kalerkantho

মঙ্গলবার । ২১ মে ২০১৯। ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৫ রমজান ১৪৪০

স্বপ্ন আর ধুম্রজালে মুক্তিযোদ্ধা সেলিম হত্যা মামলা!

ঈশ্বরদী (পাবনা) প্রতিনিধি   

২০ এপ্রিল, ২০১৯ ২১:৫৩ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



স্বপ্ন আর ধুম্রজালে মুক্তিযোদ্ধা সেলিম হত্যা মামলা!

ঈশ্বরদীর বহুল আলোচিত রূপপুরের বীরমুক্তিযোদ্ধা মুস্তাফিজুর রহমান সেলিম (৬৭) হত্যার একটি মামলা। এই মামলাকে ঘিরে রূপপুর, পাকশীর বহু মানুষের অনেকগুলো স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা। কেউ স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে নিজের অবস্থান দৃঢ় করার, কেউ আগামীতে পাকশী ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়া, কেউ পাকশী পদ্মা নদীর বালু মহাল দখল করার, কেউ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে আধিপত্য বিস্তার করার, কেউ বা নিজের পরিবার থেকে হারিয়ে যাওয়া আওয়ামী রাজনৈতিকে পুনরায় নিজের কবজায় আনার, কেউ বা চাকরী হারানোর ভয়ে সত্য থেকে পিছিয়ে যাওয়া কিংবা চাকরীতে উন্নতি লাভ, কেউ বা মামলা থেকে বাঁচার জন্য মাথার উপর ছায়া হয়ে ভর করে আছে। আর মামলার তদন্তের নামে কালক্ষেপন ও পক্ষপাত আচরণ অব্যহৃত ঘটনা।

সব কিছু মিলে জাতির শ্রেষ্ঠ সূর্য্য সন্তান সেলিম হত্যা মামলাটি এখন শত স্বপ্ন ও ধুম্রজালে আটকে গেছে বলে মনে করছেন এলাকাবাসী। কারণ পরিবার ছাড়া আসলে বীর মুক্তিযোদ্ধা মুস্তাফিজুর রহমান সেলিম হত্যা মামলার প্রকৃত খুনিদের গ্রেপ্তার কেউ চাচ্ছেন না বলে দৃষ্টি লুকানো হচ্ছে। কারণ স্বপ্নবাজ এই চক্রটি সেলিম হত্যা মামলা নিয়ে কাঁদা ছোঁড়াছুড়ি শুরু করেছেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আর্থিক সুবিধা নিয়ে প্রভাব বিস্তার করে মামলাটিকে ভিন্ন খাতে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন বলে ইতোমধ্যে অভিযোগ উঠেছে।

এই হত্যা মামলায় সন্দেহভাজন কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাদের কয়েক দফা রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। ধারণ করা হয়েছিল এরাই হয়তোবা আসল হত্যাকারী। তাদের কঠোর শাস্তি দাবি করা হয়। কিন্তু সেলিম হত্যা মামলার পরিবর্তে অস্ত্র মামলায় কোর্টে চালান করা হয়েছে।

'আমরা গ্রামের সাধারণ মানুষ। নিহত মুক্তিযোদ্ধা সেলিমকে আমরা হৃদয় থেকে ভালবাসি। আমরা সমাজের এইসব প্রভাবশালীদের নাম প্রকাশ করতে পারছি না। তাই প্রিয় নেতার প্রকৃত হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পাকশী ফাঁড়ি পুলিশের ইনচার্জ (পরিদর্শক) শহিদুল ইসলামের পরিবর্তন দাবি করে পুলিশের উপ-মহাপরিদর্শক রাজশাহীসহ (ডিআইজি, রাজশাহী রেঞ্জ) পুলিশের বিভিন্ন কর্মকর্তা বরাবর গণস্বাক্ষরকৃত স্মারকলিপি প্রদান করেছি।'

গত বৃহস্পতিবার গণ স্বাক্ষরকৃত স্বারকলিপির সূত্র ধরে গত তিনদিন ধরে স্বাক্ষরকারী ও এলাকাবাসীসহ বিভিন্ন সূত্রে অনুসন্ধান চালিয়ে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, বীরমুক্তিযোদ্ধা সেলিম হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারকৃত আব্দুল্লাহ আল বাকি আরজু বিশ্বাস জেলখানায় আটক থেকে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে লিফলেট ছড়িয়ে দিয়েছেন।

সেখানে তিনি বলেন, পুলিশ স্থানীয় কিছু ব্যক্তির প্রভাবে তাকে গ্রেপ্তার করেছেন। তিনি সেলিম হত্যার প্রকৃত আসামিদের গ্রেপ্তার দাবি করেছেন। আর সেলিম হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার দাবিতে বীরমুক্তিযোদ্ধা, এলাকাবাসী ও নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নিকট স্মারকলিপি প্রদান করেছেন। একই সঙ্গে নিহত মুক্তিযোদ্ধা সেলিমের পরিবারের সদস্যরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে এই হত্যার বিচার চাওয়ার জন্য অনুমতি লাভের আশায় একটি আবেদনপত্র প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে প্রেরণ করেছেন। আর রূপপুরসহ পাকশী-ঈশ্বরদীতে সেলিম হত্যা মামলা নিয়ে ধুম্রজালের মধ্যে রয়েছে সকল মানুষ ও মিডিয়ার সাংবাদিকরা।

স্মারকলিপিতে স্বাক্ষরকারী এলাকাবাসীর মধ্যে মো. কামাল, শাহিনুর রহমান, পান্নান, মো. মধু ও সনজু জানান, প্রায় আড়াই মাস পূর্বে রূপপুরের কৃতি সন্তান বীরমুক্তিযোদ্ধা সেলিম নিজ বাড়ির দরজার সামনে আতঁতায়ীদের গুলিতে বিদ্ধ হয়ে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে শহরের পোস্ট অফিস মোড়ে মারা যান। রূপপুরের মানুষ শোকাহত হয়ে পড়েছেন। তার হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও ফাঁসির দাবিতে গোটা পাকশীবাসী একাট্টা। বিক্ষোভ মিছিল, পথসভা, মানববন্ধন, সড়ক অবরোধ, পোস্টারিংসহ নানা রকম কর্মসূচি পালন করে আসছেন। এরমধ্যে এলাকার একটি প্রভাবশালী চক্র হত্যা মামলাটিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছেন। 

তারা আরো জানান, মুক্তিযোদ্ধা সেলিম নিহতের ঘটনায় তার ছেলে তানভির রহমান তন্ময় বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামি করে থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। এই মামলায় সন্দেহবশত পাকশী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা এনামুল হক বিশ্বাসের ভাতিজা আব্দুল্লাহ আল বাকি আরজু বিশ্বাস, ছেলে রকি বিশ্বাস, রূপপুর নলগাড়ি এলাকার ফারুক আহমেদ লিখন ও নতুন রূপপুর তিনবটতলা এলাকার রাজিবকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। কিন্তু তাদের প্রত্যেকে কয়েক দফা রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ শেষ অস্ত্র মামলায় কোর্টে চালান করা হয়েছে। এসব মামলাগুলোর আবার ভিন্ন ভিন্ন তদন্ত কর্মকর্তা। এসব বিষয় জানতে পেরে আমরা মনে করছি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম প্রকৃত হত্যাকারীদের সঙ্গে আঁতাত করে আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করায় প্রকৃত আসামি গ্রেপ্তার হচ্ছে না। এই কারণে মামলার তদন্ত তার হাত থেকে নিয়ে গোয়েন্দা পুলিশ, পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) কিংবা অন্য কোনো চৌকশ পুলিশ কর্মকর্তাকে দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। যাতে প্রকৃত দোষীদের গ্রেপ্তার করে সেলিম হত্যাকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।

এলাকাবাসী ইদ্রিস, আলম বিশ্বাস, শফিকুল, মহাবুলসহ অন্যান্যরা জানান, অজ্ঞাতনামা আসামি করে দায়ের করা মামলার সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে না, মুক্তিযোদ্ধা সেলিমকে বিভিন্ন সময় হুমকি ধমকি দিয়ে ফেসবুকে বিভিন্ন ধরনের পোস্ট দেওয়ার আইডিধারীদের জিজ্ঞাসাবাদ, বিভিন্ন সময় স্থানীয় কিছু প্রভাবশালীদের দ্বারা লাঞ্ছিত হওয়ার বিষয়গুলো ক্ষতিয়ে দেখছেন না মামলার তদন্ত কর্মকর্তা; রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের চরের জমির ক্ষতি গ্রস্ত কৃষকদের সরকারি পাওনা টাকা জনিত কারণে সেলিম নেতাকে পরিকল্পিতভাবে পাকশী চেয়ারম্যান এনামুল হক বিশ্বাস খুন করিয়েছে বলে একটি চক্র প্রচার করছেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কেন এসব প্রচারকারীদের গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন না খুনের সময় আপনারা কি এনাম চেয়ারম্যানের সঙ্গে ছিলেন? আর কিভাবে জানলেন এনাম চেয়ারম্যান ও তার পরিবারের সদস্যরা সেলিম নেতাকে খুন করেছেন? তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করছেন না। বরং এসব প্রচারকারীদের সঙ্গে গভীর রাত পর্যন্ত অন্ধকারে বসে আড্ডা দিচ্ছেন। তাদের কথা মতো কাজ করছেন। তাতে মনে করছি মামলাটি ভিন্নখাতে চলে যাচ্ছে। তারা আরো বলেন, আমরা চাই খুনি যেই হোক না কেন তাকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হোক।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পাকশী ফাঁড়ির ইনচার্জ (পরিদর্শক) শহিদুল ইসলাম মুঠোফোনে কালের কণ্ঠের এই প্রতিনিধিকে জানান, মামলার তদন্তের স্বার্থে বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে বসতেই পারি। মামলায় পক্ষপাতমূলক আচরণ করার কোনো সুযোগ নেই। মামলা তদন্তকালে নানানজন নানান কথা বলতেই পারে। এতে বিচলিত হওয়ার কোনো কারণ আমি দেখছি না। কর্তৃপক্ষ চাইলে তদন্তকারী কর্মকর্তার পরিবর্তন হতেই পারে। তদন্তধীন মামলায় এর চেয়ে বেশি কিছু বলা সম্ভব নয় জানান এই কর্মকর্তা।

ঈশ্বরদী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) বাহাউদ্দিন ফারুকী নিহত মুক্তিযোদ্ধা সেলিম হত্যা মামলার বাদী তানভির রহমান তন্ময়ের বরাদ দিয়ে কালের কণ্ঠকে জানান, মামলার তদন্ত নিয়ে সন্তোষ্ট প্রকাশ করেছেন বাদী। 

গত বৃহস্পতিবার ঈশ্বরদী প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে মামলার বাদী তানভির রহমান তন্ময় সাংবাদিকদের জানান, এলাকার কারা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার পরিবর্তন ও খুনেদের গ্রেপ্তারের দাবিতে পুলিশেল ডিআইডি বরাবর স্মারকলিপি প্রেরণ করেছেন তা তিনি জানেন না। তবে তিনি ও তার পরিবার প্রকৃত খুনি, পরিকল্পনাকারী ও হুকুমদাতাকে দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি করেন।

এসব জানতে আওয়ামী লীগ নেতা ও পাকশী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এনামুল হক বিশ্বাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, রাজনীতিতে আমার উত্থানে ইর্ষান্বিত হয়ে এলাকার একটি মহল আমার ও আমার পরিবারের উপর মিথ্যাচার করে বেড়াচ্ছেন। আমার ছেলে রকি, ভাতিজা আরজু বিশ্বাস প্রতিবেশী লিখন ও রাজিবকে পুলিশ দিয়ে ধরিয়ে দিয়েছেন। পুলিশ তাদের কয়েক দফা রিমান্ডে এনে অমানষিক নির্যাতন করেও সেলিম হত্যা সম্পর্কে কোনো তথ্য না পেয়ে তাদের আটকে রাখতে অস্ত্র মামলা দিয়েছে।

তিনি আরো বলেন, চরের জমির ক্ষতি গ্রস্ত কৃষকদের টাকা দিচ্ছেন সরকার। সেখানে সেলিম নেতাসহ এলাকার অনেকেই বিরোধীতা করেছিলেন। কিন্তু তারপরও সরকার প্রায় দুই শতজনকে টাকার চেক প্রদান করেছেন। এলাকার কয়েকজন কোর্টে রিট করেছেন। মামলা চলমান রয়েছে। এই মামলায় সেলিমের কোনো কর্তত্ব নেই। তাহলে কেন তাকে হত্যা করা হবে। আর আমি কিংবা আমার পরিবারের কেউ হত্যার রাজনীতির সঙ্গে কোনো দিনই জড়িত নয়।

তিনি আরো বলেন, আমার আর কিছু পাওয়ার বা চাওয়ার নেই। মেম্বার থেকে এলাকারা মানুষের ভালবাসায় চেয়ারম্যান হয়েছি। এমপি কিংবা মন্ত্রী হতে চাই না। এখন আল্লাহ নিকট একটাই চাওয়া যেন বীরমুক্তিযোদ্ধা সেলিম হত্যার প্রকৃত খুনিদের গ্রেপ্তার ও ফাঁসি দেখতে পারি।

মন্তব্য