kalerkantho

বুধবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৩ রবিউস সানি     

বস্তা বস্তা টিএসপি নষ্ট

মোস্তফা মনজু, জামালপুর    

২৪ মার্চ, ২০১৯ ১২:১৯ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বস্তা বস্তা টিএসপি নষ্ট

জামালপুরে বিএডিসির সারের গুদামে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ সার মজুদ রাখাসহ ঘাটে ঘাটে নানা অব্যবস্থাপনার কারণে বিদেশ থেকে আমদানীকৃত টিএসপিসহ বিভিন্ন রাসায়নিক সার জমাট বেঁধে নষ্ট হতে শুরু করেছে। সম্প্রতি স্থানীয় একজন ডিলারের ১০০ বস্তা টিএসপি সারের মধ্যে ৩৮ বস্তা জমাটবাঁধা সার সরবরাহের অভিযোগ উঠলে এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে তোলপাড় শুরু হয়। ডিলারদের সংগঠনের পক্ষ থেকে সার জমাটবাঁধার ঘটনা তদন্ত করে ভালো সার সরবরাহের দাবি জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিএডিসি শ্রমিকদের দিয়ে হাতুড়ির সাহায্যে জমাট সারের টুকরো ভেঙে ফের ডিলারদের দিচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের সারের চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) মাধ্যমে বিএডিসি মরক্কো ও তিউনিসিয়া থেকে টিএসপি, কানাডা ও বেলারুশ থেকে এমওপি এবং সৌদি আরব ও মরক্কো থেকে ডিএপি সার আমদানি করে থাকে। বিদেশ থেকে এই তিন প্রকারের খোলা (লুজ) সার জাহাজে করে চট্টগ্রাম বন্দরে খালাস করা হয়। বিদেশি কম্পানিগুলো তাদের চুক্তি অনুযায়ী চট্টগ্রাম বন্দর পর্যন্ত সার পৌঁছে দেয়। বন্দরের নির্ধারিত স্থানে খোলা সারগুলো স্তূপ করে রাখা হয়। পরে সেখানে বিএডিসির নির্ধারিত ব্যাগিং ও পরিবহন ঠিকাদার ৫০ কেজি ওজনের বস্তাজাত করে সারের বস্তাগুলো আবার স্তূপ করে রাখে। পরে জেলা-উপজেলার গুদামগুলোয় সার  পাঠানো হয়। এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই সারের বস্তায় ওজনে কম সার দেওয়া এবং সারের গুণগত মান নষ্ট হয় বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

মেলান্দহ উপজেলার বিএডিসির ডিলার মো. সালাহ উদ্দিন পারভেজ জানান, তিনি তাঁর ফেব্রুয়ারি মাসের বরাদ্দের পাঁচ টন অর্থাৎ ১০০ বস্তা টিএসপি সার গুদাম থেকে উত্তোলন করেন। ট্রাকভর্তি টিএসপি সারের বস্তাগুলো তাঁর দোকানের গুদামে নামানোর সময় কয়েকটি জমাটবাঁধা বস্তা নজরে আসে। একে একে জমাটবাঁধা ৩৮ বস্তা টিএসপি সার পাওয়া যায়। টিএসপি সার সাধারণত খুদে দানাদার হয়ে থাকে। কিন্তু জমাটবাঁধা বস্তা খুলে দেখা যায় বড় বড় পাথরের বা মাটির টুকরার মতো শক্ত হয়ে গেছে। ডিলার সালাহ উদ্দিন পারভেজ এই জমাটবাঁধা সারগুলো স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষি কর্মকর্তাকে ডেকে এনে দেখান। পরে তাঁদের পরামর্শে জমাটবাঁধা ৩৮ বস্তা টিএসপি সার বিএডিসির গুদামে ফেরত পাঠানো হয়। বিএডিসি কর্তৃপক্ষ জমাটবাঁধা সারের বস্তার পরিবর্তে ভালো বস্তার সার দেওয়ার আশ্বাস দেন।  

জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলায় পাঁচ হাজার মেট্রিক টন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন বিএডিসির এই গুদামটি স্থাপিত হয় ১৯৮৩ সালে। বর্তমানে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ পরিমাণ সার এই গুদামে মজুদ রয়েছে। বিএডিসির তথ্য মতে, গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এই গুদামে বিদেশ থেকে আমদানীকৃত টিএসপি, এমওপি ও ডিএপি সার মজুদ রয়েছে প্রায় ১০ হাজার ৮০ টন। এসব সার গুদামে মজুদ থাকে টানা ছয় মাস বা এরও বেশি সময় ধরে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, প্রতিটি ৫০ কেজি ওজনের সারের বস্তা সারি করে গাদাগাদিভাবে বিশাল উঁচু করে রাখা হচ্ছে। একেকটি সারিতে ওপর থেকে মেঝে পর্যন্ত ৩৪টি করে বস্তা রাখা হয়েছে। প্রতিটি সারিতে পৌনে দুই টনের ভারের চাপে থাকে। এতে করে সারগুলো জমাটবাঁধা বা এর গুণগত মান নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে বেশি।

ডিলার মো. সালাহ উদ্দিন পারভেজ অভিযোগ করে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জমাটবাঁধা সারগুলোর গুণগত মানও নষ্ট হয়ে গেছে। কৃষকরা এই সার কিনতে চাইবে না। ফলে আমিসহ ডিলারদের ব্যবসায় আর্থিক লোকসান গুনতে হবে। তিনি অভিযোগ করেন, বিএডিসির কর্মকর্তাদের যোগসাজশে কৌশলে রাতের বেলা শ্রমিকদের নিয়ে জমাটবাঁধা বস্তা খুলে হাতুড়ি দিয়ে জমাট সারের টুকরা ভেঙে ফের বস্তাজাত করে ভালো সারের সঙ্গে মিশিয়ে রাখা হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে কৌশলে ডিলারদের প্রতি ট্রাকেই ৮-১০ বস্তা করে জমাটবাঁধা বা নষ্ট হওয়া সার তুলে দেওয়া হচ্ছে।

এ নিয়ে কথা বলতে গেলে জমাটবাঁধা সারের গুণগত মান নষ্ট না হওয়ার কথা জানান কর্মকর্তারা। এই গুদামে সার মজুদ রাখার কোনো নিয়ম মানা হয় না। গাদাগাদি করে সার রাখা হয়। সঠিক তদন্ত করা হলে গুদামে শুধু টিএসপিই নয়, ডিএপি ও এমওপির শত শত জমাটবাঁধা সারের বস্তা পাওয়া যাবে।’

মেলান্দহ বিএডিসির সহকারী পরিচালক (সার) মো. জাহিদুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সার জমাটবাঁধলেও এর কোনো গুণগত মান নষ্ট হয়নি। আমরা ওই ডিলারের জমাটবাঁধা ৩৮ বস্তা টিএসপি সার ফেরত নিয়ে তাঁকে ভালো সার দিতে চেয়েছি।’ জমাটবাঁধার কারণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিএডিসির পরিবহন ঠিকাদারের মাধ্যমে আমরা সার গুদামজাত করি। রেলওয়ের ওয়াগনে বা ট্রাকে করে সার গুদামে আসার পর আমরা বস্তা ঠিক আছে কি না তা দেখে নেই। তবে হাজার হাজার বস্তা সার আসতেছে। সেখানে সব বস্তা পরীক্ষা করা সম্ভব নয়।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা