kalerkantho

শুক্রবার  । ১৮ অক্টোবর ২০১৯। ২ কাতির্ক ১৪২৬। ১৮ সফর ১৪৪১              

ইয়াবা কারবারিদের আত্মসমর্পণ কাল

সাড়া মেলেনি ৭৩ গডফাদারের, সাড়া দেননি বদির ৭ স্বজন

তোফায়েল আহমদ, কক্সবাজার ও জাকারিয়া আলফাজ, টেকনাফ    

১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ১২:১৭ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সাড়া মেলেনি ৭৩ গডফাদারের, সাড়া দেননি বদির ৭ স্বজন

কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তে শীর্ষ ইয়াবা কারবারিদের আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল মধ্য জানুয়ারিতে। অবশেষে আগামীকাল শনিবার টেকনাফ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সেই প্রক্রিয়া চূড়ান্ত রূপ পেতে যাচ্ছে। তবে ৭৩ গডফাদারসহ এক হাজার ৫১ জনের তালিকার অনেকেই এই আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়ায় সাড়া দেয়নি। এদের মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির তিন ভাইসহ সাত স্বজনও রয়েছেন।

ইয়াবা কারবারিদের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়া তদারকি করতে গতকাল বৃহস্পতিবার কক্সবাজারে পৌঁছেছেন। অনুষ্ঠানস্থলে মঞ্চ নির্মাণের কাজও শেষ পর্যায়ে। এ উপলক্ষে প্রতিটি ইউনিয়নে মাইকিং করে ব্যাপক প্রচারণাও চালানো হচ্ছে। তবে এই অনুষ্ঠানে সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদি আমন্ত্রণ পাচ্ছেন না বলে নিশ্চিত করেছেন কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপার এ বি এম মাসুদ হোসেন।

ভয়ংকর মাদক ইয়াবা পাচারের অন্যতম রুট হওয়ায় ‘ইয়াবার ট্রানজিট ঘাট’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে টেকনাফ। এ কারণে সাধারণ মানুষও বিভিন্ন সময় দুর্নামের ভাগিদার হয়েছে। অনেকে হয়রানির শিকার হয়েছে। সে জন্য আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান ঘিরে সীমান্তের সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ দেখা গেছে। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের সাক্ষী হতে এলাকার বাইরে থাকা টেকনাফের অনেক বাসিন্দা এলাকায় ফিরছে।

চট্টগ্রাম কলেজের অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্র মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, ‘ইয়াবার কারণে এত দিন টেকনাফের বাসিন্দা হিসেবে পরিচয় দিতেও লজ্জা লাগত। অবশেষে ইয়াবার সেই গডফাদাররা আত্মসমর্পণ করতে যাচ্ছে শুনে ভালো লাগছে। তাই এই ক্ষণটির সাক্ষী হতে চট্টগ্রাম থেকে এলাকায় এসেছি।’

জানা গেছে, কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশের তৈরি এক হাজার ১৫১ জন ইয়াবা কারবারির তালিকায় ৭৩ জনকে গডফাদার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ২৯ জন গডফাদারসহ তালিকাভুক্ত প্রায় দেড় শ কারবারি আত্মসমর্পণের জন্য কক্সবাজার পুলিশের সেফ হোমে রয়েছে। তবে সংখ্যাটি বাড়তে পারে।

আত্মসমর্পণের জন্য পুলিশের সেফ হোমে থাকা ইয়াবা গডফাদারদের মধ্যে রয়েছেন কক্সবাজার-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদির তিন ভাই আব্দুল আমিন, ফয়সাল ও শফিক; খালাতো ভাই মং মং সি, ফুফাতো ভাই কামরুল হাসান রাসেল, ভাগ্নে শাহেদুর রহমান নিপু, চাচাতো ভাই মো. আলম, টেকনাফ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জাফর আহমদের ছেলে দিদার আলম, হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্য নুরুল হুদা, জামাল হোসেন, টেকনাফ পৌর কাউন্সিলর নুরুল বশর নুরশাদ, সাবরাং ইউপির সদস্য রেজাউল করিম রেজু, টেকনাফ সদর ইউপির সদস্য এনামুল হক, বিএনপি নেতা মোহাম্মদ আব্দুল্লাহর দুই ভাই জিয়াউর রহমান ও আব্দুর রহমান, টেকনাফের দক্ষিণ জালিয়াপাড়ার জুবাইর ও মোজাম্মেল।

এদিকে তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়ার বাইরে রয়েছে টেকনাফ সীমান্তের অনেক ইয়াবা কারবারি। সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদির ছোট ভাই টেকনাফ পৌরসভার প্যানেল মেয়র মৌলভী মুজিবুর রহমানের নাম তালিকার শীর্ষে থাকলেও তিনি আত্মসমর্পণ করতে যাচ্ছেন না। সীমান্তের একাধিক ইয়াবা সিন্ডিকেটের নেতৃত্বদানকারী মৌলভী মুজিব প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করছেন। এ ছাড়া টেকনাফ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জাফর আহমদ ও তাঁর ছেলে সদর ইউপির চেয়ারম্যান শাহজাহান মিয়া, উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মৌলভী রফিক উদ্দীন ও তাঁর ভাই বাহারছড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মৌলভী আজিজ উদ্দীন, টেকনাফ পৌরসভার জালিয়াপাড়ার ইয়াবা ও হুন্ডিসম্রাট হিসেবে পরিচিত জাফর আহমদ ওরফে টিটি জাফরসহ আরো অনেকের নাম ৭৩ জন গডফাদারের তালিকায় থাকলেও তারা আত্মসমর্পণ করছেন না বলে জানা গেছে।

আত্মসমর্পণের পর কী হবে?

আত্মসমর্পণের জন্য পুলিশের হেফাজতে থাকা ইয়াবা কারবারিদের ভাগ্যে পরবর্তী সময়ে কী ঘটবে তা নিয়ে তৈরি হয়েছে ব্যাপক কৌতূহল আর প্রশ্ন। এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে দায়িত্বশীল কেউ বিশদ মন্তব্য করেননি। তবে এর আগে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ বি এম মাসুদ হোসেন বলেছিলেন যে আত্মসমর্পণ করলেই তাদের (ইয়াবা কারবারিদের) সব কিছু মাফ হয়ে যাবে তা নয়।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, আত্মসমর্পণকারী ইয়াবা কারবারিদের নির্দিষ্ট মেয়াদে সাজা দেওয়া হবে। একই সঙ্গে মাদকের কারবার থেকে অর্জিত অর্থ-সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হবে। পুলিশ হেফাজতে থাকা ইয়াবা কারবারিদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে দুই থেকে ২০টি পর্যন্ত মাদকের মামলা থাকায় তাদের সাজা ভোগ করার বিষয়টি অনেকটা অনুমেয়। তবে তাদের অঢেল অর্থ-সম্পদের বিষয়ে কী হবে তা জানা যাচ্ছে না।

পরিবারের সদস্যরাও জানে না আত্মসমর্পণের পর তাদের স্বজনের ভাগ্যে কী ঘটতে যাচ্ছে। তবে তাদের ধারণা, আত্মসমর্পণ করে সহজেই পার পেয়ে যাবে ইয়াবা কারবারিরা। আর সাজা হলেও তা হবে ‘গুরু পাপে লঘু দণ্ডের’ মতো।

পুলিশ হেফাজতে থাকা রেজাউল করিম রেজুর ভাই ফরিদ আহমদ বলেন, ‘ভাইয়ের নাম ইয়াবা গডফাদারের তালিকায় রয়েছে। তিনি পুলিশের হেফাজতে চলে গেছেন। শুনেছি তাদের নির্দিষ্ট মেয়াদে সাজা দেওয়া হবে। তবে সেই মেয়াদের মাত্রা সম্পর্কে কিছু জানি না।’

সাবরাং নোয়াপাড়া থেকে আত্মসমর্পণ করতে যাওয়া মোহাম্মদ তৈয়বের ভাবি এবং বন্দুকযুদ্ধে নিহত ইয়াবা কারবারি শামসুল আলম ওরফে মার্কিনের স্ত্রী তৈয়বা বেগম বলেন, ‘শুনেছি আত্মসমর্পণ করলে তাদের সব কিছু মাফ করা হবে। তাহলে এই সুযোগটা সবাইকে দেওয়া উচিত ছিল। আমার স্বামীকে না মেরে আত্মসমর্পণের সুযোগ দিলে আমি আজ বিধবা হতাম না।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা