রধান খালসহ তিন ফুটের অধিক প্রশস্ত নালাগুলো পরিষ্কারের দায়িত্ব সিডিএর। জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার একটি বৃহত্ প্রকল্প দিয়েছেন। বিগত দেড় বছর যাবত্ সিডিএর জলাবদ্ধতা প্রকল্পের কাজ আশানুরূপ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। ফলে এ বছরও নগরীতে জলাবদ্ধতার আশঙ্কা করছি। কাউন্সিলররা দ্রুততম সময়ের মধ্যে নগরীর নালা-নর্দমা ও খাল পরিষ্কারের মাধ্যমে নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে উদ্যোগী হওয়ার দাবি জানান। 

তিনি জানান, জলাবদ্ধতার কারণে সৃষ্ট জনদুর্ভোগ লাঘবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নিজস্ব লোকবল দিয়ে নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে নালা-নর্দমা পরিষ্কার করে জলাবদ্ধতা নিরসনে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। 

চসিক সূত্র জানায়, নগরীতে ১১০০ কিলোমিটারের বেশি সড়ক রয়েছে। এসব সড়ক মেরামত ও সংস্কারে চসিকের নিজস্ব ও সরকার থেকে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা খরচ হয়। কিন্তু প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার কারণে ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে প্রায় এক শ কোটি টাকা ব্যয় হয়ে থাকে। অনেকের আশঙ্কা, গত এক বছরে নগরীতে সড়কের উন্নয়নে প্রায় হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। আসন্ন বর্ষায় এই উন্নয়ন পানিতে ভাসতে পারে!

জলাবদ্ধতার আশঙ্কার ব্যাপারে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্ষায় বৃষ্টিপাত ও জোয়ারের পানি একসঙ্গে থাকলে জলাবদ্ধতায় গতবারের চেয়ে বেশি ক্ষতি হতে পারে। সম্প্রতি জলাবদ্ধতার পর আমাদের সাধারণ ও সংরক্ষিত ওয়ার্ডের কাউন্সিলররা জরুরি বৈঠক করে আসন্ন বর্ষায় জলাবদ্ধতার আশঙ্কা করেছেন। কারণ নিজেদের এলাকায় বৃষ্টি হলে কী রকম পানি হয়ে নগরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতে পারে তা উঠে এসেছে। প্রতিবছর বর্ষার আগে নালা-নর্দমা-খালগুলো সিটি করপোরেশন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নসহ সংস্কারকাজ করে থাকে। কিন্তু জলাবদ্ধতা নিরসনে বৃহত্ প্রকল্পটি সিডিএর অধীনে।’

মেয়র বলেন, ‘আমরা বর্ষার আগে ইতিমধ্যে নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে আমাদের যে করণীয় অর্থাত্ নালা-নর্দমাগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা, তা আমরা করেছি। কিন্তু নালার পানি যাবে খাল হয়ে নদীতে। কিন্তু খালগুলো যদি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন না থাকে তা হলে নালার পানি কোথায় যাবে?’
নাছির বলেন, ‘আমরা চসিক থেকে সিডিএকে বারবার চিঠি দিয়ে জানিয়েছি, জলাবদ্ধতা নিরসনে আমাদের (চসিক) কোনো সহযোগিতা লাগলে জানানোর জন্য। কিন্তু এখনো পর্যন্ত আমরা এই ব্যাপারে কোনো সাড়া পাইনি।’

একই বিষয়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম গতকাল বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা (সিডিএ) ৮০০০ কোটি টাকায় দুটি প্রকল্পের কাজ শুরু করেছি। সিটি করপোরেশন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে অপর দুটি প্রকল্প দেওয়া হয়েছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে এসব প্রকল্পের কাজ শেষ না হলে উন্নয়নের সুফল পুরোপুরি আসবে না। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সময় দিতে হবে।’ তিনি দাবি করেন, গত বছরের চেয়ে এবার জলবদ্ধতা কিছুটা কম হবে।

চট্টগ্রাম ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, চট্টগ্রাম ওয়াসার ইতিহাসে গত ১০ বছরে এত উন্নয়ন প্রকল্প আগের অন্য কোনো সরকারের আমলে হয়নি। প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বিভিন্ন প্রকল্পের মধ্যে ইতিমধ্যে ৩৬০০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে। যার সুফল এখন নগরবাসী পাচ্ছে। কিন্তু এবারও জলাবদ্ধতা হলে চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ ব্যাহত হতে পারে।  

জানা যায়, জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএ যে দুটি প্রকল্প বরাদ্দ পেয়েছে তার মধ্যে বড় প্রকল্পটিতে ব্যয় হচ্ছে পাঁচ হাজার ৬১৬ কোটি ৪৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা। তিন বছর মেয়াদি এই প্রকল্পের কাজে অগ্রগতি মাত্র ১৫ শতাংশ। একই সংস্থার দুই হাজার ২৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে অপর মেগা প্রকল্পের (কর্ণফুলী নদীর তীরে নগরের চাক্তাই খালের মুখ থেকে কালুরঘাট পর্যন্ত) কাজের অগ্রগতি গত ফেব্রুয়ারি মাসে ছিল ৯ শতাংশ। 

এ ছাড়া নগরীর বহদ্দারহাট বারইপাড়া থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত ২.৯ কিলোমিটার দীর্ঘ ৬৫ ফুট প্রস্থ নতুন একটি খাল খনন প্রকল্প পেয়েছে চসিক। এতে ব্যয় হবে এক হাজার ২৫৬ কোটি ১৫ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। খালের দুই পাশে প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণ করা হবে। উভয় দিকে ২০ ফুট করে সড়ক এবং ছয় ফুট করে ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হবে। গত বছরের শেষ দিকে প্রকল্পটি একনেক থেকে অনুমোদন পেলেও গত চার মাসে কাজ শুরু হয়নি। প্রকল্পে  ভূমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ হলে আগামী তিন মাসের মধ্যে মূল কাজ শুরু হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। 

জলাবদ্ধতা নিরসনে সর্বশেষ প্রকল্পটি পেয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। সরকারের বর্তমান মেয়াদে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি চার বছর মেয়াদি এক হাজার ৬২০ কোটি ৭৩ লাখ টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম নগরীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ-জলমগ্নতা/জলাবদ্ধতা নিষ্কাশন উন্নয়ন প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পায়।

মন্তব্য