kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

নোম্যান্সল্যান্ডের বাইরে আলাদা আলাদা অনুষ্ঠানের দাবি

নিরাপত্তার কড়াকড়িতে অনেকেই তিক্ত মন নিয়ে ফিরে গেলেন

জামাল হোসেন, বেনাপোল (যশোর) থেকে   

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:৫৩ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নিরাপত্তার কড়াকড়িতে অনেকেই তিক্ত মন নিয়ে ফিরে গেলেন

ছবি: কালের কণ্ঠ

একটা দিনের জন্য ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানে কাঁটাতার যেন সরে গেল চোখের সামনে থেকে। বেনাপোল-পেট্রাপোলের ‘নোম্যান্সল্যান্ডে’ দু’দেশের আবেগতাড়িত মানুষের মেলামেশায় সীমান্তও যেন একদিনের জন্য অদৃশ্য হয়ে গেল। একটু ছন্দপতনও অবশ্য রয়ে গেল এই মিলনমেলায়। তিক্ত মন নিয়েই ফিরতে হল অনেককেই। প্রতি বছর ভাষা দিবসে বেনাপোল ও পেট্রাপোল সীমান্তে আলাদা করে অনুষ্ঠান করত বাংলাদেশ ও ভারত।  সেখানে মিছিল, গান হতো। ভিড়ও উপচেপড়ত। কিন্তু এবার একটি মঞ্চে দু‘দেশের অনুষ্ঠান হওয়ায় স্থান সংকুলানের অভাবে হাজার হাজার মানুষকে দুরে ঠেলে দেয় দু‘দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। সকলের দাবি নোম্যান্সল্যান্ডের বাইরে দু‘দেশে আলাদা আলাদা অনুষ্ঠান হলে ভালো হয়।

যশোরের শাহিনুর রহমান পরিবারসহ এসেছিলেন অনুষ্ঠানে। বিজিবি‘র বাধার মুখে ঢুকতে পারেনি নোম্যান্সল্যান্ডে। দুঃখ মন নিয়ে ফিরে গেলেন শাহিনুরের মতো নাভারনের জাহাঙ্গীর, পলাশ, সাব্বির ঝিকরগাছার আজিজুর, রেজাউল, জসিম শার্শার আব্দুল্লাহ, হামিদুল, সৈকতরা। অতিরিক্ত মানুষের চাপে বিজিবি সীমান্তের প্রবেশের দুটি গেটই বন্ধ করে দেয়। 
যার ফলে নোবেলের গান শোনা দুরে থাক অনুষ্ঠানস্থল পৌঁছাতে পারেনি তারা। আক্ষেপের শেষ নেই তাদের। তেমনি ক্রাচে ভর দিয়ে এসেছিলেন ছিয়াশি বছরের গীতা সিংহ। তাঁর বাড়ি কাঁকিনাড়া। অধুনা বাংলাদেশে তাঁর জন্ম। ১৯৬৮ সালে বিবাহ সূত্রে ভারতে থাকা। 

কয়েকবারই মাত্র বাংলাদেশে আসার সুযোগ ঘটেছে তাঁর। ফেলে আসা দেশের স্মৃতি আজও তাঁকে টানে। ভেবেছিলেন ফেলে আসা সেই দেশকে কাছ থেকে দেখবেন। কিন্তু তাঁর স্বপ্ন অধরাই থাকল। বললেন, ‘‘ও দেশের মাটি ছুঁয়ে দেখা হলো না। কারো সঙ্গে কথা বলতেও পারলাম না। আসাটাই বৃথা হলো।’’ ভারতীয় বিএসএফ গেটে পার হতে দেয়নি তাকে।
কেন এই অনুভূতি? অনেকেই জানালেন, কারণটা হল নিরাপত্তার কড়াকড়ি। পুলওয়ামায় জঙ্গি হানার পরে বৃহস্পতিবার দু’দেশের সীমান্তেই কড়া নিরাপত্তা ছিল। বহু মানুষ ‘নোম্যানসল্যান্ডে’ ঢুকতেই পারেননি। এপারের বিজিবি ও পুলিশ বাংলাদেশীদের বেনাপোল সীমান্তেই আটকে দেয়। পুলিশের সঙ্গে তাঁদের ধস্তাধস্তিও হয়। তেমনি ওপারের বিএসএফ, আরএফএল, পুলিশ ভারতীয়দের ঢুকতেই দেয়নি। বিএসএফ কয়েকবার বাংলাদেশীদের ধাওয়াও দিয়েছে। অনুষ্ঠান মঞ্চের সামনে দু’দেশের মানুষ বসতে পারলেও ব্যারিকেড দিয়ে আলাদা করে রাখা হয়েছিল তাঁদের। নিরাপত্তারক্ষীরা পাহারা দিচ্ছিলেন।

মঞ্চের সামনে দর্শক সারিতে বসা কথা হচ্ছিল খাইরুন নাহারের সঙ্গে। মধ্যবয়সী গৃহবধূটি থাকেন শার্শায়। তাঁর উপলদ্ধি, “বছর তিনেক ধরে এই দিনটায় আসছি বেনাপোলে। কিন্তু এবার যেন অনেক বেশি উন্মাদনা চোখে পড়েছে। নতুন প্রজন্মের সংখ্যাও অনেক বেড়েছে।” সেই প্রজন্মেরই ছাত্রী শান্তা, নাজমুন নাহার, বৈশাখী, মরিয়মরা। বাংলাদেশের ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়াশোনা করে তারা। সকালে স্কুলে শহিদ বেদিতে মালা দিয়ে স্কুলের পোশাকেই চলে এসেছে নোম্যান্সল্যান্ডে। তাদের কথায় ‘ইংরেজি স্কুলে পড়ছি তো কী হয়েছে। বাংলাই তো আমাদের মাতৃভাষা।’ এই বোধটাই যেন গোটা অনুষ্ঠানের মূল চালিকাশক্তি। মঞ্চে বাংলা ব্যান্ডের গান হচ্ছিল। বাংলাদেশি তরুণ-তরুণীরা পাজামা-পাঞ্জাবি, শাড়িতে সেজেগুজে মঞ্চে দাঁড়িয়ে গাইছিলেন নানা দেশাত্মবোধের গান। তাঁদেরই এক জন বললেন, “আমরা মূলত বাংলা গান শুনি, গাই। কিন্তু এই দিনটায় অন্য ভাষার গান শোনা তো দূরের কথা কথা বলতেও ইচ্ছে করে না।”

নোম্যান্সল্যান্ডেই যৌথভাবে একটি মঞ্চ তৈরি করে ভারত এবং বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পালিত হলো ‘ভাষাদিবস’। সমবেত মানুষের কারো হাতে ছিল বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা। কারো কারো গালে আঁকা বর্ণমালা। মাথায় ছিল ‘অমর একুশে’ লেখা ফেট্টি। দু’দেশের মন্ত্রী-সাংসদেরা কাঁটাতারের বিভেদ তুলে দেওয়ার দাবি তুললেন ওই মঞ্চ থেকে। হলো কোলাকুলি, মিষ্টি বিতরণ, শহীদ বেদিতে মাল্যদান করলেন দু’দেশের অতিথিরা। 
বাংলাদেশের ভাষা সৈনিক শামসুল হুদা, বেনাপোলের শিক্ষানুরাগী মাস্টার শহিদুল্লাহ ও আবু তালেব এবং ভারতের কবি মলয় গোস্বামী ও স্বপন চক্রবর্তীকে ‘মৈত্রী পদক’ দিয়ে সম্মান জানানো হয়।

বাংলাদেশের সাংসদ শেখ আফিলউদ্দিন বলেন, ‘দু’দেশের সরকারের কাছে আমার আবেদন, কাঁটাতার তুলে দিন। ভিসা-পাসপোর্ট ছাড়াই যাতে দু’দেশের মানুষ যাতায়াত করতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করুন।’ সীমান্তের উৎসবের প্রধান অতিথি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক বলেন, ‘প্রজন্ম পরম্পরায় আমরা এই উৎসব এগিয়ে নিয়ে যাব। দু’দেশের মানুষের হৃদয়ের আবেগ যে কাঁটাতার দিয়ে বেঁধে রাখা সম্ভব নয়, এখানে না এলে তা বোঝা যাবে না।’

এবারই প্রথম দু’দেশের শিল্পীরা মঞ্চে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে দু’দেশের জাতীয় সঙ্গীত গাইলেন। শিল্পী দীপান্বিতা সাহা বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মঞ্চে জাতীয় সঙ্গীত গাইতে পেরে ভাগ্যবান মনে হচ্ছে।’ তবে উৎসব মাতিয়ে দিয়েছেন জনপ্রিয় গায়ক মাইনুল আহসান নোবেল। ছিল রক্তদান শিবির। বেনাপোলের এমদাদুল বলেন, ‘ভারতের মানুষের জন্য রক্ত দিতে পেরে ভালো লাগছে। রক্তের তো কোনো দেশ-জাতি হয় না।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা