kalerkantho

মঙ্গলবার । ২২ অক্টোবর ২০১৯। ৬ কাতির্ক ১৪২৬। ২২ সফর ১৪৪১              

মায়ের কোলে চড়েই পরীক্ষা দিতে যাচ্ছে অদম্য লাবনী

শিবচর (মাদারীপুর) প্রতিনিধি   

১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ২০:১৪ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মায়ের কোলে চড়েই পরীক্ষা দিতে যাচ্ছে অদম্য লাবনী

দুই পাসহ শরীরের অনেকটা অংশ একেবারেই অচল। হাতও স্বাভাবিক নয়। নিজ পায়ে উঠে দাঁড়াতেও পারেনি গত ১৩টি বছর। আর কোনোদিন দাঁড়ানোর সম্ভাবনাও নেই। দিনমজুর বাবার সন্তান শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে ক্লাসেও তেমন একটা অংশ নিতে পারেনি। বাড়িতে পড়েছে নিজে নিজেই। তবে অদম্য ইচ্ছা শক্তি ও পরিবারের সহযোগিতায় চলতি বছর এসএসসি পরীক্ষায় মায়ের কোলে করে ও যানবাহনের সহযোগিতায় ৪-৫ কিলোমিটার দূরের পরীক্ষা কেন্দ্রে গিয়ে অংশ নিচ্ছে অদম্য মেধাবী লাবনী আক্তার।

লাবনী শিবচর উপজেলার উমেদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী। জেএসসিতেও সে ভাল ফলাফল করে। সুযোগ পেলে শিক্ষাকে ভর করে দরিদ্র পরিবারের মেয়েটি জীবন সংগ্রামে জয়ী হতে পারে। তবে এসএসসির পর লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার শংকায় শঙ্কিত পরিবারটি।

সরেজমিনে একাধিক সূত্রে জানা যায়, প্রতিবন্ধী লাবনী আক্তার উপজেলার উমেদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী। একই ইউনিয়নের জোগদারমাঠ গ্রামের দিনমজুর হাই ফকির ও মারিয়া বেগমের ৩ সন্তানের বড় সন্তান লাবনী আক্তার ২০০১ সালে জন্ম গ্রহণের পর ৪ বছর বয়সে কালাজ্বরে আক্রান্ত হয়ে পা দুটি বেকে যায়। শরীরের অনেকাংশই অচল প্রায়। হাতে কর্মক্ষমতাও স্বাভাবিক নয়। কিন্তু মা মেয়েকে ঘরের কোণে ফেলে না রেখে বেছে নেন জীবন সংগ্রামের পথ। লাবনী খুব একটা স্কুলে না যেতে পারলেও পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জেএসসিতেও ভালো ফলাফল করে। একদিকে শারীরিক অক্ষমতা তার সাথে দিনমজুর বাবার অস্বচ্ছলতা এরইমাঝে বাড়িতে বসেই লেখাপড়া চালিয়ে যেত ও। স্কুলে রোল ৩ । তাই ভালো ফলাফলের আশা শিক্ষকদের। পরীক্ষা ও বিশেষ বিশেষ ক্লাশে মায়ের কোলই ছিল তার স্কুলে পৌঁছানোর শেষ আশ্রয়।

চলতি এসএসসি পরীক্ষাতেও লাবনী মায়ের কোলে চড়েই প্রায় ৪/৫ কিলোমিটার দূরের পরীক্ষা কেন্দ্রে যাচ্ছে। কেন্দ্রের সিটে বসিয়ে মায়ের অপেক্ষা কেন্দ্রের বাইরে। এভাবেই আবার ফেরার পথে মায়ের কোল ও গাড়িতে চড়ে ফিরছে বাড়িতে। তার বেড়ে উঠার ক্ষেত্রেও মেয়ের সাথে মায়ের অদম্য ইচ্ছাসহ পরিবারের সহযোগিতা সম্পৃক্ত। সাথে স্কুলের বৃত্তি ও সরকারের প্রতিবন্ধী ভাতা তার জীবন চলায় সহায়ক হয়েছে। স্কুল শিক্ষক পাড়া প্রতিবেশি ও আত্মীয়দের সহায়তায় এগিয়ে চললেও ভবিষ্যত লেখাপড়া নিয়ে রয়েছে চরম সংশয়। এ ছাড়া মায়ের বয়স বেড়ে যাওয়ায় লাবনীকে বহনও এখন দুঃসাধ্য। ভাল চাকরি করে লাবনী পাশে থাকতে চান নিজের অসহায় পরিবারের।

লাবনীর সহপাঠীরা বলে, লাবনীর লেখা-পড়ায় অনেক ভালো। কিন্তু চলাফেরা করতে না পারায় নিয়মিত স্কুলে আসতে পারে না। ওর মা যেদিন কোলে করে দিয়ে যায় সেদিনই স্কুলে আসে। তবে পরীক্ষাগুলোর সময় ওর মা নিয়মিত ওকে নিয়ে আসে আবার নিয়ে যায়। প্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও লাবনীর লেখাপড়ার প্রতি এত আগ্রহ দেখে আমাদেরও লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ অনেক বেড়েছে। আমরা মনে করি লাবনী যদি লেখাপড়া করতে পারে তাহলে আমরা স্বাভাবিক হয়ে কেন পারবো না।

লাবনীর মা মারিয়া বেগম বলেন, ৪ বছর বয়সে জ্বর হওয়ার পর থেকে লাবনী হাঁটতে পারে না। হাতও নড়াতে সমস্যা হয়। কিন্তু লেখাপড়ার প্রতি ওর অনেক আগ্রহ তাই আমি ওকে কোলে করে স্কুলে দিয়ে আসি ও পরীক্ষা শেষে বাড়ি নিয়ে আসি। ওকে যখন কোলে নিয়ে স্বুলে যাই তখন ওর কষ্টের কথা ভেবে আমার বুক ফেটে যায়। স্কুলের সকল শিক্ষকরা আমার ভাইয়েরা আত্মীয় স্বজনরা ওকে সহযোগিতা করে। লেখাপড়া শিখে লাবনী যদি ভবিষ্যতে একটি চাকরি পেয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে তাহলে ওর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হয়। তবে সামনে কিভাবে পড়বে সেই সামর্থ্য বা আমার শারীরিক শক্তি আমার নেই।

অন্যের বাড়িতে কাজ করতে থাকা লাবনীর দিনমজুর বাবা হাই ফকির বলেন, আমি অনেক গরিব দিনমজুর। অনেক কষ্ট করে লাবনীর লেখাপড়া চালিয়ে নিচ্ছি। এখন মেট্রিক পরীক্ষা দিচ্ছে। সামনে ওর লেখাপড়া চালিয়ে নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না। আমি সকলের সহযোগিতা চাই। 

উমেদপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. রোকনুজ্জামান বলেন, লাবনী আক্তারের দুই পা অচল। আমার বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে লেখাপড়া করছে। পরীক্ষার সময় ওর মা ওকে কোলে করে বেঞ্চে বসিয়ে দিয়ে যায় আবার পরীক্ষা শেষে বাড়ি নিয়ে যায়। বরাবরই পরীক্ষায় লাবনী ভালো ফলাফল করছে। বর্তমানে এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। আশা করি এবারও ভালো ফলাফল করবে। একজন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী নিজের ঐকান্তিক চেষ্টায় এতদূর এগিয়েছে এটা একটি বিরল ঘটনা। যদি সরকারি, বেসরকারিভাবে লাবনী সহযোগিতা পায় তাহলে ভবিৎষতে আরো অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারবে। যে কেউ লাবনীকে সহযোগিতা করতে ওর পরিবারের এই নম্বরে ০১৭২৮ ০৮৩ ৪৩৩ যোগাযোগ করতে অনুরোধ করা হলো।

কেন্দ্র সচিব শেখ ফজিলাতুন্নেছা সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, মায়ের কোলে এসে প্রতিবন্ধী লাবনী যেভাবে পরীক্ষা দিচ্ছে তা একটি বিরল দৃষ্টান্ত। এ থেকে আমাদের সকলে শিক্ষা নিতে হবে। 

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ রায় বলেন, প্রতিবন্ধী লাবনী ও তার মায়ের জীবন সংগ্রাম দৃষ্টান্ত। সরকারের প্রতিবন্ধী সহায়তা পাচ্ছে ও। আর ওর জীবন সংগ্রাম এগিয়ে নিতে সকলের লাবনীর পাশে এগিয়ে আসা উচিৎ। 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা