kalerkantho

বুধবার । ২২ মে ২০১৯। ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৬ রমজান ১৪৪০

চট্টগ্রাম মহানগরে চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ বাস-মিনিবাস নেই

মানুষের দুর্ভোগ চরমে ‘আয় কম এবং শৃঙ্খলার অভাবে গাড়ি কম নামছে’

নূপুর দেব, চট্টগ্রাম   

১৮ এপ্রিল, ২০১৯ ০৩:২৬ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



চট্টগ্রাম মহানগরে চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ বাস-মিনিবাস নেই

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মহানগর চট্টগ্রামে এক বছর আগে ১৫টি রুটে চলাচলের জন্য বাস-মিনিবাসের চাহিদার সর্বোচ্চ সংখ্যা (সিলিং) ছিল এক হাজার ৫৪৫। এর মধ্যে বর্তমানে নগর আঞ্চলিক পরিবহন কমিটির (আরটিসি) অনুমোদিত বাস-মিনিবাসের সংখ্যা হচ্ছে ৯০১। চাহিদার বাকি ৫৮৬টি বাস-মিনিবাস এই নগরের সড়কে নামেনি। এর বিপরীতে ফিটনেস হারিয়ে সড়ক থেকে উঠে গেছে পুরনো অনেক বাস-মিনিবাস। এ অবস্থায় দেশের বন্দরনগর ও বাণিজ্যিক রাজধানীতে বাস-মিনিবাসের চাহিদার এক-তৃতীয়াংশই পূরণ হয়নি। এ ছাড়া চাহিদা অনুযায়ী সড়কগুলোতে হিউম্যান হলারের মতো হালকা গণপরিবহনের সংখ্যা আরো কমে গেছে। ফলে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে লাখ লাখ মানুষ। কিন্তু কোনো প্রতিকারের ব্যবস্থা নিচ্ছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

চাহিদার বিপরীতে বাস-মিনিবাসের এই নগণ্য হার এক বছর পরও বিরাজ করছে। এক সপ্তাহ আগে বিআরটিএ চট্টগ্রামের হিসাব অনুযায়ী, চট্টগ্রাম নগরে একটি রুট বেড়ে বর্তমানে ১৬টি সড়কে বাস-মিনিবাসের নির্ধারিত সিলিং এক হাজার ৫৪৫টি। এই পরিমাণ গাড়ি সড়কে চলাচল করার কথা। এর মধ্যে চট্টগ্রাম আরটিসির অনুমোদিত গাড়ির সংখ্যা এক হাজার ৪। এবার সড়কগুলোতে ৫৪১টি গাড়ির অভাব রয়ে গেছে। 

সব মিলিয়ে গত এক বছরে নগরের সড়কগুলোতে অনুমোদিত বাস-মিনিবাস বেড়েছে মাত্র ১০৩টি। একই অবস্থা হিউম্যান হলারসহ অন্যান্য হালকা গণপরিবহনের ক্ষেত্রে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব হালকা গণপরিবহনেও চাহিদা অনুপাতে সড়কে গাড়ি নেই। এ ছাড়া অনুমোদিত গণপরিবহনের অনেকগুলোই আবার সড়কে চলছে না। নগর গণপরিবহনে এ ধরনের চরম সংকটের কারণে রাত-দিন সমানে লাখো যাত্রীকে অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে। গণপরিবহনের এই সংকট দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করলেও সংকট নিরসনে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ এখনো নিচ্ছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। 

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, চট্টগ্রাম নগরে গণপরিবহন কম থাকলেও ব্যক্তিগত যানবাহন বেড়েছে অস্বাভাবিকভাবে। প্রতিদিনই সড়কে নামছে বিভিন্ন শ্রেণির নতুন নতুন যানবাহন। এসব গাড়ির আমদানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে রেজিস্ট্রেশনও (নিবন্ধন)। বিশেষজ্ঞদের মতে, যেভাবে হুহু করে ব্যক্তিগত যানবাহন বাড়ছে, এর সামান্য ভাগও বাড়ছে না গণপরিবহনে। ব্যক্তিগত পর্যায়ের যানবাহন যত বাড়ছে ততই সড়কে যানজট বাড়বে। যে যেভাবে পারছে সেভাবে সড়কে গাড়ি নামাচ্ছে। এতে শৃঙ্খলার বাইরে চলে যাচ্ছে সড়ক ব্যবস্থা। তাদের অভিমত, গণপরিবহন না বাড়লে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে না। 

অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৮৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে গত বছরের (২০১৮) ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিআরটিএ চট্টগ্রাম নগরে দুই লাখ ২৩ হাজার ৫১৫ গাড়ির রেজিস্ট্রেশন হয়েছে। অর্থাত্ গত ৩০ বছরে নিবন্ধন হওয়া বিভিন্ন শ্রেণির এসব যানবাহনের মধ্যে এক হাজার ৬৬৯টি বাস এবং দুই হাজার ৫৭৫টি মিনিবাসের নিবন্ধন হয়। অন্যদিকে কার ৩৩ হাজার ২৬১টি, মোটরসাইসেল এক লাখ আট হাজার ৪২টি, জিপ তিন হাজার ৮৮৪টি, মাইক্রোবাস ১৩ হাজার ৮১৭টি, সিএনজি অটোরিকশা ১৩ হাজার, অটো টেম্পো তিন হাজার ৪৪০টি, হিউম্যান হলার তিন হাজার ৫২৬টি নিবন্ধন হয়। এর বাইরে ট্রাকসহ ১১ শ্রেণির যানবাহন নিবন্ধন করা হয়েছে। 

গত ৩০ বছরের হিসাবে দেখা যায়, প্রতিবছর গড়ে ৫৫টি বাস এবং ৮৫টি করে মিনিবাস নিবন্ধন নিয়ে সড়কে নেমেছে। অন্যদিকে ব্যক্তিগত যানবাহনের নিবন্ধন হার প্রতিবছর বেড়েছে হুহু করে।  

এদিকে এক বছর আগে (২০১৮ সালের ৩ মার্চ আরটিসি সভায়) হিউম্যান হলার (হালকা যান) অনুমোদন ছিল এক হাজার ২৩৫টি। গত সপ্তাহের তথ্য অনুযায়ী, এই গণপরিবহন আগের থেকে কমে এখন এক হাজার ১১৭টিতে এসে দাঁড়িয়েছে। নগরের ১৮টি রুটে হিউম্যান হলার গাড়ির সিলিং নির্ধারণ রয়েছে এক হাজার ৪৫৬টি। এর মধ্যে নগর আরটিসি থেকে অনুমোদন নিয়েছে এক হাজার ১১৭টি। অর্থাত্ চাহিদা থেকে ৩৩৯টি গাড়ির অভাব রয়েছে। তবে অটো টেম্পোর অনুমোদন ও সিলিং দুটিই বেড়েছে। এর মধ্যে গত এক বছরে অটো টেম্পো অনুমোদন ২১০টির মধ্যে সিলিং বেড়েছে ১৫০টি। 

সর্বশেষ গত চার বছরে বিআরটিএ চট্টগ্রাম নগরে বিভিন্ন শ্রেণির যানবাহনের নিবন্ধন বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। প্রতিবছরই যানবাহন নিবন্ধন কয়েক হাজার করে বেড়েছে। এর মধ্যে বেশি বেড়েছে গত দুই বছরে। ২০ শ্রেণির যানবাহনের মধ্যে ২০১৫ সালে মোট যানবাহন নিবন্ধন হয়েছিল ১৩ হাজার ৩১৪টি। এ ছাড়া ২০১৬ সালে ১৭ হাজার দুটি, ২০১৭ সালে ২১ হাজার ৪৩৪টি এবং ২০১৮ সালে ২৯ হাজার ৩৯৩টি যানবাহনের নিবন্ধন হয়। এসব যানবাহনের বেশির ভাগই ব্যক্তিগত গাড়ি।

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য : এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ এ কে এম রেজাউল করিম গতকাল বুধবার রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, চট্টগ্রামে গণপরিবহন নেই বললেই চলে। গণপরিবহনের সংকট না কাটলে ছোট গাড়ি আরো বাড়বে। একটি প্রাইভেট কারে মোট চারজন বসতে পারে। একটি বাসের সমপরিমাণ জায়গায় তিনটি কার থাকছে। একটি বাসে ৫০ জনের অধিক যাত্রী থাকে। সে হিসেবে ১২ জনের তিনটি কার ৫০ জনের একটি বাসের জায়গা দখল করছে। গণপরিবহন সংকট সমাধানে প্রাইভেট সেক্টর ও পরিবহন মালিক সংগঠনগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।’

বিআরটিএ চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের উপ-পরিচালক (প্রকৌশল) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, ‘গণপরিবহন সংকট নিরসনে সরকার বিভিন্নভাবে উদ্যোগ নিয়েছে। চট্টগ্রাম নগর আরটিসির সভায় আমরা বারবার আহ্বান জানিয়ে আসছি সিলিং যেখানে খালি আছে সেখানে নিজেদের পছন্দমতো রুটে কেউ গণপরিবহন নামাতে চাইলে তাদের সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা দেওয়া হবে। যাঁরা নতুন গাড়ি নামাতে চান তাঁদেরও সহযোগিতা করা হবে।’ 

চট্টগ্রাম জেলা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি মঞ্জুরুল আলম চীেধুরী মঞ্জু বলেন, নগরে বাস-মিনিবাসে যে পরিমাণ আয় হওয়ার কথা ছিল, সেভাবে না হওয়ায় গণপরিবহন বাড়ছে না। বরং দিন দিন বিভিন্ন রুটে আগের থেকে গণপরিবহন কমছে। 

চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন পরিবহন মালিক গ্রুপের মহাসচিব ও আরটিসি (নগর) সদস্য বেলায়েত হোসেন বেলাল বলেন, সংকটের কারণ হলো অনুমোদিত যানবাহনগুলো নিয়ম নেমে চলাচল করছে না। গণপরিবহন হিসেবে অনুমোদন নেওয়া অনেক বাস-মিনিবাস বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভাড়ায় চলছে। এতে সংকট হচ্ছে গণপরিবহনের।

মন্তব্য