kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ মে ২০১৯। ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৮ রমজান ১৪৪০

সোনাগাজীর রাজনীতিতে রুহুল আমিনের ভেলকি

ফেনী প্রতিনিধি    

১৯ এপ্রিল, ২০১৯ ০৮:৩০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সোনাগাজীর রাজনীতিতে রুহুল আমিনের ভেলকি

সোনাগাজীর বিতর্কিত আওয়ামী লীগ নেতা ও সোনাগাজী সিনিয়র ফাজিল মাদরাসা পরিচালনা কমিটির সহসভাপতি রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। বিএনপি-যুবদলের নেতাদের সঙ্গে সখ্য রেখেও অল্প দিনে তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ পদে চলে আসতে সক্ষম হয়েছেন। দলের নেতাকর্মীরাও তাঁর পীড়ন থেকে নিস্তার পায়নি।

এলাকার লোকজন জানায়, সোনাগাজী উপজেলার চরচান্দিয়া ইউনিয়নের উচিয়াঘোনা কেরানি বাড়ির কোরবান আলীর ছেলে রুহুল আমিন। পড়াশোনা করেছেন তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত। তাঁর বড় ভাই আবুল কাশেম যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী। তিনি সেখানে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। আরেক ভাই আবু সফিয়ানও যুক্তরাষ্ট্রে যুবদলের রাজনীতি করেন।

আওয়ামী লীগ দলীয় সূত্রমতে, ১৯৯৭ সালে উপজেলা জাতীয় পার্টির সদস্য ছিলেন রুহুল আমিন। একই বছর সোনাগাজী ফরিদ সুপারমার্কেটের সামনের এক সমাবেশে উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ফয়েজুল কবিরের হাতে ফুল দিয়ে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। কিন্তু এরপর কখনো সক্রিয় ছিলেন না। রুহুল আমিন ২০০১ সালে চলে যান সৌদি আরব। সেখানে ট্যাক্সি চালাতেন। ২০০৯ সালে সোনাগাজী ফিরে আসেন। ২০১৩ সালে উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনের আগে ৪৪ নম্বর কাউন্সিলর মনোনীত হন। ২০১৫ সালে অনেকটা আকস্মিকভাবে সোনাগাজী ছাবের পাইলট হাই স্কুলের পরিচালনা কমিটির সভাপতি মনোনীত হন তিনি। এখান থেকেই সোনাগাজীতে তাঁর নানা অপকর্মের শুরু।

জানা যায়, গত বছরের শুরুতে উপজেলা আওয়ামী লীগের এক সভায় রুহুল আমিনকে প্রথমে উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করা হয়। গত জাতীয় নির্বাচনের আগে তাঁকে সভাপতি হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এরপর থেকে তিনি বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। এ সময় ছোট ফেনী নদীর মুহুরী প্রকল্প অংশের একটি বালুমহাল ও ছোট ফেনী নদীর সাহেবের ঘাট এলাকায় আরেকটি বড় বালুমহাল সাবেক সংসদ সদস্য রহিম উল্যাহর লোকজন নিয়ন্ত্রণ করতেন। কিন্তু উপজেলা সভাপতি হওয়ার পর রুহুল আমিন ও তাঁর লোকজন এ দুটি বালুমহালের দখল নেন। এখনো এ দুটি বালুমহালে কয়েক কোটি টাকার বালু রয়েছে বলে জানায় দলীয় সূত্র।

সাবেক সংসদ সদস্য রহিম উল্যাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, তিনি ও ডা. গোলাম মাওলা শহীদ ছাবের পাইলট হাই স্কুলের পরিচালনা কমিটিতে সভাপতি পদে প্রার্থী ছিলেন। কিন্তু সোনাগাজী বাজারের পশ্চিমাংশের একটি পক্ষ হঠাৎ করে রুহুল আমিনকে সেখানে নিয়ে যায় এবং অভিভাবক সদস্যসহ কয়েকজন সদস্যকে চাপ প্রয়োগ করে তাঁকে সভাপতি করতে বাধ্য করে।

রহিম উল্যাহ বলেন, তৎকালীন শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যান তাঁকে সভাপতি মনোনীত করলেও তিনি আর সভাপতির চেয়ারে বসতে পারেননি। তিনি অভিযোগ করে বলেন, রুহুল আমিন ও তাঁর লোকজন দফায় দফায় তাঁর ওপর হামলা করেছে।

আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগের নেতা হলেও রুহুল আমিনের সখ্য বেশি বিএনপি-যুবদলের নেতা ও তাঁদের ক্যাডারদের সঙ্গে। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন উপজেলা বিএনপি নেতা খুরশিদ আলম, রুহুলের চাচাতো ভাই চরচান্দিয়া ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মিয়াধন। অন্যদের মধ্যে আছে ইয়াবাসহ পুলিশের হাতে আটক দুলাল ওরফে বাটা দুলাল, ইয়াবা বিক্রেতা হেলাল, সিরাজ ওরফে সিরাজ ডাকাত, আবুল কাশেম ওরফে কাশেম মাঝি, সাবমিয়া, ফকির বাড়ির গোলাপ, আব্দুল হালিম সোহেলসহ বেশ কয়েকজন।

অভিযোগ রয়েছে, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের সদস্য আবুল কালাম বাহারকে গলা কেটে হত্যার চেষ্টা করে রুহুল আমিনের ক্যাডাররা। সোনাগাজী সদর ইউনিয়ন যুবলীগ নেতা স্বপন, চরদরবেশ ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হোসেন আহমেদ, মতিগঞ্জ ইউনিয়ন যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান লিটনসহ অনেকেই বিভিন্ন সময় হামলা-মারধরের শিকার হয়। অনুগত না হওয়ায় বাদ দেওয়া হয় পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আবসার ও উপজেলা আওয়ামী লীগের উপ-তথ্যসম্পাদক আব্দুর রহিম খোকনসহ বেশ কয়েকজনকে।

সোনাগাজী ইসলামীয়া সিনিয়র মাদরাসার একাধিক সূত্র জানায়, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সোনাগাজী পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর শেখ মামুন ওই মাদরাসা পরিচালনা কমিটির সদস্য ছিলেন। কিন্তু ছয় থেকে সাত মাস আগে নানা কৌশলে শেখ মামুনকে বাদ দিয়ে রুহুল আমিন সদস্য মনোনীত হন। এর কিছুদিনের মধ্যেই তিনি সহসভাপতি বনে যান। নানা অপকর্ম ঢাকতে এবং নিজের প্রভাববলয় বাড়াতে বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ উদ দৌলা রুহুলকে সদস্য হওয়ার সুযোগ করে দেন।

অভিযোগ রয়েছে, মাদরাসার মার্কেটের ১২টি দোকান, ভেতরের বিশাল পুকুরের মাছ চাষ ও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নানা উপায়ে আদায় করা বাড়তি টাকারও ভাগ পেতেন সহসভাপতি রুহুল ও আরেক সদস্য ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকসুদ আলম। এই ক্যাম্পাসের বাইরেও মাদরাসার রয়েছে জমিসহ কোটি টাকার সম্পদ।

মাদরাসার একজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সিরাজ তাঁদের প্রায়ই বলতেন, ‘শোনো, রুহুল, মাকসুদ এরা সবাই অশিক্ষিত। এরা থাকলে দুই রকম সুবিধা-একদিকে এরা কোনো বিষয়ে উচ্চবাচ্য করবে না। আবার সব সময় আমাদের পক্ষেও থাকবে।’

স্থানীয় আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফয়েজুল কবির সপদে বহাল থাকা অবস্থায় রুহুল আমিন কিভাবে সভাপতি হলেন তা অনেকেই জানেন না।

জানতে চাইলে ফয়েজুল কবির কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি পদ থেকে পদত্যাগও করিনি, আবার আমাকে বাদও দেওয়া হয়নি। তাহলে অন্য কেউ কিভাবে এ পদের পরিচয় দিতে পারে, তা বোধগম্য নয়।’

এ বিষয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতারা কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

জানতে চাইলে রুহুল আমিন কালের কণ্ঠ’কে বলেন, ‘উপজেলা ও জেলা কমিটির সভায় সর্বসম্মতিক্রমে আমাকে সভাপতি মনোনীত করা হয়। এ ছাড়া আগের সভাপতি চট্টগ্রামে অবস্থান করায় আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।’ বালুমহাল দখলের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বৈধভাবে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দুটি মহাল ইজারা নিয়েছি আমি।’ ক্যাডার লালন ও দলীয় কোনো নেতাকে পীড়নের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি।

মন্তব্য