kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জুন ২০২২ । ১৪ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৭ জিলকদ ১৪৪৩

ইয়াবা কারবারিদের আত্মসমর্পণ

সবার ঘুম ভেঙেছে এবার

তোফায়েল আহমদ, কক্সবাজার ও জাকারিয়া আলফাজ, টেকনাফ   

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:৪৮ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সবার ঘুম ভেঙেছে এবার

ছবি: কালের কণ্ঠ

‘তখন সবাই ইয়াবা ব্যবসা করত, পাড়ায় খুব কম পরিবার ছিল যারা ইয়াবা ট্যাবলেটের ব্যবসা করত না। সবাই রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার মতো অবস্থা। নিজেদের গরিব অবস্থা দেখে ছেলেও এক সময় এ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে টাকার লোভে। অনেক টাকা আয় করেছে, শুধু আমার ছেলে একা নয়, পাড়া পড়শী সবাই কামাইছে (আয় করছে)।

বিজ্ঞাপন

কেউ কাউকে বাধা দেয়নি সে সময়, তাই আমরাও ছেলেকে বাধা দিইনি। বাধা কেন দেব, পাড়ার সব ভালো মানুষগুলো এ কাজ করেছে। কেউ বলত না যে এটি অপরাধ। ’ কথাগুলো বলেছেন, গত শনিবার টেকনাফ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আত্মসমর্পণকারী ইয়াবা কারবারি সাবরাং ঝিনা পাড়ার আলী আহমদের বোন রুবিনা বেগম।  
 
তিনি বলেন, ‘সে সময় আমরা বুঝিনি ইয়াবা ব্যবসা একটি ঘৃণিত কাজ। আজকে মন্ত্রী সাহেবে এবং পুলিশের প্রধানের কথায় আমাদের ঘুম ভেঙেছে। আজ বুঝতে পেরেছি আমরা পরোক্ষভাবে ইয়াবা ব্যবসায়ে পরিবারের সদস্যদের সহযোগীতা দিয়ে মারাত্মক ভুল করেছি। ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবারের কোনো সদস্যকে ইয়াবার মতো এই ঘৃণিত কাজে জড়াতে দেব না। ’
 
গত শনিবারের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে দর্শক হয়ে ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে সকাল থেকে গ্রাম-গঞ্জ থেকে হাজার হাজার লোকসমাগম হয়। সকাল ১০টার আগেই অনুষ্ঠানস্থল কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। অনেক দর্শক মাঠে ঠাঁই না পেয়ে আশপাশের বিভিন্ন ভবন ও মার্কেটের ছাদে বসে অনুষ্ঠান উপভোগ করেন। অনুষ্ঠানে অন্য সবার মতো আত্মসমর্পণকারী ইয়াবা কারবারিদের পরিবারের সদস্যরাও এসেছিলেন। তারা হাজার হাজার মানুষের সামনে তাদের ইয়াবা কারবারী স্বজনদের আত্মসমর্পণে অনেকটা লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়ে পড়েছিলেন।
 
আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে ইয়াবা কারবারিদের পুনরায় পুলিশ হেফাজতে নিয়ে যাওয়ার সময় পরিবারের সদস্যরা তাদের এক নজর দেখতে ভিড় করেন। এ সময় অনেকে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। এ সময় আত্মসমর্পণকারী টেকনাফ পৌরসভার নাইট্যংপাড়ার নুর হাবিবের মা জিন্নাত বেগম বলেন, ‘এত মানুষের সামনে ছেলে ইয়াবা কারবারি হিসেবে আত্মসমর্পণ করছে, মা হিসেবে আমার খুব লজ্জা লাগছে। তবে একটু স্বস্তি পাচ্ছি যে, ছেলে এখন থেকে আর ইয়াবা ব্যবসা করবে না। ’
 
টেকনাফ সদর ইউনিয়নের হাতিয়ার ঘোনার বাসিন্দা ইয়াবা কারাবারি মো. হাসানকে দেখতে এসেছিলেন তার স্ত্রী লতিফা বেগম। তিনি বলেন, ‘এক সময় সবার দেখাদেখি আমার স্বামীও ইয়াবা কারবারে জড়িয়েছিল। আমাদের ভয় ছিল ইয়াবা কারবারি স্বামীর কখন কি হয়ে যায়। তবে সরকার তাদের আত্মসমর্পণের মাধ্যমে ইয়াবার পথ থেকে ফিরতে যে সুযোগ দিয়েছেন তাতে আমরা খুশি। ’
 
এদিকে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে আসা প্রাক্তন স্কুল শিক্ষক ও টেকনাফ উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মাস্টার জাহেদ হোসেন বলেন, ‘আজকে আমাদের জন্য একটু স্বস্তি পাওয়ার দিন। ভবিষ্যতে ইয়াবা বন্ধ হোক বা না হোক, এত বড় সমাবেশে হাজার হাজার মানুষ যে ইয়াবার বিরুদ্ধে জেগেছে সেটাই দেখার বিষয়। এখন আমাদের সবার দায়িত্ব হচ্ছে, ইয়াবার বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন সৃষ্টির মাধ্যমে জনতার এই চেতনা জাগিয়ে রাখা। ’
ব্যাংক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেন, ‘আজকের পরও যদি টেকনাফের কোনো মানুষ ইয়াবা সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়ে তাহলে এরচেয়ে দুঃখজনক কিছু থাকবেনা। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান আমাদের জন্য একদিকে পাপ মোচনের, অন্যদিকে লজ্জার। ’
 
টেকনাফ ডিগ্রী কলেজের স্নাতক ২য় বর্ষের ছাত্রী রহিমা আকতার বলেন, ‘আমাদের সমাজে মাদক কারবারিরা এতদিন বীরদর্পে ঘুরাফেরা করত। ইয়াবার মতো ঘৃণিত অপরাধে সম্পৃক্ত থাকা স্বত্বেও তাদের কোথাও কোনো বাধা ছিল না। অর্থ সম্পদের প্রভাবে অনেক ক্ষেত্রে তাদের সামাজিক মর্যাদাও ছিল। কিন্তু আমার মনে হয়েছে আজ থেকে টেকনাফের মানুষ ইয়াবা কারবারিদের ঘৃণা করতে শিখেছে। ইয়াবা বন্ধ করতে হলে সমাজের মানুষগুলোকে ইয়াবা কারবারকে জঘন্য অপরাধমূলক কাজ হিসেবে চিহ্নিত করে ইয়াবা কারবারিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। ’
 
অপরদিকে অনুষ্ঠানে আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে সাবেক সংসদ আব্দুর রহমান বদির ১৪ স্বজন ছাড়াও, ৮ জনপ্রতিনিধি, সমাজের সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তানসহ ১০২ জন ইয়াবা কারবারি আত্মসমর্পণ করেছেন। অনুষ্ঠানের শুরু থেকে আত্মসমর্পণকারীদের বেশ বিব্রতকর অবস্থায় দেখা যায়। অনেকে লজ্জায় মুখে কাপড় বেধে পরিচয় লোকানোর চেষ্টা করেছেন।   
 
প্রসঙ্গত, গত শনিবার সকালে টেকনাফ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল ও পুলিশের মহাপরিদর্শক ড. জাবেদ পাটোয়ারীসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এতে সীমান্তের ১০২ জন ইয়াবা কারবারি ৩ লাখ ৫০ হাজার পিছ ইয়াবা ও ৩০টি অস্ত্র জমা দিয়ে মাদকের পথ পরিহার করার ঘোষণা দিয়ে আত্মসমর্পণ করেন।


সাতদিনের সেরা