kalerkantho

বুধবার । ২২ মে ২০১৯। ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৬ রমজান ১৪৪০

প্রতিবাদী নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যা

নুসরাতকে হত্যার পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয় ১২ জনের সভায় : শরিফ

পুলিশের তদন্তদল সোনাগাজীতে

ফেনী ও সোনাগাজী প্রতিনিধি   

১৮ এপ্রিল, ২০১৯ ০৯:৫১ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



নুসরাতকে হত্যার পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয় ১২ জনের সভায় : শরিফ

ফেনীর সোনাগাজীতে মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় সরাসরি জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে মো. আবদুর রহিম ওরফে শরিফ (১৯)। এ নিয়ে তিনজন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিল।

গতকাল বুধবার ফেনীর আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে শরিফ ১২ জনের সভায় নুসরাত হত্যার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয় বলে উল্লেখ করেছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

একই দিন হামলায় সরাসরি জড়িত মাদরাসার আলিম পরীক্ষার্থী কামরুন নাহার মণিকে পাঁচ দিন হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদের (রিমান্ডে) অনুমতি দিয়েছেন আদালত। মামলার এজাহারভুক্ত শেষ পলাতক আসামি হাফেজ আব্দুল কাদেরকে গ্রেপ্তার করেছে তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এ পর্যন্ত ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এ ছাড়া একই দিন পুলিশ সদর দপ্তরের একটি তদন্তদল সোনাগাজী আসে। নুসরাত হত্যাকাণ্ড ও স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় এই তদন্তদল পাঠানো হয়। তদন্তদলের নেতৃত্বে রয়েছেন উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি, মিডিয়া অ্যান্ড প্ল্যান) এস এম রুহুল আমিন। তিনি বলেছেন, নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, বিতর্কিত ভূমিকার জন্য এরই মধ্যে সোনাগাজী থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একটি মামলা হয়েছে।

হত্যা পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয় ১২ জনের সভায় : গতকাল বিকেল সাড়ে ৩টায় ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচার বিভাগীয় হাকিম শরাফ উদ্দিন আহমেদের আদালতে হাজির করা হয় আবদুর রহিম ওরফে শরিফকে। সেখানে সে দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। গত মঙ্গলবার রাতে ঢাকার কামরাঙ্গীর চর এলাকা থেকে শরিফকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

আদালত সূত্র জানায়, গতকাল বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে শরিফকে ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচার বিভাগীয় হাকিম ও সোনাগাজী আমলি আদালতের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিচারক শরাফ উদ্দিন আহমদের আদালতে আনা হয়। রাত সাড়ে ১০টায় জবানবন্দি গ্রহণ শেষ হয়। এরপর সাংবাদিকদের সামনে কথা বলেন পিবিআইয়ের চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ইকবাল।

মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, শরিফ স্বীকারোক্তিতে বলেছে, মাদরাসার অধ্যক্ষ (বর্তমানে বরখাস্ত) এস এম সিরাজ উদ দৌলার নির্দেশে ও পরামর্শে নুসরাতকে হত্যার জন্য গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগানো হয়। এ জন্য ২৮ ও ৩০ মার্চ দুই দফা কারাগারে থাকা সিরাজের সঙ্গে দেখা করে তারা। ৪ এপ্রিল সকালে ‘অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা সাহেব মুক্তি পরিষদের’ সভা করা হয়। ঘটনার আগের দিন ৫ এপ্রিল রাতে ১২ জনের এক সভায় হত্যার পরিকল্পনা চূড়ান্ত ও দায়িত্ব বণ্টন করা হয়। তার (শরিফের) দায়িত্ব পড়ে মাদরাসার ফটকে। সেখানে নুর উদ্দিন, আবদুল কাদেরও ছিল। মাদরাসার ছাদে বোরকা পরে ছিল শাহাদাত, জোবায়ের, জাবেদ, মণি ও পপি।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পিবিআইয়ের পরিদর্শক শাহ আলম সাংবাদিকদের বলেন, শরিফ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এরপর তাকে কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

পরিদর্শক শাহ আলম বলেন, মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুই আসামি নুর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীম এবং শরিফসহ তিনজন স্বীকারোক্তিতে একই ধরনের কথা বলেছে। তাদের স্বীকারোক্তি থেকেও মণির নাম উঠে আসে।

মণি ৫ দিনের রিমান্ডে : গতকাল মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক শাহ আলম কামরুন নাহার মণির সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন জানান। শুনানি শেষে ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচার বিভাগীয় হাকিম শরাফ উদ্দিন আহমেদ পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। গত মঙ্গলবার রাতে মণিকে সোনাগাজী পৌর এলাকার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইমান আলী মুহরির বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশগ্রহণকারী পাঁচজনের একজন মণি, যাকে পুলিশ খুঁজছিল।

মামলার অন্যতম প্রধান দুই আসামি নুর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীম গত রবিবার ঘটনার দায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় আদালতে জবানবন্দি দেয়। তাদের সেই জবানবন্দি থেকে গ্রেপ্তারকৃত মণির নাম উঠে আসে।

কাদের গ্রেপ্তার : এজাহারভুক্ত আসামি হাফেজ আবদুল কাদেরকে গ্রেপ্তার করার বিষয়টি গতকাল বিকেলে তার মামা মাহবুবুল আলম কালের কণ্ঠকে নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে রাজধানীর মিরপুর এলাকার ৬০ ফুট সড়ক এলাকা সংলগ্ন ছাপরা মসজিদের কাছে বড় ভাই আব্দুর রহিমের বাসা থেকে কাদেরকে আটক করা হয়।

কাদের ফেনীর আমিরাবাদ ইউনিয়নের পূর্ব সফরপুর গ্রামের মনছুর খান পাঠানবাড়ির আবুল কাসেমের ছেলে। তিনি সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার হেফজ বিভাগের শিক্ষক এবং একই মাদরাসার ফাজিল দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। মাদরাসার অধ্যক্ষ (বর্তমানে বরখাস্ত) এস এম সিরাজ উদ দৌলার অনুগত হিসেবে মাদরাসার ছাত্রাবাসে থাকতেন তিনি।

গত রবিবার নুর উদ্দিন ও শামীমের জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত উঠে আসে। তারা জানায়, শ্লীলতাহানির মামলায় গত ২৭ মার্চ গ্রেপ্তার হওয়ার পর সিরাজ ফেনী কারাগারে বসে নুসরাতকে হত্যার নির্দেশ দেয়। এরপর তার অনুগতরা পরিকল্পনা করে নুসরাতের ওপর হামলা করে। হামলায় সরাসরি পাঁচজন জড়িত ছিল। এ ছাড়া ১৩ জন ঘটনায় সম্পৃক্ত ছিল। তবে গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তদন্তকারী সংস্থা পিবিআই বলছে, নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় ২৫-২৬ জন জড়িত।

‘পুলিশের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হবে’ : পুলিশ সদর দপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি, মিডিয়া অ্যান্ড প্ল্যান) এস এম রুহুল আমিন বলেছেন, নুসরাত হত্যার ঘটনা তদন্তে পুলিশের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তিনি গতকাল বিকেলে সোনাগাজী সিনিয়র ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসায় নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনাস্থল পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন।

ডিআইজি রুহুল আমিনের নেতৃত্বে পুলিশ সদর দপ্তরের পাঁচ সদস্যের একটি তদন্তদল গতকাল সোনাগাজীতে আসে। এই দলে রয়েছেন একজন পুলিশ সুপার, দুজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও একজন পরিদর্শক। তাঁরা বিকেলে মাদরাসায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করার পর উত্তর চরচান্দিয়া গ্রামে নুসরাতের বাড়িতে যান এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় তাঁরা নুসরাতের কবর জিয়ারত করেন। পরে তাঁরা আবার ওই মাদরাসায় গিয়ে শিক্ষক ও কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলেন।

তদন্তদলের প্রধান সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা তদন্তকাজ শুরু করেছি। আমরা দুই দিন এখানে থাকব এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলব। একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন আমরা আইজিপি মহোদয়ের কাছে জমা দিতে পারব বলে আশা করছি।’

এক প্রশ্নের জবাবে ডিআইজি রুহুল আমিন বলেন, ‘ওই দিন কারা ওখানে দায়িত্বে ছিলেন, কারা কী ভূমিকা রেখেছেন তার সবই বিবেচনায় আসবে। সর্বোপরি একটি সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদন আমরা পেশ করার চেষ্টা করব।’

মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি : নুসরাত হত্যাকাণ্ডের বিচার ও সিরাজের ফাঁসির দাবিতে গতকালও ফেনী ও সোনাগাজীতে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এবং সংগঠন বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে।

মন্তব্য